ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

তথ্যপ্রযুক্তি

২০৪০ সালের শ্রেণিকক্ষ কেমন হবে

২০৪০ সালের শ্রেণিকক্ষ কেমন হবে
×

কাজী হাসান রবিন

প্রকাশ: ০১ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৮:৫৯ | আপডেট: ০১ ডিসেম্বর ২০২৫ | ১২:৫০

বর্তমানে যে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে আমরা পরিচিত, তার শিকড় প্রোথিত সুদূর শিল্পবিপ্লবের যুগে। কলকারখানার উত্থান ও নগরায়ণের প্রয়োজনে এক দল শিক্ষিত কর্মীর চাহিদা মেটাতে হোরেস ম্যানের মতো শিক্ষাবিদরা জনশিক্ষার ধারণাটি সামনে এনেছিলেন।

এ যুগেই আধুনিক জনশিক্ষার সূচনা হয়, যার মূল লক্ষ্য ছিল শিশুদের শিল্পসমাজের জন্য প্রস্তুত করা। আর এই ‘ওয়ান সাইজ ফিটস অল’ মডেলই গত শতাব্দী ধরে শিক্ষার মূল কাঠামো হয়ে রয়েছে। কিন্তু যে বিশ্বের প্রয়োজনে এই ব্যবস্থার জন্ম হয়েছিল, সে বিশ্ব আজ আমূল বদলে গেছে। আমরা এখন স্বয়ংক্রিয়করণ (অটোমেশন), কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) সাইবার অ্যাটাক, রোবটিক্স, এআই সিঙ্গুলারিটিসহ নানাবিধ জটিল বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জের যুগে বাস করছি।

এক মুহূর্তের জন্য চোখ বন্ধ করে ২০৪০ সালের একটি ক্লাসরুম কল্পনা করা যাক। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশুরা কোনো বেঞ্চে বসে তোতাপাখির মতো পাঠ্যপুস্তক মুখস্থ করছে না। তারা চোখে ভিআর হেডসেট লাগিয়ে হয়তো তখন আটলান্টিক মহাসাগরের গভীরে বিচরণ করছে, অথবা অগমেন্টেড রিয়েলিটির মাধ্যমে সৌরজগতের গ্রহ-নক্ষত্র নিজ হাতে নিয়ে দেখছে। শিক্ষকও সেখানে তথ্যভান্ডার হিসেবে নয়, বরং একজন ‘গাইড’ বা ‘কোচ’-এর ভূমিকায় শিশুদের প্রশ্ন করতে শেখাচ্ছেন, তাদের কৌতূহল উস্কে দিচ্ছেন।

কোনো সায়েন্স ফিকশন নয়, বরং বিশ্বজুড়ে শিক্ষাবিদদের ভাবনায় এটিই হলো ২০৪০ সালের শিক্ষার বাস্তবসম্মত দৃশ্যপট। যখন আমাদের সন্তানরা রোবটিক্স আর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জগতে ইতোমধ্যে পা রেখেছে, তখন কি আমরা তাদের সেই ১৯৫০ সালের তৈরি পুরোনো মানচিত্র ধরেই পথ দেখাব? এটাই এই মুহূর্তে আমাদের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হওয়া উচিত। এই প্রযুক্তি এবং পরিবর্তিত বৈশ্বিক চাহিদার নিরিখে সারাবিশ্বেই শিক্ষা ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন আসন্ন। আমাদের দেশেও তাই এ বাস্তবতা অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই– দলমত নির্বিশেষে তা সবাইকে অনুধাবন করতে হবে।

প্রাথমিক ও মাধ্যমিকে নতুন জ্ঞান অন্বেষণ

আগামী দুই দশকে স্কুল ও কলেজ স্তর এমনভাবে পরিবর্তিত হবে, যা আমাদের বর্তমান ধারণা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন হবে বলে ধারণা করছি। ভবিষ্যতের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা ‘মুখস্থকেন্দ্রিক’ না হয়ে হবে ‘দক্ষতাকেন্দ্রিক’। এই নতুন মডেলে শিশুরা শুধু তথ্য গ্রহণ করবে না, বরং তারা নিজেরাই সক্রিয়ভাবে জ্ঞান অন্বেষণ করবে। পাঠ্যপুস্তকের বাইরে গিয়ে তারা প্রজেক্টভিত্তিক কাজে অংশ নেবে; বাস্তব জীবনের সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করবে। এর মধ্য দিয়েই তাদের ভেতর নানামুখী দক্ষতা তৈরি হবে। এসব কাজে প্রযুক্তিই হবে তাদের প্রধান সহযোগী।

এই রূপান্তরের মূলে থাকবে শিক্ষাকে ‘গড় শিক্ষার্থীর’ ধারণা থেকে বের করে আনা। উদাহরণ হিসেবে আমরা যদি একটু ভেবে দেখি, ভিড়ের মধ্যে হাঁটতে থাকা প্রত্যেক মানুষের হাঁটার গতি, ছন্দ বা গন্তব্য নিশ্চয় এক না। তাহলে কেন আমরা একটি ক্লাসরুমে ৩০ জন ভিন্ন মস্তিষ্কের শিশুর কাছে থেকে একই গতিতে, একই সময়ে, একই বিষয় শেখার আশা রাখি? আশা করা যায়, ২০৪০ সালের আগেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এই বিষয়ে আমাদের বিকল্প পথ দেখাবে। যার ফলে প্রত্যেক শিশুর শেখার গতি, আগ্রহ এবং চাহিদার সঙ্গে খাপ খাইয়ে একটি ব্যক্তিকেন্দ্রিক শিক্ষাপথ তৈরির সুযোগ হবে। এই ব্যবস্থা শিক্ষায় সমতা আনার ক্ষেত্রেও বৈপ্লবিক ভূমিকা রাখবে।

ভবিষ্যতের প্রযুক্তিনির্ভর ক্লাসরুমে মানবিক সংযোগ ধরে রাখা হবে আরেক চ্যালেঞ্জ। প্রযুক্তি যখন ব্যক্তিকেন্দ্রিক শিক্ষণ পরিবেশ তৈরি করবে, তখন মানসিক স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা এবং ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষার বিষয়টি সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। এর সমাধান হিসেবে বিদ্যালয়গুলো তখন কেবল পাঠদানের কেন্দ্র না থেকে পরিবার ও সম্প্রদায়ের সক্রিয় অংশগ্রহণে একটি পূর্ণাঙ্গ সামাজিক শিক্ষাকেন্দ্রে রূপান্তরিত হবে।

উচ্চশিক্ষায় নিজের পথ নিজে গড়ার স্বাধীনতা

ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের পূর্বাভাস অনুযায়ী, প্রযুক্তিগত পরিবর্তনে প্রচলিত অনেক পেশা বিলুপ্ত এবং সম্পূর্ণ নতুন ধরনের কর্মসংস্থান হবে। বিশ্বব্যাপী পরিবর্তনের এই নতুন বাস্তবতার প্রেক্ষিতে ওইসিডির শিক্ষা পরিচালক আন্দ্রেয়াস শ্লাইখারের একটি গুরুত্বপূর্ণ উক্তি প্রণিধানযোগ্য: ‘আমাদের এমন কাজের জন্য শিক্ষার্থীদের প্রস্তুত করতে হবে যা এখনও তৈরি হয়নি; এমন প্রযুক্তি ব্যবহার করতে শেখাতে হবে যা এখনও আবিষ্কৃত হয়নি এবং এমন সামাজিক সমস্যার সমাধান করতে শেখাতে হবে যা আমরা এখনও কল্পনা করতে পারিনি। কেবল চাকরির জন্য সাধারণ প্রশিক্ষণ এখন আর যথেষ্ট নয়।’ 

পরিবর্তনের এই নতুন প্রেক্ষিতে উচ্চ মাধ্যমিক বা কলেজ পর্যায়ে ‘সায়েন্স, আর্টস, কমার্স’– এই প্রচলিত বিভাজন হয়তো আর আগের মতো কার্যকর থাকবে না। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, উন্নত বিশ্বের অনেক দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে ভিন্ন ভিন্ন স্কুল টাইপ বা প্রোগ্রামের মাধ্যমে এক ধরনের বিশেষায়নের সুযোগ থাকলেও এশীয় অঞ্চলের দেশগুলোর মতো ‘বিজ্ঞান, মানবিক ও বাণিজ্য’ বিভাজন সে অর্থে নেই। আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থায় বরং এ কাঠামো আরও বৈচিত্র্যপূর্ণ ও নমনীয়। কারণ, উন্নত শিক্ষা ব্যবস্থাগুলো চাইছে শিক্ষার্থীরা অল্প বয়সে কোনো একটি ধারার মধ্যে আটকে না গিয়ে বিভিন্ন বিষয় অনুসন্ধানের সুযোগ পাক, যা তার মধ্যে একবিংশ শতকের কর্মজীবনে প্রয়োজনীয় জটিল সমস্যার সমাধান, বিশ্লেষণী দক্ষতা, সৃজনশীলতা এবং বহুমাত্রিক চিন্তাশক্তি গড়ে তুলতে সহায়ক হবে। পাশাপাশি এ ধরনের সুষম শিক্ষা ব্যবস্থা নির্দিষ্ট শাখাকে ভিত্তি করে সামাজিক মর্যাদার যে পার্থক্য তৈরি হয়, সেটি কমাতেও সাহায্য করে।

নতুন এই দক্ষতাভিত্তিক মডেলে শিক্ষার্থীরা শুধু যে তত্ত্বই শিখবে না; বরং তারা রিমোট ‘এক্সটার্নশিপ’ বা বাস্তব প্রজেক্টে অংশ নিয়ে সরাসরি শিল্পের অভিজ্ঞতা অর্জন করবে। দক্ষিণ কোরিয়ার ‘ম্যাইস্টার’ হাই স্কুলের মতো বিশেষায়িত ভোকেশনাল প্রতিষ্ঠানগুলো, যা নির্দিষ্ট শিল্পের (যেমন: নিউ মিডিয়া বা এনার্জি) জন্য হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দেয়, তা হয়তো বিশ্বব্যাপী একটি সফল মডেলে পরিণত হবে।

শিক্ষার্থীদের দক্ষতা মূল্যায়নের পদ্ধতিও বদলে যাবে বলে ধারণা করা যায়। প্রথাগত দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষা শেষে প্রাপ্ত ডিগ্রির চেয়ে ‘স্টেকেবল সার্টিফিকেট’ বা ক্ষুদ্র সনদগুলো বাজারে বেশি মূল্যবান হয়ে উঠবে। উচ্চ চাপের প্রথাগত পরীক্ষার বদলে প্রাধান্য পাবে ‘দক্ষতাভিত্তিক মূল্যায়ন’, যেখানে শিক্ষার্থীরা তাদের নিজস্ব গতিতে দক্ষতা অর্জন করবে। প্রথাগত গ্রেড-শিটের বদলে শিক্ষার্থীর অর্জনের একটি সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরার জন্য এখন অনেক আন্তর্জাতিক ফোরাম ‘দক্ষতার ট্রান্সক্রিপ্ট’ তৈরির উদ্যোগ নিচ্ছে। এটি শিক্ষার্থীকে তার অর্জিত সক্ষমতা দিয়ে পরিচয় করিয়ে দেবে, কেবল মুখস্থবিদ্যা দিয়ে অর্জিত গ্রেড দিয়ে নয়।

ভবিষ্যতের বাস্তবতায় শিক্ষকের ভূমিকা

ভবিষ্যতের শিক্ষা ব্যবস্থার এই পরিবর্তনের ফলে শিক্ষকের ভূমিকাতেও আসবে আমূল রূপান্তর। শিক্ষাবিদ অ্যালিসন কিং যেমনটা বলেছিলেন, শিক্ষকের ভূমিকা ‘মঞ্চের মহামনীষী’ থেকে সরে গিয়ে হয়ে উঠবে ‘পথপ্রদর্শক সঙ্গী’। সমসাময়িক গবেষণা রিপোর্টগুলোও বলছে, শিক্ষকরা তথ্যের ‘দ্বাররক্ষী’ না থেকে বরং হয়ে উঠবেন ‘শিক্ষার রূপকার’। এই নতুন কাঠামোতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) শিক্ষকদের রুটিন প্রশাসনিক কাজ, যেমন গ্রেডিং বা পাঠ-পরিকল্পনার মতো ক্ষেত্রগুলোতে সহায়তা করে তাদের মূল্যবান সময় বাঁচিয়ে দেবে। শিক্ষকরা সেই সময় ব্যয় করবেন শিক্ষার্থীদের মানসিক ও সামাজিক বিকাশে; তাদের নৈতিকতা, সহানুভূতি এবং মানবিক মূল্যবোধ শেখাতে। ফলস্বরূপ, শিক্ষকদের সময় তথ্য বিতরণে নয়, বরং ছাত্রদের সামগ্রিক মানোন্নয়নে নিযুক্ত হবে।

বাংলাদেশের বাস্তবতা ও তুলনামূলক চিত্র

বৈশ্বিক এই পটভূমিতে বাংলাদেশের প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষার বর্তমান অবস্থার একটি তুলনামূলক বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। বৈশ্বিক আধুনিকায়নের পরিপ্রেক্ষিতে শিক্ষা ব্যবস্থায় পরিবর্তন জরুরি। তবে এই রূপান্তর অবশ্যই গবেষণাভিত্তিক, সুচিন্তিত, সুদূরপ্রসারী এবং দীর্ঘ মেয়াদে ফলপ্রসূ হওয়া আবশ্যক। শিক্ষা সংস্কারের নামে নেওয়া কোনো ত্বরিত বা হঠকারী পদক্ষেপ যেন আমাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ নষ্ট না করে, বা তারা যেন কারও খেয়ালি চিন্তার ‘গিনিপিগ’ না হয়, সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখা প্রয়োজন। দুর্ভাগ্যবশত, আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলো এখনও অনেকাংশে শিল্পবিপ্লব যুগের সেই ‘সবার জন্য এক’ মডেলকে আঁকড়ে ধরে আছে, যেখানে শিখন প্রক্রিয়া মুখস্থ ও পরীক্ষার ফলের ওপর অত্যধিক নির্ভরশীল।

এক দশকেরও বেশি সময় আগে প্রণীত জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ (যা প্রায় ১৫ বছরের পুরোনো) বাস্তবায়নে ধীরগতি বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার সামনে মৌলিক চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করেছে। এই নীতির মূল ভিত্তি ছিল প্রাথমিক শিক্ষাকে পঞ্চম থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত এবং মাধ্যমিক শিক্ষাকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত সম্প্রসারণ করা। দুঃখজনক, ২০১৮ সালের সময়সীমা পেরিয়ে যাওয়ার পরও এই মৌলিক সংস্কারগুলো কাঙ্ক্ষিত গতি পায়নি। প্রয়োজনীয় শিক্ষক প্রশিক্ষণ, অবকাঠামোর উন্নয়ন ও কার্যকর তদারকির অভাবে পরীক্ষামূলক কার্যক্রমগুলো প্রত্যাশিত ফল দিতে পারেনি। উপরন্তু শিক্ষানীতির মূল চেতনার পরিপন্থি হয়ে কোচিং ও নোট-গাইড বইয়ের জন্য সহায়ক সুযোগ এখনও বিদ্যমান, যা কার্যত মুখস্থনির্ভর শিক্ষাকেই বৈধতা দিচ্ছে এবং গুণগত মানোন্নয়নের পথে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়েছে।

এ অবস্থার বিপরীতে বিশ্বজুড়ে শিক্ষার ধারণা ও পদ্ধতির আমূল পরিবর্তন ঘটছে। বিশ্ব যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত চাহিদা অনুযায়ী অভিযোজনযোগ্য শিক্ষণ পদ্ধতি এবং ভিআর/এআর-নির্ভর অভিজ্ঞতা চালুর প্রস্তুতি নিচ্ছে, সেখানে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় এখনও প্রযুক্তির ব্যবহার মূলত সাধারণ মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুমেই সীমাবদ্ধ। বৈশ্বিক মানদণ্ডে উচ্চ স্তরের অর্জন বলতে কেবল বেশি জ্ঞান নয়, বরং সেই জ্ঞানের গভীর ধারণাগত বোঝাপাড়া এবং তার বিশেষজ্ঞ প্রয়োগকে বোঝায়। অথচ আমাদের শিক্ষার্থীদের শিক্ষণফল এখনও উচ্চ চাপের জিপিএ-কেন্দ্রিক পরীক্ষার সংস্কৃতি দ্বারা চালিত। এ পরিস্থিতিতে শিক্ষক প্রশিক্ষণের দিকে তাকালে দেখা যায়, একুশ শতকের দক্ষতাভিত্তিক পাঠদানের জন্য শিক্ষকদের প্রস্তুত করার ক্ষেত্রেও বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। যদি আমরা দ্রুত আমাদের পাঠ্যক্রম থেকে অপ্রয়োজনীয় তাত্ত্বিক বোঝা কমাতে এবং অত্যাধুনিক প্রযুক্তিগত অবকাঠামো নির্মাণে ব্যর্থ হই, তবে আমাদের বর্তমান সার্টিফিকেটগুলো বিশ্বমঞ্চে দ্রুতই তার প্রাসঙ্গিকতা হারাবে এবং আমাদের তরুণ প্রজন্ম বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বে।

চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় করণীয়

বাংলাদেশের বর্তমান জাতীয় শিক্ষানীতি প্রায় ১৫ বছরের পুরোনো। বর্তমান বাস্তবতায় দ্রুত একটি নতুন, আধুনিক ও যুগোপযোগী শিক্ষানীতি প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। মানুষ সহজেই নতুন কিছুর সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারে না। সে জন্য যে কোনো পরিবর্তনই কঠিন। শিক্ষা খাতে তা আরও বেশি। বেশির ভাগ অভিভাবকই আশা করেন, স্কুলগুলো তারা যেমন দেখেছেন বা তারা যে শিক্ষা কার্যক্রমে শিক্ষা গ্রহণ করে এসেছেন তেমনই থাকবে। যদিও এমন পশ্চাৎপদ ভাবনা আমাদের জাতির ভবিষ্যতের জন্য ঝুঁকির কারণ হতে পারে। এর পাশাপাশি নতুন শিক্ষানীতি নিয়ে থাকতে পারে নানান মত ও পথের বিরোধিতা, তবে সেই বিরোধ মেটাতেও নিতে হবে কার্যকর পদক্ষেপ, চাপিয়ে দিয়ে নয় বরং সব অংশীজনের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমেই তা হতে হবে। এই বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নীতিনির্ধারক, শিক্ষাবিদ এবং অভিভাবকদের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। ব্যর্থতার কারণগুলো চিহ্নিত করে নিম্নলিখিত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। 

প্রথমত, নীতি ও পাঠ্যক্রমের আমূল সংস্কার করা আবশ্যক। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার এসডিজি ৪ অর্জন এবং পৃথিবীর দ্রুত পরিবর্তনের কথা মাথায় রেখে শিক্ষানীতিকে কমপক্ষে প্রতি ১০ বছরে একবার পর্যালোচনা করা আবশ্যক। এই নীতি অবশ্যই গবেষণার ওপর ভিত্তি করে হতে হবে। পাঠ্যক্রমের আধুনিকায়ন করে কোডিং, ক্রিয়েটিভ থিঙ্কিং, বিশ্লেষণাত্মক চিন্তাভাবনা এবং মাল্টিডিসিপ্লিনারি বিষয়গুলোকে প্রাথমিক পর্যায় থেকেই অন্তর্ভুক্ত করা অপরিহার্য। পাশাপাশি প্রজেক্ট-ভিত্তিক শিক্ষাকে পাঠ্যক্রমের কেন্দ্রে নিয়ে আসার কথা ভাবা যেতে পারে। উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষায় বিশেষায়িত ভোকেশনাল প্রতিষ্ঠানগুলোর সফল মডেল অনুকরণীয় হতে পারে। 

দ্বিতীয়ত, শিক্ষকদের ক্ষমতায়ন ও মূল্যায়ন ব্যবস্থার পরিবর্তন জরুরি। যদি বর্তমান শিক্ষকরা নতুন প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষণ পদ্ধতিতে প্রস্তুত না হন এবং আমরাও তাদের প্রশিক্ষণে বিনিয়োগ না করি, তবে প্রতিষ্ঠানগুলো দ্রুত দক্ষ শিক্ষকের সংকটে পড়বে। শিক্ষার গুণগত মান নিম্নগামী হবে এবং মেধাবী শিক্ষকরা অন্য পেশায় স্থানান্তরিত হতে পারেন, যা শিক্ষার ভিত নড়বড়ে করে দেবে। এ জন্য শিক্ষকদের নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার, ব্যক্তিকেন্দ্রিক পাঠদান এবং মেন্টরশিপের ভূমিকা নিতে প্রস্তুত করতে ধারাবাহিক প্রশিক্ষণে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। এর পাশাপাশি শিক্ষকদের বেতন-ভাতা আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসারে একটি সম্মানজনক পর্যায়ে উন্নীত করার লক্ষ্যে আশু পদক্ষেপ নিতে হবে।

তৃতীয়ত, উচ্চ চাপের জিপিএ-কেন্দ্রিক পরীক্ষার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে একটি ‘দক্ষতাভিত্তিক মূল্যায়ন’ চালু করা আবশ্যক, যা একজন শিক্ষার্থীর মুখস্থ করা তথ্যের চেয়ে তার প্রকৃত সক্ষমতা ও জ্ঞান প্রয়োগের ক্ষমতাকে প্রতিফলিত করবে। 

এসব লক্ষ্য ও কর্মপরিকল্পনা সামনে রেখে একটি স্থায়ী জাতীয় শিক্ষা কমিশন গঠন করা প্রয়োজন, যা বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করবে এবং গুণগত মান বজায় রাখবে।

বৈশ্বিক এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দ্রুততম সময়ের মধ্যে একটি যুগোপযোগী শিক্ষানীতি প্রণয়নে ব্যর্থ হলে আমাদের ভবিষ্যৎ সামাজিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। যদি আমাদের সন্তানদের ১৯৫০-এর মানচিত্র মেনে চলা বাজারের জন্য প্রস্তুত করি, তবে ২০৪০-এ গিয়ে তারা বিশ্ব অর্থনীতিতে নিজেদের টিকিয়ে রাখতে পারবে না। ফলস্বরূপ, জাতীয় উৎপাদনশীলতা হ্রাস পাবে, বৈষম্য বাড়বে এবং সামগ্রিকভাবে একটি স্থিতিশীল সমাজের ভিত্তি বিপন্ন হবে। ২০৪০ সালের শিক্ষালোক কেবল একটি পূর্বাভাস নয়; আমাদের জন্য আবশ্যিক আহ্বান। এখন থেকেই প্রস্তুতি শুরু না করলে আমরা কেবল শিক্ষাক্ষেত্রে নয়, বরং জাতীয় ভাগ্য নির্ধারণের ক্ষেত্রেও সম্ভবত এক বিরাট সুযোগ হারাতে চলেছি।

কাজী হাসান রবিন: সহযোগী অধ্যাপক, ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ

আরও পড়ুন

×