নগরায়ণ
ঢাকার ব্লু নেটওয়ার্ক পুনরুদ্ধারে টেকসই কৌশল
স্থপতি ইকবাল হাবিব
ইকবাল হাবিব
প্রকাশ: ১৩ এপ্রিল ২০২৬ | ১২:০৩
বুড়িগঙ্গা-তুরাগ-বালু নদীবেষ্টিত ঢাকার প্রাণশক্তি ছিল তার নদী, খাল, পুকুরসহ অন্যান্য জলাশয়। জালের মতো ছড়িয়ে থাকা খালগুলো ছিল মহানগরীর জীবনসঞ্চারিণী ধমনি। কিন্তু নিয়ন্ত্রণহীন, অপরিকল্পিত ও দখলকেন্দ্রিক নগরায়ণ এই জলজ জীবনরেখাকে প্রায় নিশ্চিহ্ন করে ফেলেছে। বর্তমানে নগরের জলাবদ্ধতা, পরিবেশগত বিপর্যয় ও জনস্বাস্থ্য সংকটের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে জলাশয় ধ্বংস ও অভ্যন্তরীণ খালগুলো বিলুপ্তির ধারাবাহিকতা।
২. জলাশয় ধ্বংসের ইতিহাস ও বাস্তবতা
ঢাকা শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ২০২০ সালের ৩১ ডিসেম্বর ঢাকা ওয়াসার কাছ থেকে ২৬টি খাল (প্রায় ৮০ কিলোমিটার) ও একটি জলাশয় ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের কাছে হস্তান্তর করে। যদিও ২০১৬ সালে ঢাকা জেলা প্রশাসনের সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী ঢাকায় ৫৮টি খালের অস্তিত্বের কথা বলা হয়েছিল; দুই সিটি করপোরেশনের হিসাবে এই সংখ্যা ৬৯। বাস্তবে এখন আর অস্তিত্ব নেই অনেক খালের। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, দখল, দূষণসহ নানান অবহেলায় হারিয়ে গেছে অধিকাংশই। যেসব খালের অস্তিত্ব এখনও আছে, তার মধ্যে ডিএনসিসির তত্ত্বাবধানে ২৯টি খাল, যার দৈর্ঘ্য প্রায় ৮৪ কিলোমিটার। ডিএসসিসি ঢাকা ওয়াসা থেকে ৯টি ও অন্যান্য সংস্থা থেকে দুটি খাল বুঝে পেলেও পরে নিজ উদ্যোগে আরও ১৪টি খাল চিহ্নিত করে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকার জলাশয় ও খালগুলো ধারাবাহিকভাবে দখল ও ভরাট করে বিভিন্ন ‘উন্নয়ন’ প্রকল্পে ব্যবহার করা হয়েছে।
৩. ড্যাপে প্রস্তাবনা ও ঘাটতি
বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনায় (২০২২-৩৫) ১,১৩৯.৫৭ কিলোমিটার দীর্ঘ ‘ব্লু নেটওয়ার্ক’ বা আন্তঃনীল সংযোগ স্থাপনের কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি নগরীর বিভিন্ন স্থানে ৫৫টি জলকেন্দ্রিক উদ্যান বা ওয়াটার পার্ক গড়ে তোলার প্রস্তাবনাও দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ড্যাপের ‘বাস্তবায়ন পরিকল্পনা’য় রাজউক ও স্থানীয় সরকারের সমন্বয়ে ‘নগর জীবনরেখা’ হিসেবে ২২টি খাল উদ্ধারের প্রস্তাবনা দেওয়া হয়েছে এবং রাজউক, স্থানীয় সরকার ও বিআইডব্লিউটিএর সমন্বয়ে জলপথ হিসেবে ৪০০ কিলোমিটার নৌ চলাচলের উপযোগী করার প্রস্তাবনা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ১৫টি ব্রিজ সংস্কার বা পুনর্নির্মাণের কথাও বলা হয়েছে। কিন্তু ড্যাপে ব্লু নেটওয়ার্ক ও নগর জীবনরেখা সম্পর্কিত মৌজাভিত্তিক বিশদ কার্যপত্র অনুপস্থিত। ফলে এর কার্যপদ্ধতি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায় না। এ ছাড়া ব্লু নেটওয়ার্ক ও খাল পুনরুদ্ধারে প্রস্তাবিত বাস্তবায়ন পরিকল্পনা অসম্পূর্ণ এবং খালগুলোর মধ্যে আন্তঃসংযোগ স্থাপনে সুনির্দিষ্ট পথরেখা বা রোডম্যাপ দেওয়া হয়নি। অর্থাৎ কাগজ-কলমে ব্লু নেটওয়ার্কের রূপরেখা রয়েছে, কিন্তু বক্স কালভার্ট নির্মাণ, ভরাট ও দখলের কারণে সংযোগ বিচ্ছিন্ন খালগুলো পুনরুদ্ধারে কার্যকর, তথ্যভিত্তিক ও সময়োপযোগী পরিকল্পনা গৃহীত হয়নি। ফলে নগরীর জলাবদ্ধতা ক্রমাগত বাড়ছে।
৪. ব্লু নেটওয়ার্ক প্রতিষ্ঠায় প্রতিবন্ধকতা
ঢাকা মহানগরীতে খাল পুনরুদ্ধার ও ব্লু নেটওয়ার্ক প্রতিষ্ঠায় প্রধান প্রতিবন্ধকতা ও অভিঘাতগুলোর মধ্যে রয়েছে দখল ও অবৈধ নির্মাণ, খাল-সংক্রান্ত উপযুক্ত তথ্যের ঘাটতি, মালিকানা স্বত্ব জটিলতা, প্রাতিষ্ঠানিক জটিলতা, আর্থিক ও রাজনৈতিক বাধা এবং প্রযুক্তি ও জলবায়ুগত ঝুঁকি।
অধিকাংশ খালই এখন দখল হয়ে গেছে। কোথাও গড়ে উঠেছে অবৈধ স্থাপনা, আবার কোথাও বর্জ্য ও মাটি ফেলে ভরাট করা হয়েছে। মালিকানা, আয়তন ও প্রবাহপথ-সংক্রান্ত তথ্য অনুপস্থিত থাকায় অনেক পুরোনো খালের অস্তিত্বই মানচিত্র থেকে মুছে গেছে। রাজউক, সিটি করপোরেশন, পানি উন্নয়ন বোর্ড, জেলা প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে দায়িত্ব ও কর্তৃত্ব নিয়ে দ্বন্দ্ব সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে। এ ছাড়া খাল পুনরুদ্ধারে দখলদার উচ্ছেদ করতে গিয়ে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কা থাকে এবং অধিগ্রহণ ও পুনর্বাসনে বিপুল অর্থ প্রয়োজন হয়। ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় খালের প্রকৃত প্রবাহপথ চিহ্নিত করাও কঠিন।
৫. ব্লু নেটওয়ার্ক প্রতিষ্ঠার কৌশল
ঢাকার ব্লু নেটওয়ার্ক পুনরুদ্ধারে ধারাবাহিক ও সমন্বিত কর্মপন্থা জরুরি। নগরের খালগুলো সমন্বিতভাবে পুনরুদ্ধার ও পুনরুজ্জীবিত করে পরস্পর এবং পার্শ্ববর্তী নদনদীর সঙ্গে সংযুক্ত করে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ব্লু নেটওয়ার্ক প্রতিষ্ঠায় কয়েক ধাপে যেসব পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে–
প্রথম ধাপ: প্রাথমিক তথ্য সংগ্রহ ও ডেটাবেজ উন্নয়ন
ঢাকার সব জলাধার, জলাশয় ও নদী টাস্কফোর্স চিহ্নিত খাল ও সিএস মৌজা ম্যাপের দাগসূচি অনুযায়ী পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রস্তুত করতে হবে। প্রাথমিক জরিপের মাধ্যমে খালের বিদ্যমান অবস্থা, প্রবাহপথ, পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা, পানির গুণমান, পাড়, উপরস্থ ও সংলগ্ন ভবন ও অবকাঠামোর অবস্থা, দখলের প্রকৃতি, জল ধারণ এলাকা প্রভৃতি বিষয়ে প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ ও নিরীক্ষণ করতে হবে।
দ্বিতীয় ধাপ: আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর জরিপ
ড্রোন ও জিপিএস ব্যবহার করে ‘টপোগ্রাফি সার্ভে’ করে খাল ও জলাধার-সংলগ্ন সব ধরনের ইমারত, ইমারতের শ্রেণি, ভূমির গঠন ও জলকাঠামো, ক্রস-সেকশন ইত্যাদির তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করতে হবে। জনসাধারণের সঙ্গে আলোচনা করে প্রতিটি ইমারতের ছবি ও তথ্য সংগ্রহ ও লিপিবদ্ধ করতে হবে। বিশেষত বৃষ্টির পরপরই প্রকল্প এলাকায় গিয়ে নিষ্কাশন অবস্থার তথ্য-উপাত্ত সরেজমিন সংগ্রহ করতে হবে।
তৃতীয় ধাপ: হাইড্রোলজিক্যাল ও হাইড্রোলিক মডেলিং
ভূ-প্রাকৃতিক সমীক্ষার মাধ্যমে প্রতিটি খালের পূর্ণাঙ্গ ডেটাবেজ তৈরি করতে হবে। জলাশয় ও খালগুলোর গাণিতিক মডেল তৈরি এবং বিদ্যমান পানিপ্রবাহের বিভিন্ন স্থানে প্রাপ্ত অভিঘাতগুলো চিহ্নিত করার পাশাপাশি ভৌগোলিক মানচিত্র, প্রাকৃতিক নিষ্কাশন ব্যবস্থা, বারিপাতের ঐতিহাসিক ধারা বিশ্লেষণের মাধ্যমে পানির বিদ্যমান প্রবাহ চিহ্নিত করতে হবে।
চতুর্থ ধাপ: অববাহিকা চিহ্নিত ও জলধারণ এলাকা পরিকল্পনা
ডেটাবেজে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ সাপেক্ষে ঢাকার অঞ্চলভিত্তিক অববাহিকা ও জলধারণ এলাকা শনাক্তের মাধ্যমে বিদ্যমান জলাশয় ও খালগুলোর পানির ধারণ ক্ষমতা পরিমাপ করতে হবে। পাশাপাশি বারিপাতের ধরন বিশ্লেষণের মাধ্যমে বৃষ্টির কতটুকু ভূগর্ভে যাচ্ছে এবং কতটুকু ভূপৃষ্ঠে প্রবাহিত হচ্ছে, তার পরিমাণ নির্ণয় করতে হবে। বৃষ্টির পানি ধারণের জন্য প্রয়োজনীয় জল ধারণ এলাকার আয়তন নির্ধারণ এবং সেগুলোর সম্ভাব্য স্থান চিহ্নিত করতে হবে। স্যাটেলাইট ইমেজ বিশ্লেষণ এবং হাইড্রো-মরফোলজিক্যাল মডেলিংয়ের মাধ্যমে ঢাকার জলাধার ও খালগুলোর ‘মিসিং লিঙ্ক’ চিহ্নিত ও পুনরুজ্জীবনের মাধ্যমে আন্তঃসংযোগ স্থাপনের পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করতে হবে।

পঞ্চম ধাপ: পানির গুণমান ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা
খাল ও জলাশয়ের পানির গুণগত মান বজায় রাখতে অববাহিকায় অবস্থিত সব বাড়িঘর ও শিল্প প্রতিষ্ঠান থেকে নির্গত বর্জ্য পানির পরিমাণ নির্ণয় এবং পরিশোধন সাপেক্ষে খালে নিষ্কাশিত করতে হবে। এ ক্ষেত্রে গৃহস্থালি বর্জ্য পানি নিষ্কাশনের আগে বিকেন্দ্রীকৃত শোধন ব্যবস্থা বাস্তবায়ন, পয়োবর্জ্যকে পৃথক পাইপলাইনের মাধ্যমে শোধনাগারে স্থানান্তর করতে হবে। দূষণ রোধে স্থানীয় পর্যায়ে কমিউনিটিভিত্তিক বা অন-সাইট পরিশোধন ইউনিট স্থাপন এবং বর্জ্য পানি ব্যবস্থাপনাকে সামগ্রিক খাল পুনর্বাসন কৌশলের অত্যাবশ্যক কার্যক্রম হিসেবে সংযুক্ত করতে হবে।
ষষ্ঠ ধাপ: দখল ব্যবস্থাপনা কৌশল ও পরিকল্পনা
ব্লু নেটওয়ার্ক প্রতিষ্ঠা এবং খাল ও জলাশয় পুনরুদ্ধার কার্যক্রম সফলভাবে বাস্তবায়নে ইতোমধ্যে দখলকৃত খাল ও জলাধারের অবৈধ দখলদার চিহ্নিত, উচ্ছেদ ও পুনর্দখল রোধের ব্যবস্থাপনা কৌশল নির্ধারণ নিয়ে এই নিবন্ধের পরবর্তী অংশে বিস্তারিত বলেছি।
সপ্তম ধাপ: জনসম্পৃক্ততা ও সচেতনতা
খালগুলো পুনরুজ্জীবিত করার সাশ্রয়ী সমাধান অনুসন্ধানে জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার পাশাপাশি সেগুলোকে শুধু পানিপ্রবাহের পথ হিসেবে বিবেচনা না করে এলাকাভিত্তিক গণপরিসর হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। খালগুলোর দখল ও দূষণ রোধ এবং পুনরুদ্ধার কার্যক্রমে সংশ্লিষ্ট এলাকার জনগণকে সম্পৃক্ত এবং এলাকাবাসীকে জলাশয় ও খালগুলোর অভিভাবকত্ব দিতে হবে।
একই সঙ্গে জলাশয়-জলাধার-খাল পুনরুদ্ধারের প্রয়োজনীয়তা এবং জলকেন্দ্রিক উন্নয়নের পরিবেশগত, সামাজিক ও অর্থনৈতিক সুফল সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়াতে হবে। এ ক্ষেত্রে প্রতিটি ওয়ার্ডে স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে সচেতন স্কোয়াড, নারীদের নিয়ে পাড়াভিত্তিক গৃহস্থালি স্কোয়াড এবং যুবকদের নিয়ে ‘পরিচ্ছন্ন স্কোয়াড’ তৈরি করতে হবে। দখল ও দূষণ বন্ধ করে জলাশয় এবং খাল পুনরুদ্ধারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে এই প্রক্রিয়ায় সংযুক্ত এবং প্রত্যেকের কার্যক্রম সুনির্দিষ্ট ও জবাবদিহি নিশ্চিতের ব্যবস্থা করতে হবে। সরকারি সংস্থাগুলোর পাশাপাশি এই কার্যক্রমে কারিগরি সহযোগিতার জন্য সংশ্লিষ্ট পেশাজীবী সংগঠন এবং গণসচেতনতা তৈরি ও খাল উদ্ধারে জনসম্পৃক্ততার জন্য নদী, খাল, জলাশয় ও পরিবেশ সম্পর্কিত বেসরকারি সংস্থাগুলোকে যুক্ত করতে হবে।
অষ্টম ধাপ: ফলাফল সংকলন
পূর্ণাঙ্গ বিবরণ-সংবলিত তথ্য-উপাত্ত সহকারে সব খালের ও নেটওয়ার্ক এবং দখল স্বত্বের সচিত্র বর্ণনা প্রস্তুত করতে হবে। বিস্তারিত বিবরণ- সংবলিত মৌজা ম্যাপ এবং সার্ভে ম্যাপ প্রস্তুত করতে হবে। সার্বিক খালের নেটওয়ার্কের স্থানিক ছবিসহ সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে বিবর্তনের বর্ণনা প্রস্তুত করতে হবে। প্রস্তাবিত ডিটেইলড মাস্টার প্ল্যান ও অ্যাকশন এরিয়া প্ল্যান প্রণয়ন করতে হবে। সময় ও স্থানভিত্তিক প্রকল্পের সাবেক ও সমন্বিত মাল্টিসেক্টরাল ইনভেস্টমেন্ট প্ল্যান প্রণয়ন করতে হবে। উন্নয়ন-পরবর্তী উন্নয়ন সারচার্জ পদ্ধতির বিস্তারিত বর্ণনা ও যৌক্তিকতা বিশ্লেষণ করতে হবে।
নবম ধাপ: সমন্বিত রোডম্যাপ প্রস্তুতকরণ, বাস্তবায়ন, মনিটরিং ও মূল্যায়ন
উপরোল্লিখিত কৌশলগুলোর ওপর ভিত্তি করে ব্লু নেটওয়ার্ক প্রতিষ্ঠায় কোথায় কোথায় আন্তঃসংযোগ স্থাপন করা প্রয়োজন, চিহ্নিত করে ঢাকার চারপাশের নদীর সঙ্গে খালগুলোর সংযোগ প্রতিষ্ঠায় সমীক্ষানির্ভর, বাস্তবায়নমুখী রোডম্যাপ তৈরি এবং রোডম্যাপ অনুসরণে ‘ইন্টারেকটিভ ওয়েব বেজড মনিটরিং প্ল্যাটফর্ম’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ব্লু নেটওয়ার্ক প্রতিষ্ঠা ও সংরক্ষণে নিরবচ্ছিন্ন পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন ব্যবস্থা চালু করতে হবে।
৬. অবৈধ দখল ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা
ঢাকা শহরের খাল ও জলাশয় পুনরুদ্ধার কার্যক্রম সফলভাবে বাস্তবায়নে সমন্বিত ও বাস্তবধর্মী ‘অবৈধ দখল ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা’ প্রণয়ন অপরিহার্য। এ পরিকল্পনায় দখলের প্রকৃতি ও জটিলতা অনুযায়ী পৃথক কৌশল গ্রহণের সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা থাকবে, যা আইনগতভাবে টেকসই, সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য এবং কারিগরিভাবে বাস্তবায়নযোগ্য। পরিকল্পনাটির মূল লক্ষ্য খালের ন্যূনতম প্রস্থ ও প্রবাহ পুনঃপ্রতিষ্ঠা, জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত স্থান তৈরি এবং ভবিষ্যতে দখল প্রতিরোধ।
৭. অবৈধ দখল ব্যবস্থাপনার প্রস্তাবিত কৌশল
১: যেসব বহুতল স্থাপনার আংশিক অংশ খালের সীমানার মধ্যে অবস্থিত, সেগুলোকে জরিমানা এবং ভবনের সার্বিক অবস্থা অনুযায়ী আংশিক পুনরুদ্ধারের আওতাধীন করা হবে। এ ক্ষেত্রে খালের দখলকৃত অংশের জমির এককালীন বাজারদরের সমপরিমাণ জরিমানা করা হবে। দখলকৃত অংশের পরিমাণ সাপেক্ষে (অর্থাৎ বহুতল ভবনের যতটুকু স্কয়ারফিট খালের সীমানার মধ্যে পড়েছে) পুনরাবৃত্তিক জরিমানা (মাসিক/বার্ষিক) আরোপ করে অবৈধ দখল অর্থনৈতিকভাবে নিরুৎসাহিত করা হবে। পাশাপাশি, বহুতল ভবনের নিচতলা পুনরুদ্ধার করে খালের তীরবর্তী অংশে জনবান্ধব অবকাঠামো যেমন হাঁটার পথ, পাবলিক টয়লেট, লাইব্রেরি, শিশুদের খেলার স্থান, ওয়াই-ফাই জোন, খাল ব্যবস্থাপনা অফিস ইত্যাদি স্থাপন করা হবে।
কৌশল-২: যেসব বহুতল স্থাপনার আংশিক খালের সীমানার মধ্যে অবস্থিত; কিন্তু কাঠামোগত কারণে পুনরুদ্ধার সম্ভব নয়, সেগুলোর জন্য কঠোর জরিমানার বিধান করতে হবে। এককালীন জমির মূল্যসম জরিমানা আরোপ করা হবে। ভারী পুনরাবৃত্ত জরিমানা আরোপের মাধ্যমে মালিকদের স্বেচ্ছায় দখল ছাড়তে উৎসাহিত করা হবে।
কৌশল-৩: কাঁচা, সেমি-পাকা বা জরাজীর্ণ পাকা স্থাপনাগুলো সম্পূর্ণ অপসারণ করা হবে। বক্স কালভার্টসহ খালের প্রবাহে বাধা সৃষ্টিকারী কাঠামো ভেঙে স্বাভাবিক জলপ্রবাহ পুনঃস্থাপন করা হবে। উদ্ধারকৃত জমি জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত স্থান, পার্ক, খেলার মাঠ, সবুজ এলাকা ও হাঁটার পথ হিসেবে উন্নয়ন করা হবে।
কৌশল-৪: খালের সীমানার বাইরে হলেও ন্যূনতম প্রস্থ নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় জমি অধিগ্রহণ করা হবে। অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া ‘অধিগ্রহণ ও স্থাবর সম্পত্তি অধিগ্রহণ আইন, ২০১৭’ অনুযায়ী সম্পন্ন হবে এবং আইন অনুযায়ী প্রাপ্য ক্ষতিপূরণ প্রদান করা হবে।
কৌশল-৫: প্রয়োজন হলে খালের তীরের জমি বিনিময়ের মাধ্যমে বেসরকারি জমির মালিকদের সঙ্গে সমঝোতা করা হবে। এতে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় না করে ধারাবাহিক পাবলিক স্পেস ও সংযুক্ত উন্নয়ন নিশ্চিত করা যাবে।
কৌশল-৬: ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান বা সরকারি স্থাপনা যেগুলো খালের মধ্যে পড়ে, সেগুলোর পুনঃনকশা ও পুনর্নির্মাণ করা হবে, যাতে খালের ন্যূনতম প্রস্থ ও প্রবাহ অক্ষুণ্ন থাকে।
৮. অর্থায়ন ও বাস্তবায়ন ব্যবস্থা
এককালীন ও পুনরাবৃত্ত জরিমানা থেকে প্রাপ্ত অর্থ দিয়ে ‘ব্লু নেটওয়ার্ক ব্যবস্থাপনা তহবিল’ গঠন করা হবে, যা ব্লু নেটওয়ার্ক প্রতিষ্ঠা, খালের তীর উন্নয়ন, নাগরিক সুবিধা স্থাপন এবং রক্ষণাবেক্ষণে ব্যবহার করা হবে। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট সংস্থা আইনগত কাঠামোর আওতায় তালিকাভুক্ত অবৈধ দখলদারদের সঙ্গে আলোচনা করে কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করবে। দীর্ঘ মেয়াদে টেকসই দখলমুক্ত খাল ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে ‘অবৈধ স্থাপনা ব্যবস্থাপনা বিশেষ নির্দেশিকা’ প্রণয়ন করা হবে।
৯. উপসংহার
ঢাকার জলাবদ্ধতা ও পরিবেশ সংকট সমাধানে খাল, জলাশয় ও নদীর আন্তঃসংযোগমূলক ব্লু নেটওয়ার্ক পুনরুদ্ধার অপরিহার্য। এটি শুধু প্রকৃতি পুনরুদ্ধার নয়, বরং একটি টেকসই ও বাসযোগ্য নগরের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার রূপরেখা। তথ্যনির্ভর পরিকল্পনা ও সমাজের সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে ঢাকার হারিয়ে যাওয়া নীল জীবনরেখাকে ফের জাগিয়ে তোলার এখনই সময়।
স্থপতি ইকবাল হাবিব: নগরবিদ ও পরিবেশকর্মী
- বিষয় :
- নগরায়ণ
