ঢাকা মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬

কাসেম সোলাইমানি হত্যার পূর্বাপর (১)

এক আমেরিকানের হত্যার প্রতিশোধ?

এক আমেরিকানের হত্যার প্রতিশোধ?
×

ইলিয়াস হোসেন

প্রকাশ: ১৯ জানুয়ারি ২০২০ | ১৫:০২ | আপডেট: ১৯ জানুয়ারি ২০২০ | ১৫:৩৭

ইরানের এলিট বাহিনী কুদস ফোর্সের প্রধান জেনারেল কাসেম সোলাইমানিকে হত্যার পূর্বাপর ঘটনা নিয়ে দীর্ঘ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে নিউইয়র্ক টাইমস। এতে হত্যার পরিকল্পনা থেকে হত্যাকাণ্ডের পরের এক সপ্তাহের হোয়াইট হাউস, পেন্টাগন ও স্টেট ডিপার্টমেন্টের অন্দরের এক অসাধারণ চালচিত্র উঠে এসেছে। প্রায় ৫২শ' শব্দের এই প্রতিবেদনে সোলাইমানি হত্যাকাণ্ড নিয়েও আছে চমকপ্রদ তথ্য। প্রতিবেদনে স্থান পেয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে রাজনীতি, কূটনীতি ও সমরনীতির অজানা অধ্যায়। প্রতিবেদনটি তৈরিতে নিউইয়র্ক টাইমসের সাংবাদিক পিটার বেকার, রনেন বার্গম্যান, ডেভিড ডি. কিরপ্যাট্রিক, জুলিয়ান ই. বার্নস ও অ্যালিসা জে. রুবিন ছাড়াও ঘটনাসংশ্নিষ্ট অনেকেই অবদান রেখেছেন। আজ ছাপা হলো প্রথম কিস্তি। - ভাষান্তর ইলিয়াস হোসেন

বিমানটি আসতে দেরি হচ্ছিল। ফলে হত্যা মিশনে নিয়োজিত সদস্যরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। আন্তর্জাতিক সূচি অনুযায়ী চ্যাম উইং এয়ারলাইন্সের ৬কিউ৫০১ ফ্লাইটটি বাগদাদের উদ্দেশে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় ছেড়ে যাওয়ার কথা। তবে বিমানবন্দরের একজন গুপ্তচর জানান, বিমানটি এখনও মাটিতেই অবস্থান করছে এবং কাঙ্ক্ষিত সেই যাত্রীর দেখা এখনও মেলেনি।

সময় গড়িয়ে যাচ্ছিল। হত্যা মিশনে নিয়োজিত কেউ কেউ ভাবছিলেন, এ দফায় অভিযান স্থগিত করা উচিত। তবে বিমানের দরজা বন্ধ হওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে গাড়ির বহর এসে থামল টারমাকে। এতে ছিলেন ইরানের শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা মেজর জেনারেল কাসেম সোলাইমানি। দু'জন সঙ্গী নিয়ে তিনি বিমানটিতে আরোহণ করেন। তিন ঘণ্টা পর বিমানটি ইরাকের রাজধানীর উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে।

মধ্যরাতের কিছুটা পর ১২টা ৩৬ মিনিটে বিমানটি বাগদাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। প্রথমেই বিমান থেকে নেমে এলেন জেনারেল কাসেম সোলাইমানি ও তার সঙ্গীরা। তাদের জন্য বাইরেই অপেক্ষায় ছিলেন ইরাকের মিলিশিয়াদের নেতা ইরানঘনিষ্ঠ আবু মাহদি আল মুহান্দিস। সেই রাতে দুটি গাড়িতে তারা যাত্রা শুরু করলেন আর তাদের অনুসরণ করছিল যুক্তরাষ্ট্রের এমকিউ-৯ রিপার ড্রোন। ১২টা ৪৭ মিনিটে গাড়িবহরে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হলে সেগুলোতে দাউদাউ করে আগুন জ্বলে ওঠে এবং ভেতরে ১০ জনের অগ্নিদগ্ধ লাশ পড়ে থাকে।

ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড বাহিনীর কুদস ফোর্সের কমান্ডার জেনারেল সোলাইমানিকে হত্যার এই অভিযানের পর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দেশটির যুদ্ধ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এর পরের সাত দিন বিশ্ব চরম অনিশ্চয়তায় কাটায়। সেই সাত দিনের কাহিনি এবং তার আগের কয়েক মাসের গোপন পরিকল্পনা ছিল প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের তিন বছরের শাসনকালের সবচেয়ে বিপদসংকুল অধ্যায়। এ সময় তিনি ইরানে হামলার হঠকারী সিদ্ধান্ত নেন এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাওয়ার আশঙ্কায় তার মিত্র ও গোপন চ্যানেলে চেষ্টা চালান।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্তে ইরানের সঙ্গে কয়েক দশকের চাপা উত্তেজনায় বিশ্বব্যাপী অভূতপূর্ব নাটকীয় ঘটনাপ্রবাহ সৃষ্টি হতে থাকে। এর অনেক দৃশ্যই মঞ্চস্থ হয় পর্দার আড়ালে। ইউরোপ থেকে মধ্যপ্রাচ্যের রাজধানীগুলোর নেতা ও কূটনীতিকরা একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ এড়ানোর জন্য জোর প্রচেষ্টা চালান। অন্যদিকে হোয়াইট হাউস ও পেন্টাগনে প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টারা মধ্যপ্রাচ্যে আরও সেনা মোতায়েনের নির্দেশ দেন।

সৌদি আরবের মূল শাসক যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান বিচলিত হয়ে পড়েন। তিনি ট্রাম্পের সঙ্গে গোপনে বৈঠক করার জন্য তার ছোট ভাইকে ওয়াশিংটনে পাঠান। ইউরোপের নেতারা যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনা সম্পর্কে ইতোপূর্বে অন্ধকারে থাকলেও ইরান যাতে উত্তেজনা না বাড়ায়, সেই প্রচেষ্টা চালান। ইরান হামলা চালালে তাদের যুদ্ধজাহাজের নিয়ন্ত্রণকারী কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোলশিপে হামলা এবং সাইবার আক্রমণ চালিয়ে ইরানের তেল ও গ্যাস খাত আংশিক অচল করে দেওয়ার পরিকল্পনা করে যুক্তরাষ্ট্র।

পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র সুইজারল্যান্ডের মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে এই গোপন বার্তাও পাঠায় যে, ইরান যেন এমন পাল্টা শক্তিশালী জবাব না দেয়, যাতে ট্রাম্প আরও বড় পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হন। ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সেনা ঘাঁটিতে ১৬টি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর সুইস মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে এই বার্তা পাঠায় যে, তাদের প্রতিশোধ নেওয়া আপাতত শেষ। পাঁচ মিনিটের মধ্যে এই বার্তা ওয়াশিংটনে পৌঁছানো হয়। এরপর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও পিছু হটেন।

যুদ্ধের আশঙ্কা থাকলেও তা ছাড়াই যখন সপ্তাহটি পার হয়, তখন ট্রাম্প এই বলে দম্ভ প্রকাশ করেন যে, তিনি একজন যুক্তরাষ্ট্রের শত্রুকে খতম করেছেন। তবে দুই দেশের মধ্যে লড়াইটা আসলে এখনও শেষ হয়নি। ইরান ভিন্ন কৌশলে প্রতিশোধ নিতে পারে। ইরাকি নেতারা যুক্তরাষ্ট্রের সেনাদের বিতাড়িত করতে পারে। এ কাজে জেনারেল সোলাইমানির আজীবনের লালিত ব্যর্থ স্বপ্ন এখন সফল হতে পারে। এ ঘটনা নিয়ে বিভ্রান্তির ফলেই ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ইউক্রেনের একটি বিমান ধ্বংস হয়, যাতে মারা যায় ১৭৬ জন আরোহী।

এ ঘটনায় ট্রাম্পের সহযোগীরা ক্ষণিকের জন্য আত্মতৃপ্তিতে ছিলেন যে, সিনেটে তার অভিশংসনের বিচার থেকে দৃষ্টি সরানো গেল। তবে ট্রাম্প ও তার জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টারা হামলার পক্ষে যেসব যুক্তি তুলে ধরেন, তা নিয়ে রিপাবলিকানরাই প্রশ্ন তুলছেন। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও প্রথমে বলেছিলেন, 'আসন্ন' হামলার ঝুঁকি ছিল। আর ট্রাম্প বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের চারটি দূতাবাসে হামলার পরিকল্পনা ছিল সোলাইমানির। তবে ট্রাম্পের এসব দাবি যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারাই বিশ্বাস করছেন না।

ট্রাম্প প্রশাসনের অনেক কর্মকর্তা, সামরিক কর্মকর্তা, কূটনীতিক, গোয়েন্দা বিশ্নেষক ও যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের সংশ্নিষ্টদের সাক্ষাৎকারে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। মনে করা হচ্ছে, এই সাত দিন ছিল ট্রাম্পের শাসনামলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়।

কম্পাউন্ডে ঢুকলেই গুলি কর : বস্তুত দুর্ঘটনাক্রমে সংঘাতের সৃষ্টি হতে পারত। বহু বছর ধরে ইরাকে প্রক্সি ফোর্স বা ছায়া বাহিনী পালন করেছে ইরান। ২০০৩ সালে ইরাকে আগ্রাসনের পর আসা যুক্তরাষ্ট্রের সেনাদের সঙ্গে তারা প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হয়। গত শরতে ইরান সমর্থিত মিলিশিয়ারা ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিতে রকেট হামলা চালায়। এতে তেমন ক্ষয়ক্ষতি না হলেও উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে।

গত ২৭ ডিসেম্বর ইরাকের কিরকুকে সামরিক ঘাঁটিতে হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের বেসামরিক ঠিকাদার নওরিস ওয়ালিদ হামিদ নিহত এবং বেশ কিছু লোক আহত হলে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। এ জন্য ইরান সমর্থিত কাতায়েব হেজবুল্লাহকে দায়ী করা হয়। আগের মাসে তারা যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিতে আরও পাঁচটি রকেট ছোড়ে। তবে এতে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়নি।

যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা কর্মকর্তারা কাতায়েব হেজবুল্লাহ ও জেনারেল সোলাইমানির রেভল্যুশনারি গার্ডের মধ্যে যোগাযোগ পর্যবেক্ষণ করে জানতে পারে যে, ইরান যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনীর ওপর চাপ বাড়াতে চায়। তবে হামলার ঘটনা বাড়াতে আগ্রহী নয় তারা। যে সময়টাতে রকেট হামলা চালানো হয়, তখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরাকি সেনারা সাধারণত ঘাঁটিতে থাকে না। হামলায় দুর্ভাগ্যবশত ঠিকাদার হামিদ মারা যান বলে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা বলছেন।

তবে ট্রাম্প ও তার টিমের কাছে এসব বিবেচ্য ছিল না। একজন আমেরিকান মারা গেছে, এটাই বড় বিষয়। গত জুনে ইরানে হামলার অনুমতি দিয়ে মাত্র ১০ মিনিট পর ট্রাম্প তা স্থগিত করলেও এবার ইরানি উস্কানি নিয়ে তাদের যেন সিদ্ধান্ত নেওয়ার পালা চলে এলো।

উপদেষ্টারা ট্রাম্পকে বোঝালেন যে, তখন তার শক্তি প্রয়োগ না করাকে সম্ভবত ভুল বুঝেছে ইরান। একে ইরান দেখেছে দুর্বলতা হিসেবে। দৃঢ়তা দেখানোর জন্য তার উচিত কঠোর জবাবের অনুমোদন দেওয়া। ফ্লোরিডার মার-এ-লাগোতে অবকাশযাপনকালে ট্রাম্প ইরাক ও সিরিয়ার পাঁচটি স্থাপনায় হামলার অনুমোদন দেন। দু'দিন পরে ওই হামলায় ২৫ কাতায়েব হেজবুল্লাহ সদস্য নিহত এবং ৫০ জন আহত হন।

এর দু'দিন পর গত ৩১ ডিসেম্বর ইরান সমর্থিত বিক্ষোভকারীরা বাগদাদে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসে প্রবেশ করে আগুন জ্বালিয়ে দেয়। ১৯৭৯ সালে ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস দখল এবং ২০১২ সালে লিবিয়ার বেনগাজিতে কূটনৈতিক অফিসে হামলার পুনরাবৃত্তি মনে করে ট্রাম্প ও তার সহযোগীরা কুয়েত থেকে ১০০ মেরিন সেনাকে বাগদাদে যাওয়ার নির্দেশ দেন।

মেরিনরা জানত না তাদের কী উদ্দেশ্যে পাঠানো হয়েছে। সেখানে কী ঘটছে সে সম্পর্কে তাদের খুব স্পষ্ট ধারণা ছিল না। এ অবস্থাতেই তারা বন্দুকে ম্যাগাজিন আর গোলাবারুদ ভরেছে। তবে তাদেরকে বলা হয়, তাদের পাঠানো হচ্ছে দূতাবাসের নিরাপত্তার জন্য। তাদেরকে একটি স্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া হয়- বিক্ষোভকারীরা কম্পাউন্ডে ঢুকলেই হত্যা কর।

বাগদাদে পৌঁছে অবশ্য মেরিনদের গুলি করতে হয়নি। শুধু টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ করে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করে দেওয়া হয়। রক্তপাত ছাড়াই শেষ হয় দূতাবাস অবরোধ।

আরও পড়ুন

×