ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

সমাজ

ধর্ষণ কোনো নিষিদ্ধ শব্দ নয়

ধর্ষণ কোনো নিষিদ্ধ শব্দ নয়
×

শিল্পী রহমান

প্রকাশ: ৩০ মার্চ ২০২৬ | ০৭:৪৯

আপনার নিষিদ্ধ বইটি আমি পড়েছি; বলল ১৫ বছরের মেয়েটি। হঠাৎ বুঝতে পারছিলাম না, কোন বইয়ের কথা বলছে। ‘নিষিদ্ধ’ শব্দটি শোনার জন্যও প্রস্তুত ছিলাম না। কয়েক সেকেন্ড পর বুঝলাম ‘ধর্ষণ, ধর্ষক ও প্রতিকার’ বইটির কথা বলছে। বইটি পড়েছে জেনে খুশি হলাম ঠিকই, নাম উচ্চারণে সংকোচ দেখে চিন্তিতও হলাম। 

একদিন পরই বইটি একজন শিক্ষিকার হাতে দিয়ে বললাম, ‘আপনাদের স্কুলের লাইব্রেরিতে রাখুন; কাজে লাগবে। সবাইকে পড়তে উৎসাহিত করবেন।’ সঙ্গে সঙ্গে স্বামী ভদ্রলোক যিনি নিজেও কলেজ শিক্ষক; আঁতকে উঠে বললেন, ‘না না। এটা স্কুলে রাখার বই নয়; স্কুলের বাচ্চারা তো অনেক ছোট।’ আমি ও উপস্থিত আরেক ভদ্রমহিলা বলে উঠলাম, ‘স্কুলের বাচ্চাদের ছোট ভাবছেন? স্কুলে যাওয়া শুরু করেনি– এমন শিশুদেরও তো ধর্ষণ করা হচ্ছে। স্কুলের শিশুদেরই এ বিষয়ে ওয়াকিবহাল করা উচিত বেশি, যাতে নিজেকে রক্ষা করতে শেখে। বিপদ কার কাছ থেকে আসতে পারে; কেমন করে আসতে পারে এবং কীভাবে নিজেকে রক্ষা করতে হয়– সে ব্যাপারে সচেতন করতে হবে।’ 

মনে আছে, ২০২০ সালে মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে সঞ্চালক নিজেই বইটির নাম বলতে সংকোচ করছিলেন। তিনিও এটাকে ‘নিষিদ্ধ’ ভেবে সতর্কতা অবলম্বন করেছিলেন।  

যে ঘটনাটি প্রতিদিন ঘটছে, আমরা সেটা গোপন করে অজ্ঞতা ছাড়া কী অর্জন করব? আমরা নিশ্চিন্তে রাক্ষস-খোক্কসের গল্প করছি সন্তানদের কাছে, যার কোনো অস্তিত্বই নেই। কিন্তু আমাদের চারপাশের যেসব মানুষ সুযোগ পেলেই বিষাক্ত ছোবল দিয়ে তছনছ করে দেয় জীবন, তাদের কথা সন্তর্পণে গোপন করে যাই। কী নিশ্চয়তা রয়েছে যে, আমার সন্তানের জীবনে এমন দুর্ঘটনা ঘটবে না! 

মানুষ প্রতিদিন খবরের কাগজ, টিভি, সোশ্যাল মিডিয়ায় ধর্ষণ ও খুন হবার খবর পাচ্ছে এবং প্রচণ্ড হতাশায় বলছে, ‘সমাজটা অসুস্থ হয়ে গেছে; মানুষ আর মানুষ নেই!’ এর পরও বেশির ভাগ মানুষ সন্তানদের এই বিপদ থেকে বাঁচানোর জন্য কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না। শুধু অপরাধীর শাস্তির অপেক্ষায় বসে আছে, যার কোনো নমুনা দেখা যায় না। প্রতিরক্ষা বা প্রতিরোধের প্রসঙ্গ এলেই নারীর পোশাক নিয়ে কথা ওঠে; রাতে বাসার বাইরে থাকা নিয়ে কথা ওঠে; আচরণ নিয়ে কথা ওঠে। কিন্তু বাস্তবে নারী হয়ে ওঠার আগেই শিশুকে ধর্ষণ এবং ক্ষেত্রবিশেষ মেরে ফেলা হচ্ছে। 

হিজাব বা বোরকা পরা নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হওয়ার পরও কারও টনক নড়ছে না– ধর্ষণের সঙ্গে পোশাকের সম্পর্ক নেই। রাতে বাইরে থাকার সঙ্গেও এর সম্পর্ক নেই। কারণ নিজের ঘরে পড়তে বসা মেয়েকেও তুলে নিয়ে গিয়ে দলবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। এত কিছু দেখার পরও মেয়েদের পোশাকে আটকে থাকাকে মূর্খতা ছাড়া আর কী বলা যায়! আমরা শিখছি না, সচেতনও হচ্ছি না।

যারা ধর্ষণ করছে, তারাও তো কারও সন্তান। তারাও পৃথিবীতে নিষ্পাপ হয়ে জন্মেছিল। কেন তারা ধর্ষক হলো– প্রশ্ন করা খুব জরুরি। আমরা কি শিশুকে ধর্ষক না হওয়ার শিক্ষা দিচ্ছি? কেন দিচ্ছি না? আমরা হয়তো ভাবতেই পারি না– নিজের সন্তানও একদিন ধর্ষক হতে পারে। আমাদেরই কারও বাবা, ভাই, বন্ধু কিংবা স্বামী ধর্ষণ করছে। অসম্ভব মনে হলেও কথাটা সত্য। আমরা শুধু কারোরটা জানতে পারছি, কারোরটা পারছি না। সন্তানকে ছোটবেলা থেকে অনেক ভুল ও শুদ্ধ শেখানোর পাশাপাশি এই শিক্ষাটা কেন দিই না আমরা?

প্রশ্ন জাগতে পারে, ৭ বছরের ইরা কী করে বুঝত? হয়তো বুঝত; আমরা তো চেষ্টাই করলাম না। আমরা তাকে বলতে পারতাম, অপরিচিত কারও হাত ধরে যাওয়া নিরাপদ নয়। পরিচিত কারও ভালো স্পর্শ আর খারাপ স্পর্শের পার্থক্য সম্পর্কে অবগত হলে সচেতন থাকত।

সত্তর দশকে আমরা সচেতন ছিলাম ছেলেধরা ঝোলায় ভরে নিয়ে যাবে বলে। ওটাও বাবা-মায়ের দেওয়া শিক্ষা ছিল। এখন যুগ পাল্টেছে, প্রযুক্তির উন্নতি হয়েছে, মানুষের স্বভাব বদলেছে। তাই এখনকার শিক্ষাও ভিন্ন। এখন ‘ধর্ষণ’ কোনো নিষিদ্ধ শব্দ নয়; বাস্তব। এটি গোপন করার অবকাশ নেই।  

আমরা সুন্দর মিথ্যে নিয়ে বাঁচতে ভালোবাসি; কুৎসিত সত‍্যকে কার্পেটের নিচে রেখে দিয়ে ঘুমিয়ে থাকার ভান করি। কিন্তু তাতে সত্য হারিয়ে যায় না; প্রতিদিন চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। 

আর গোপনীয়তা নয়। স্কুলের শিক্ষক এবং অভিভাবকের যৌনতা ও ধর্ষণ বিষয়ে জ্ঞান থাকা প্রয়োজন এবং প্রয়োজনে শিক্ষার্থীদের প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে। প্রশ্ন জাগুক ওদের মনে। যা চিরসত্য, তা জানুক। কম জানা ওদের উপকারে আসে না। সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে ওরা হয়তো ভুল জায়গা থেকে শিখবে। তার চেয়ে অভিভাবকের কাছ থেকে জানা নিরাপদ।

আপনার সন্তানকে ধর্ষণসহ সব রকম বিপদ মোকাবিলা করতে শেখান। ইরার মতো নিষ্পাপ শিশু ধর্ষিত হয়েছে বলে আপনার শিশুকে আরও কয়েক স্তর কাপড়ে মুড়িয়ে রাখলে ধর্ষণ কমবে না।  

ধর্ষণ কমবে ধর্ষকের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হলে; ছেলে শিশুদের প্রয়োজনীয় শিক্ষা দেওয়া হলে এবং মেয়ে শিশুদের বিপদ সম্পর্কে ওয়াকিবহাল করে নিজেকে প্রতিরক্ষার কৌশল শেখানো হলে। আমাদের সন্তানেরা ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। তাই নিজে সচেতন হোন এবং সন্তানকে সচেতন করুন।

শিল্পী রহমান: লেখক ও কাউন্সেলর

আরও পড়ুন

×