ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

দুর্যোগ

বর্ষায় ডুবন্ত ফেনী এবং সমন্বিত বন্যা ব্যবস্থাপনা

বর্ষায় ডুবন্ত ফেনী এবং সমন্বিত বন্যা ব্যবস্থাপনা
×

আবু রায়হান

আবু রায়হান

প্রকাশ: ৩১ জুলাই ২০২৫ | ০৩:০৭

প্রতিবছর বর্ষা মৌসুম এলেই ফেনীর মানুষের মনে একটা অজানা আতঙ্ক ভর করে। আকাশে কালো মেঘ জমলেই তারা জানে, এবারও হয়তো তাদের সর্বস্ব ভাসিয়ে নিয়ে যাবে বন্যার পানি। এটা শুধু প্রকৃতির খেয়াল নয়, বরং বছরের পর বছর চলে আসা অব্যবস্থাপনা, দুর্বল পরিকাঠামো এবং আন্তঃসীমান্ত পানি ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতার এক করুণ পরিণতি।

২০২৫ সালের জুলাইয়ের ঘটনা আবারও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে, আমরা কতটা অপ্রস্তুত এবং অসহায়। ৭ জুলাই যখন ভারী বর্ষণ শুরু হয় এবং ভারতের ত্রিপুরা থেকে পাহাড়ি ঢল নেমে আসে মুহুরী, কহুয়া ও সিলোনিয়া নদী বেয়ে, তখন স্থানীয় মানুষ জানত, আরেকটি দুর্যোগ আসন্ন। কিন্তু জেনেও কিছু করার ছিল না। একের পর এক বাঁধ ভেঙে পড়ল নদীর প্রবল স্রোতের চাপে। মোট ৪১টি স্থানে বাঁধ ভেঙে আকস্মিক বন্যা দেখা দিল পাঁচটি উপজেলায়। এই পরিসংখ্যান শুধু সংখ্যার হিসাব নয়; এর প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে হাজারো পরিবারের স্বপ্নভঙ্গের গল্প, জীবনযুদ্ধে পরাজিত মানুষের হাহাকার।

এই বন্যার ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা যে কোনো সংবেদনশীল মানুষের হৃদয়ে গভীর বেদনার সৃষ্টি করবে। প্রায় ৩০০ কিলোমিটার গ্রামীণ সড়ক সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে ধ্বংস হয়ে গেছে, যার মধ্যে শুধু ছাগলনাইয়াতে ১২৬ কিলোমিটার রাস্তা এমনভাবে বিলীন হয়েছে, স্থানীয় মানুষ বাঁশ-কাঠের সাঁকো বানিয়ে কোনোমতে যোগাযোগ রক্ষা করছেন। অবকাঠামোগত এই ক্ষতির আর্থিক পরিমাণ ৯০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। সবচেয়ে মর্মান্তিক হলো কৃষি খাতের ধ্বংসযজ্ঞ। 

আরও দুঃখজনক বিষয়, এই দুর্যোগ মোকাবিলায় যে বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছিল, তা বারবার ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে। ২০১১ সালে পানি উন্নয়ন বোর্ড ১৫৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ১২২ কিলোমিটার দীর্ঘ বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মাণ করেছিল মুহুরী-কহুয়া-সিলোনিয়া নদীর দুই তীরে। শুরুতে এটি কার্যকর মনে হলেও ২০১৩ সাল থেকে এর দুর্বলতা প্রকাশ পেতে থাকে। এরপর ২০১৭ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত প্রতিবার বন্যার পর বাঁধ মেরামতে খরচ হয়েছে ৫০ কোটির বেশি টাকা। এটি প্রমাণ করে, আমরা সমস্যার মূলে না গিয়ে শুধু উপরিভাগের চিকিৎসা করছি। প্রতিবছর নতুন করে বাঁধ ভাঙছে, মানুষ ভাসছে। সরকার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে কিন্তু বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কোনো টেকসই পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না। এটা স্পষ্টতই নির্দেশ করে– হয় বাঁধ নির্মাণে মান বজায় রাখা হয়নি, নয়তো নকশায় মৌলিক ত্রুটি রয়েছে। অথবা উভয়ই সত্য।

গত বছর আগস্টের বন্যা আমাদের প্রস্তুতির দুর্বলতা আরও নগ্নভাবে তুলে ধরেছে। সেই দুর্যোগে ১১টি জেলার ৫৮ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলেন। মারা যান ৭১ জন, যার মধ্যে শুধু ফেনী জেলাতেই ২৮ জন। ১৪৪ বিলিয়ন টাকার সম্পত্তি ধ্বংস হয়েছিল, যা ১.২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমান। পাঁচ লাখেরও বেশি মানুষকে আশ্রয় নিতে হয়েছিল তিন হাজারের বেশি আশ্রয়কেন্দ্রে। সবচেয়ে মর্মান্তিক ছিল শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর আঘাত। সাত হাজারেরও বেশি স্কুল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ১৭ লাখ ৫০ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর পড়াশোনা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। 

জুলাইয়ে টেক্সাসে ভয়াবহ বন্যার কথা সারাবিশ্ব জানে, সেখানে ৪৫ মিনিটের মধ্যে গুয়াদালুপে নদীর পানি ২৬ ফুট বেড়ে গিয়ে ১৩৪ জনের প্রাণ নিয়েছে, নিখোঁজ আছে আরও অনেকে। শুধু টেক্সাস না, ২০২৫ সালের জুলাই মাসব্যাপী যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে যেসব আকস্মিক বন্যা হয়েছে, তা ছিল ভয়াবহ জলবায়ুগত সংকেত। অতিরিক্ত জলীয় বাষ্পে পরিপূর্ণ গরম বাতাস, ধীরগতির বজ্রঝড়, নগরায়ণের ফলে গড়ে ওঠা কংক্রিটের আধিপত্য ও পাথরময় অঞ্চলের পানি শোষণে অক্ষম জমির মিলিত প্রভাবে তৈরি হয়েছে এই বিপর্যয়। এই ঘটনাগুলো প্রমাণ করে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বৃষ্টি শুধু বেশিই হচ্ছে না, বরং হয়ে উঠছে হঠাৎ, ভারী ও প্রাণঘাতী। আগে যেসব বৃষ্টিপাত ‘শতবর্ষের ঘটনা’ বলে বিবেচিত হতো, সেগুলো এখন প্রতিবছর ঘটছে। আর কোন এলাকা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ হবে, তা নির্ভর করছে সেই এলাকার ভৌগোলিক ও মানবসৃষ্ট কাঠামোর ওপর। 

বাংলাদেশের জন্য প্রয়োজন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো সমন্বিত পদ্ধতি। প্রথমত, জরুরি হলো একটি সমন্বিত প্রাথমিক সতর্কীকরণ ও তথ্য ব্যবস্থাপনা কাঠামো তৈরি। ভিয়েতনাম দেখিয়েছে কীভাবে স্বল্প সম্পদ দিয়েও কার্যকর সতর্কীকরণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা যায়। তারা দেশব্যাপী এসএমএসভিত্তিক সতর্কতা ব্যবস্থা চালু করেছে, যেখানে গ্রামের মানুষ সহজেই নিবন্ধন করতে পারে। হুয়ে শহরে স্মার্ট ফ্লাড টাওয়ার, নদীর স্তর পরিমাপক এবং উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন সাইরেন স্থাপন করা হয়েছে, যা বিদ্যুৎ বিভ্রাটকালেও কাজ করে। হো চি মিন সিটিতে মেশিন লার্নিং ব্যবহার করে রিয়েল-টাইম বন্যা-পূর্বাভাস দেওয়া হচ্ছে। আমাদেরও এ প্রযুক্তি গ্রহণ করতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, নেদারল্যান্ডস, যুক্তরাষ্ট্রের মতো নদীর তথ্য সবার জন্য উন্মুক্ত করা। বর্তমানে আমাদের পানি উন্নয়ন বোর্ড যে তথ্য লুকিয়ে রাখে এবং বিক্রি করে, তা অবিলম্বে বন্ধ করে অনলাইনে সবার জন্য উন্মুক্ত করতে হবে যাতে গবেষক, এনজিও, স্থানীয় সরকার স্বাধীনভাবে বন্যার পূর্বাভাস মডেল তৈরি করতে পারে।

দ্বিতীয়ত, আমাদের বন্যা নিয়ন্ত্রণ অবকাঠামোয় আমূল পরিবর্তন আনতে হবে। নেদারল্যান্ডসের ডেল্টা ওয়ার্কস আমাদের জন্য অনুকরণীয় উদাহরণ। ১৯৫৩ সালের বিধ্বংসী বন্যার পর তারা শুধু বাঁধই তৈরি করেনি, বরং একটি সম্পূর্ণ নতুন দর্শন গ্রহণ করেছে। তাদের ‘ডেল্টা নর্ম’ অনুযায়ী প্রতিটি বাঁধ এমনভাবে তৈরি করা হয় যে এক লাখে মাত্র একজনের মৃত্যুঝুঁকি থাকে। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো তাদের ‘বিল্ডিং উইথ নেচার’ এবং ‘রুম ফর দ্য রিভার’ পদ্ধতি, যেখানে নদীকে তার প্রাকৃতিক প্রবাহের জন্য জায়গা দেওয়া হয়, প্রকৃতিবান্ধব সমাধান খোঁজা হয়। আমাদের বর্তমান ‘প্যাচ অ্যান্ড মেন্ড’ পদ্ধতি পরিত্যাগ করে এই আধুনিক পদ্ধতি গ্রহণ করতে হবে। সেই সঙ্গে নেদারল্যান্ডসের মতো একজন স্বাধীন ডেল্টা কমিশনার নিয়োগ করতে হবে, যিনি সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর অধীনে কাজ করবেন এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকবেন। দুর্নীতি রোধে সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের কথাও ভাবা যেতে পারে।

তৃতীয়ত, আন্তঃসীমান্ত পানি ব্যবস্থাপনায় আমাদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে হবে। আন্তর্জাতিক নদী আইন অনুযায়ী উজানের দেশ বাঁধের পানি ছাড়ার ৭২ ঘণ্টা আগে ভাটির দেশকে জানাতে বাধ্য। কিন্তু ভারত এই নিয়ম মানছে না। গত আগস্টে ফারাক্কার ১০৯টি গেট খুলে দিয়ে প্রতি সেকেন্ডে ১১ লাখ ঘনফুট পানি ছাড়া হয়েছিল কোনো পূর্ব বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই। আমাদের অবশ্যই নিজস্ব স্যাটেলাইট পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা এবং উজানের নদীগুলোতে স্বয়ংক্রিয় পানি মাপার যন্ত্র স্থাপন করতে হবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক ফোরামে বিষয়টি জোরালোভাবে তুলে ধরতে হবে এবং বাধ্যতামূলক চুক্তির জন্য চাপ সৃষ্টি করতে হবে। ভারতের সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করার দিন শেষ করতে হবে।

চতুর্থত, কৃষি ও জীবিকা সুরক্ষায় বিশেষ কর্মসূচি নিতে হবে। প্রতি বন্যায় যখন হাজার হাজার কৃষক সর্বস্ব হারান, তখন তাদের পুনর্বাসন অত্যন্ত জরুরি। বন্যা-সহনশীল ফসলের জাত উদ্ভাবন ও বিতরণ, কৃষকদের জন্য বিশেষ বীমা স্কিম এবং দুর্যোগ-পরবর্তী দ্রুত ঋণ সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। বিশ্বব্যাংক ইতোমধ্যে বাংলাদেশকে বন্যা ব্যবস্থাপনায় ৭৭০ মিলিয়ন ডলার সহায়তা দিয়েছে। এই অর্থ সঠিকভাবে ব্যবহার করে টেকসই সমাধান তৈরি করতে হবে। সেই সঙ্গে প্রতিটি উপজেলায় পর্যাপ্ত ওষুধ মজুত, মোবাইল মেডিকেল টিম এবং বন্যা আশ্রয়কেন্দ্রকে স্কুল হিসেবে ব্যবহারের ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ না হয়। সব শেষে রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

নেদারল্যান্ডস, ভিয়েতনাম, এমনকি আমাদের পাশের দেশ ভারতের কেরালা রাজ্য দেখিয়েছে যে, সঠিক পরিকল্পনা এবং রাজনৈতিক অঙ্গীকার থাকলে বন্যা মোকাবিলা সম্ভব। বাংলাদেশের কাছেও প্রয়োজনীয় আর্থিক সম্পদ, প্রযুক্তিগত জ্ঞান এবং আন্তর্জাতিক সহায়তা রয়েছে। বিশ্বব্যাংক ইতোমধ্যে ৪৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি সহায়তা দিয়েছে। যা নেই তা হলো, স্বল্পমেয়াদি রাজনৈতিক লাভের চেয়ে দীর্ঘমেয়াদি জনকল্যাণকে অগ্রাধিকার দেওয়ার মানসিকতা এবং কেবল ঘোষণার পরিবর্তে বাস্তব সমাধান বাস্তবায়নে সক্ষম প্রতিষ্ঠান।

আবু রায়হান: ইকোহাইড্রোলজিতে পিএইচডি গবেষক, কানসাস স্টেট ইউনিভার্সিটি, যুক্তরাষ্ট্র
[email protected]

আরও পড়ুন

×