ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

তথ্যপ্রযুক্তি

ইন্টারনেট কি যুদ্ধাস্ত্র হয়ে উঠছে?

ইন্টারনেট কি যুদ্ধাস্ত্র হয়ে উঠছে?
×

মশিউর রহমান

মশিউর রহমান

প্রকাশ: ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ০৯:৫০

আধুনিক পৃথিবীতে যুদ্ধ মানে শুধু ট্যাঙ্ক-মিসাইল নয়, যোগাযোগ ব্যবস্থার দখলও। যোগাযোগ ব্যবস্থা মানে পূর্বের মতো ব্রিজ কিংবা বিমানবন্দর নয়, ডিজিটাল যোগাযোগ বা ইন্টারনেট। যে পক্ষ তথ্য পাঠাতে ও পেতে পারে, সে-ই এ মাধ্যমে কৌশলগতভাবে এগিয়ে থাকে।

ভেতরে-বাইরের শক্তির চাপ মোকাবিলায় সরকার কখনও কখনও ইন্টারনেটভিত্তিক যোগাযোগ ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ নেয়। আর এ পরিস্থিতিতে সরকারি ব্যবস্থার ইন্টারনেট নয়, বরং স্টারলিংকের মতো সার্ভিসগুলোর চাহিদা বাড়ছে। কেননা, সেটেলাইটভিত্তিক এ সেবার ওপর সংশ্লিষ্ট সরকারের নিয়ন্ত্রণ আরোপ প্রায় অসম্ভব।

স্টারলিংকের মতো স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক তাই আজ কেবল বেসামরিক ইন্টারনেট সেবা নয়, বরং কৌশলগত অবকাঠামো। প্রাকৃতিক দুর্যোগে যোগাযোগ রক্ষা, দূরশিক্ষা, টেলিমেডিসিন থেকে শুরু করে সংঘাতের সময় মাঠ পর্যায়ে যোগাযোগ ধরে রাখা– সবখানেই এই সেবার ভূমিকা ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। এখান থেকেই স্যাটেলাইটকে ঘিরে নতুন ধরনের অস্ত্র ও প্রযুক্তির আলোচনা শুরু হয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে সম্প্রতি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে আলোচিত হয়েছে চীনের একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন মাইক্রোওয়েভ যন্ত্র (টিপিজি১০০০সিএস) যাকে কিছু সংবাদমাধ্যম ‘স্টারলিংকের দুঃস্বপ্ন’ আখ্যা দিয়েছে। দাবি করা হচ্ছে, এটি পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথে থাকা স্যাটেলাইটের ইলেকট্রনিক ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটাতে পারে। বিষয়টি খতিয়ে দেখা যেতে পারে। চীনের আলোচিত টিপিজি১০০০সিএস মূলত একটি উচ্চ শক্তির মাইক্রোওয়েভ ব্যবস্থা। মাইক্রোওয়েভ হলো তড়িৎ চুম্বকীয় তরঙ্গের একটি ধরন, যার মাধ্যমে ওয়াই-ফাই চলে, স্যাটেলাইটে সংকেত পাঠানো হয় এবং রান্নাঘরে খাবার গরম করা হয়। কিন্তু অত্যন্ত শক্তিশালী মাইক্রোওয়েভ ইলেকট্রনিক সার্কিটে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ প্রবাহ তৈরি করে শর্টসার্কিট ঘটাতে পারে।

চীনের তৈরি এই যন্ত্রটি ২০ গিগাওয়াট ক্ষমতার পালসড মাইক্রোওয়েভ তৈরি করতে পারে এবং আকারে তুলনামূলকভাবে ছোট হওয়ায় এটি যানবাহনে বহনযোগ্য। স্যাটেলাইটে সাধারণত বিকিরণ-সহনশীল ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হয় এবং পৃথিবী থেকে মহাকাশে সংকেত পৌঁছাতে গেলে দূরত্ব ও বায়ুমণ্ডলীয় ক্ষয়ের মতো বাস্তব সীমাবদ্ধতা কাজ করে। ফলে চীনের ওই যন্ত্রকে ‘স্টারলিংক ধ্বংসকারী অস্ত্র’ আখ্যা দেওয়া হয়তোবা এই মুহূর্তে অতিমাত্রায় নাটকীয় ব্যাপার।

মাইক্রোওয়েভ ছাড়াও স্যাটেলাইট বিঘ্নিত করার আরও প্রযুক্তি নিয়ে আলোচনা চলছে। একটি হলো, কাইনেটিক অ্যাসাট (এএসএটি) মিসাইল, অর্থাৎ সরাসরি ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে স্যাটেলাইটে আঘাত হানা। অতীতে কয়েকটি দেশ পরীক্ষামূলকভাবে এমন প্রযুক্তি প্রদর্শন করেছে। তবে এই ধরনের আক্রমণে বিপুল মহাকাশ-বর্জ্য সৃষ্টি হয়, যা শুধু লক্ষ্যবস্তুর নয়, পৃথিবীর কক্ষপথে থাকা অন্যান্য বেসামরিক স্যাটেলাইটের জন্যও দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি তৈরি করে। তাই এই পদ্ধতি কৌশলগতভাবে যেমন কার্যকর, তেমনি রাজনৈতিক ও পরিবেশগতভাবে বিপজ্জনক।

আরেকটি সম্ভাব্য দিক হলো, ডাইরেক্টেড বা লক্ষ্যভেদী এনার্জি লেজারস। উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন লেজার দিয়ে স্যাটেলাইটের সেন্সর বা যোগাযোগ যন্ত্রাংশ সাময়িকভাবে অন্ধ করে দেওয়ার ধারণা নিয়ে গবেষণা চলছে। তাত্ত্বিকভাবে এটি সম্ভব হলেও বাস্তবে দ্রুতগতিতে চলমান স্যাটেলাইটে নির্ভুলভাবে লেজার ফোকাস রাখা, বায়ুমণ্ডলীয় বিকৃতি সামলানো এবং পর্যাপ্ত শক্তি বজায় রাখা– এসবই বড় প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ। এই প্রযুক্তি এখনও অনেকাংশেই গবেষণাগারের সীমায় রয়েছে।

এই প্রযুক্তিগত আলোচনার বাস্তব রাজনৈতিক দিকটি স্পষ্টভাবে দেখা গেছে ইরানে। রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় সেখানে বারবার ইন্টারনেট সীমিত বা বন্ধ করা হয়েছে, যাতে তথ্যপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। এমন পরিস্থিতিতে স্টারলিংকের মতো স্যাটেলাইট-ইন্টারনেট বিকল্প যোগাযোগের পথ হিসেবে সামনে আসে। এতে একদিকে নাগরিকরা বাইরের বিশ্বের সঙ্গে যুক্ত থাকার সুযোগ পান, অন্যদিকে রাষ্ট্রের দৃষ্টিতে এটি নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করে। ফলে ইন্টারনেট আর কেবল প্রযুক্তিগত অবকাঠামো নয়; এটি সরাসরি রাষ্ট্রের ক্ষমতা ও নাগরিকের অধিকারের সংঘাতের কেন্দ্রে অবস্থান করছে।

এ দুই প্রেক্ষাপট একসঙ্গে দেখায়, যুদ্ধের চরিত্র বদলে যাচ্ছে। একসময় যুদ্ধ সীমাবদ্ধ ছিল মাটিতে ও সমুদ্রে; পরে আকাশ যুক্ত হয়েছে। এখন যুক্ত হচ্ছে সাইবার জগৎ ও মহাকাশভিত্তিক যোগাযোগ অবকাঠামো। কোনো দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা বিঘ্নিত হলে তার প্রভাব পড়ে প্রশাসন, জরুরি সেবা, গণমাধ্যম ও সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে। অর্থাৎ যুদ্ধের আঘাত আর শুধু সেনাবাহিনীর ওপর সীমাবদ্ধ থাকে না; তা সরাসরি সমাজের ওপর পড়ে।

ইন্টারনেট কি তাহলে সত্যিই যুদ্ধের অস্ত্রে পরিণত হচ্ছে? বাস্তবতা হলো, ইন্টারনেট নিজে অস্ত্র নয়, কিন্তু ইন্টারনেটের ওপর নিয়ন্ত্রণ, স্যাটেলাইট যোগাযোগে বিঘ্ন ঘটানোর সক্ষমতা এবং তথ্যপ্রবাহ থামিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা আধুনিক ভূরাজনীতিতে ক্রমেই শক্তিশালী হাতিয়ার হয়ে উঠছে।

ড. মশিউর রহমান: ইঞ্জিনিয়ারিং ম্যানেজার, ওমরন হেলথকেয়ার সিঙ্গাপুর
[email protected]

আরও পড়ুন

×