ঢাকা বুধবার, ০১ জুলাই ২০২৬

পরিবেশ সংরক্ষণ

বন্যপ্রাণীর প্রতি সদয় হোন

বন্যপ্রাণীর প্রতি সদয় হোন
×

এস. এম. মনজুরুল হান্নান

প্রকাশ: ২১ মার্চ ২০২০ | ১৩:৪৯

বন্যপ্রাণীর প্রতি আমাদের ভালোবাসা কতটুকু বা আদৌ আছে কিনা, এ বিষয়ে প্রায়ই আমার মনে প্রশ্ন জাগে। লেখার শুরুতে এ রকম একটি নেতিবাচক চিন্তার মূল কারণ হলো, প্রায় প্রতিদিন পত্রপত্রিকায় বন্যপ্রাণী নিধন হওয়ার সংবাদ প্রকাশ এবং ইনবক্সে বন্যপ্রাণী হত্যার বীভৎস ছবি আমাকে ভাবিয়ে তোলে। ছবিগুলো যারা পাঠান তারা বন্যপ্রাণীর প্রতি ভালোবাসা থেকে আমাকে প্রেরণ করেন এবং এ বিষয়ে কিছু একটা করার অনুরোধ জানান। দু'একটি ছবির বর্ণনা দিলেই বন্যপ্রাণীর প্রতি আমাদের ভালোবাসার একটি সাধারণ চিত্র পাওয়া যাবে। প্রায়ই দেখা যায় বাঘডাশা, শিয়াল, গন্ধগোকুল বা সাপ মেরে গাছে ঝুলিয়ে রাখা হয় এবং যারা মারল তারা কত বড় বীর তা বোঝানোর জন্য মৃত প্রাণীর সঙ্গে সেলফি তুলে ফেসবুকে পোস্ট দেয়। তা ছাড়া বিষটোপ ব্যবহার করে প্রতি বছর হাওর এলাকায় পরিযায়ী পাখি মেরে তা বাজারে বিক্রি করা হয়। জাল দিয়ে বা গুলি করে পরিযায়ী পাখি শিকার তো হাওর এলাকায় অতি পরিচিত দৃশ্য।

বন্যপ্রাণীর প্রতি ভালোবাসা কেমন সে সম্পর্কে আমি একটি কথা প্রায়ই বলে থাকি। তা হলো 'নড়ছো কি মরছো'। যদি কোনো কারণে দিনের বেলায় কোনো শিয়াল, বাঘডাশা বা অন্য কোনো বন্যপ্রাণী লোকালয়ে চলে আসে তবে তার মৃত্যু অবধারিত। বন্যপ্রাণী দেখামাত্র মানুষ সব কাজ ফেলে লাঠিসোটা নিয়ে যুদ্ধে নেমে যাবে। যতক্ষণ বন্যপ্রাণীকে হত্যা না করা যাবে ততক্ষণ চলবে তার ওপর নির্মম প্রহার। বন্যপ্রাণী নিধনে সবাই এমনভাবে অংশগ্রহণ করে, যেন পৃথিবীতে বন্যপ্রাণীই তাদের প্রধান শত্রু। তখন মনে হয়, আমরা বন্যপ্রাণীকে অদৃশ্য শত্রুর প্রতিভূ হিসেবে মনে করি কিনা।

বন্যপ্রাণী রক্ষার ভিন্নচিত্রও আছে আমাদের দেশে। অনেকেই মমতা-ভালোবাসা দিয়ে বন্যপ্রাণী রক্ষা করেন। পাখির জন্য নিরাপদ আশ্রয় তৈরি করে দেন। মাঝেমধ্যে পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত সচিত্র প্রতিবেদন আমাদের আশান্বিত করে। মনে হয়, বন্যপ্রাণীর প্রতি আমাদের ভালোবাসা এখনও শেষ হয়ে যায়নি।

বাংলাদেশ আয়তনে ছোট হলেও প্রাকৃতিক পরিবেশের কারণে বন্যপ্রাণীর জন্য আমাদের দেশ একটি ভালো আবাসস্থল। ২০১৫ সালে বন অধিদপ্তর থেকে প্রকাশিত এক তথ্যে দেখা যায়, বাংলাদেশে ৬৪টি উভচর, ১৭৪টি সরীসৃপ, ৭১১টি পাখি, ১৩৩ স্তন্যপায়ী এবং ২৭৩ প্রজাতির মিঠাপানির মাছ রয়েছে। প্রজাতির সংখ্যা দেখে ধারণা করা যায়, বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী প্রজাতিতে বেশ সমৃদ্ধ। আমরা যদি প্রাকৃতিক আবাসস্থলের বৈচিত্র্য লক্ষ্য করি তাহলে দেখা যাবে বন্যপ্রাণীর জন্য সত্যিকার অর্থেই বৈচিত্র্যময় আবাসস্থল রয়েছে এই বাংলাদেশে। আমাদের নদী-নালা, খাল-বিল, হাওর-বাঁওড়, জলাভূমি, প্রাকৃতিক ও গ্রামীণ বনাঞ্চল মূলত বন্যপ্রাণীর উপযুক্ত আবাসস্থল। প্রাকৃতিকভাবে আমাদের রয়েছে ৫৫১০ বর্গকিলোমিটার মিশ্র চিরহরিৎ বা পাহাড়ি বন, ৬০০০ বর্গকিলোমিটার সুন্দরবন, ৩৪০ বর্গকিলোমিটার শালবন, আর বনায়ন করা হয়েছে ২,৩৮,০০০ হেক্টর এলাকা। আর্থিক উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে প্রতিবেশ ব্যবস্থাকে সমন্বয় না করার কারণে আমাদের এত সুন্দর বৈচিত্র্যময় প্রকৃতি থেকেও বেশ কিছু বন্যপ্রাণী বিলুপ্ত হয়েছে এবং বেশ কিছু বিলুপ্তির পথে। আমাদের প্রকৃতি থেকে বিগত ১০০ বছরে ৩১ প্রজাতির বন্যপ্রাণী বিলুপ্ত হয়ে গেছে। তার মধ্যে তিন প্রজাতির এশিয়ান গন্ডার, বুনো মহিষ, বেনটিং, বারশিঙ্গা, নীলগাই, ব্ল্যাকবাক বা এন্টিলোপ, মন্থর ভল্লুক, নেকড়ে, গোলাপি হাঁস, বাদি হাঁস, সারস, সবুজ ময়ূর, ভারতীয় ময়ূর, বড় মদনটাক, ধলাপেট বক, পেলিক্যান, রাজ শকুন ও মিঠাপানির কুমির।

বিশ্বব্যাংকের আর্থিক ও আইইউসিএন-এর কারিগরি সহযোগিতায় বন অধিদপ্তর ২০১৫ সালে 'রেড লিস্ট অব বাংলাদেশ' প্রকাশ করে বাংলাদেশের বন্যপ্রাণীর অবস্থা সম্পর্কে একটি চিত্র তুলে ধরেছে। আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য পদ্ধতিতে বন্যপ্রাণীর টিকে থাকা, বর্তমান অবস্থা এবং ভবিষ্যতে যেসব কারণে বন্যপ্রাণীর বিলুপ্তি ঘটতে পারে সে সম্পর্কে বিশদভাবে বর্ণনা করেছে। রেড লিস্টটি যে তথ্য-উপাত্ত দিয়েছে তা আমাদের জন্য উদ্বেগজনক। কারণ বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের জন্য এখনই বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ না করা হলে বন্যপ্রাণীর অধিকাংশই স্বল্প সময়ের মধ্যে বিলুপ্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। রেড লিস্ট থেকে দেখা যাচ্ছে, মিঠাপানির ২৬৬ প্রজাতির মাছের মধ্যে ৫৪ প্রজাতি, ২২ প্রজাতির উভচরের মধ্যে ৮ প্রজাতি, ১২৭ প্রজাতির সরীসৃপের মধ্যে ৬৩ প্রজাতি, ৬২৮ প্রজাতির পাখির মধ্যে ৪৭ প্রজাতি এবং ১১৩ প্রজাতির স্তন্যপায়ীর মধ্যে ৪৩ প্রজাতির বিলুপ্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বন্যপ্রাণী বিলুপ্ত হওয়ার মূল কারণ তাদের আবাসস্থল ধ্বংস, খাদ্যস্বল্পতা ও প্রাকৃতিক পরিবেশ দূষিত হয়ে যাওয়া। জনসংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের ঘরবাড়ি, বাজার-ঘাট, শহর-বন্দর, যোগাযোগ ব্যবস্থা দখল করে নিচ্ছে বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল। ফলে একদিকে যেমন কমে যাচ্ছে বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল, অন্যদিকে কমে যাচ্ছে তাদের পর্যাপ্ত খাবার সংগ্রহের জায়গা। যে কারণে মানুষ ও বন্যপ্রাণীর মধ্যে প্রায়ই দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। প্রায়ই হাতি তাদের খাবার খুঁজতে লোকালয়ে চলে আসে, বনের বাঘ মানুষখেকোতে পরিণত হয়, বাঘডাশা বা শিয়ালকে বেঘোরে প্রাণ দিতে হয় খাবারের সন্ধানে লোকালয়ে চলে আসার কারণে।

আমাদের খাদ্য ঘাটতি মেটাতে বনাঞ্চল বা জলাভূমিকে ফসলি জমিতে পরিবর্তন করা হচ্ছে। নগর-বন্দর স্থাপন বা সম্প্রসারণেও একই কথা। অর্থাৎ অর্থনৈতিক উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে প্রথম আঘাতটা আসে প্রতিবেশ ব্যবস্থার ওপর। খুব নির্দয়ভাবে প্রতিবেশ ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে অর্থনৈতিক উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়। এসব কর্মকাণ্ডে আমরা কখনই বন্যপ্রাণীদের আবাসস্থল বা তাদের খাদ্যের ব্যবস্থা কী হবে, তা নিয়ে খুব একটা বিচলিত হই না। আমাদের পরিকল্পনায় বন্যপ্রাণী বা প্রতিবেশ ব্যবস্থা সংরক্ষণের বিষয়টি কাগজ-কলমে থেকে যায়। পরিকল্পনায় সংরক্ষণের কথা থাকলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখা যায় না।

বন্যপ্রাণী ধ্বংসের আর একটি কারণ হলো আন্তর্জাতিক বাজারে এর উচ্চমূল্য। বন্যপ্রাণী বাণিজ্য আন্তর্জাতিকভাবে নিষিদ্ধ হলেও কোনো কোনো দেশে বন্যপ্রাণীর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। কিন্তু এই চাহিদা তাদেরকে হত্যা করে ভূরি ভোজ, যৌন উত্তেজক ওষুধ তৈরি করা (যদিও এর বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই), সামাজিক আচার-অনুষ্ঠানে তাদের নিধন ইত্যাদি। বিশেষ করে বন্যপ্রাণীর অবৈধ বাণিজ্যের জন্য চীন বেশ অগ্রগামী। সুতরাং বন্যপ্রাণী হত্যার বিষয়টি আন্তর্জাতিকভাবেও কম হয় না।

অনেকেই বলতে পারেন, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ না করলে কী এমন ক্ষতি! বন্যপ্রাণী তো আমাদের অর্থনীতিতে কোনো অবদান রাখছে না। এমন স্থ্থূল চিন্তা অনেকেই করতে পারেন। তবে বন্যপ্রাণী ছাড়া আমাদের প্রাকৃতিক প্রতিবেশ ব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে যাবে। বন্যপ্রাণী প্রতিবেশ ব্যবস্থার অবিচ্ছেদ্য অংশ। যেমন বাংলার বাঘ ছাড়া সুন্দরবন টিকে থাকবে না। কোনো অরণ্যে বন্যপ্রাণী না থাকলে অতি অল্প সময়ের মধ্যে সেই অরণ্য বাস্তুসংস্থান মরুভূমিতে পরিণত হয়ে যাবে।

আমাদের স্বার্থেই বন্যপ্রাণী রক্ষা করতে হবে। তা না হলে প্রতিবেশ ব্যবস্থায় যে বিপর্যয় ঘটবে, তা আমাদের খাদ্য নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য নিরাপত্তাসহ জীবন-জীবিকার ওপর ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। সুতরাং আমাদের বড় বড় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে প্রতিবেশ সংরক্ষণসহ বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ বিষয়ে বিশেষভাবে নজর দিতে হবে। পাশাপাশি বন্যপ্রাণী যেন আমাদের দেশ থেকে বিলুপ্ত না হয়, সে বিষয়ে বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। আসুন, সবাই মিলে বন্যপ্রাণীর প্রতি একটু সদয় হই। তাদেরকে তাদের মতো থাকতে দিই। তাহলেই আমাদের উন্নয়ন টেকসই হবে।

জলবায়ু ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ
[email protected]

আরও পড়ুন

×