সমাজ
স্কুল থেকেই শুরু হোক দুর্যোগ প্রস্তুতি
শশাঙ্ক সাদী
প্রকাশ: ২০ এপ্রিল ২০২৬ | ১১:০১ | আপডেট: ২০ এপ্রিল ২০২৬ | ১১:০১
উপকূলীয় অঞ্চলে আমাদের ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি নিয়ে গর্ব বোধ করি। এক পতাকা বা দুই পতাকা আর সাইরেনের শব্দ গুনি। আশ্রয়কেন্দ্র তৈরি করি আর সুরক্ষার জন্য চোখে দেখা যায় এমন সব সরঞ্জামে বিনিয়োগ করি। তবুও একের পর এক ঝড়ে কিছু না কিছু মানুষ মারা যাচ্ছে; সম্পদের ক্ষতিও বাড়ছে। উপকূলীয় জনপদে আগাম সতর্কবার্তা অনুযায়ী ঘরে ঘরে পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করতে না পারার ব্যর্থতাই এর অন্যতম কারণ।
এটি কোনো প্রযুক্তিগত ঘাটতি নয়। বরং এটি এক প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা। দ্রুততম জলবায়ু পরিবর্তনের ধাক্কা আগাম সতর্কতা এবং ঘূর্ণিঝড়ের জনপদে আঘাত হানার মাঝখানের সময়কে ক্রমাগত সংকুচিত করে ফেলছে। ফলে এই ব্যর্থতাও ক্রমশ ভয়াবহ হয়ে উঠছে। এটিকে ঠিক করার জন্য ছোট ছোট সমাধান যথেষ্ট না। দুর্যোগ প্রস্তুতি সম্পর্কে আমাদের চিন্তাভাবনায় একটি কাঠামোগত পরিবর্তন প্রয়োজন এবং সেই পরিবর্তনের নিউক্লিয়াসে (কেন্দ্রে) রাখতে হবে শিশুদের।
কয়েক দশক ধরে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত দেশীয় এবং বৈশ্বিক নীতি কাঠামোগুলো শিশুদের ‘অসহায়’ হিসেবে চিহ্নিত করে আসছে। শব্দটি নিঃসন্দেহে সুবিধাজনক। কারণ, এটি সুরক্ষাকে ন্যায্যতা দেয়। এটি আবার শিশুদের স্বাধিকার থেকেও বঞ্চিত করে এবং পরিবারের মধ্যে তাদের বাস্তব, জীবন্ত ভূমিকা সম্পর্কে আমাদের অন্ধ করে রাখে।
আজকের জেনারেশনে শিশুরা প্রায়ই পরিবারের সবচেয়ে অবহিত এবং তথ্যভান্ডারের সঙ্গে সংযুক্ত সদস্য। তারা ক্রমবর্ধমানভাবে স্কুল, সমবয়সী এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম থেকে তথ্য গ্রহণ করে। তারা এমন এক সামাজিক পরিসরে বিচরণ করে, যেখানে প্রাপ্তবয়স্করা করে না। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, তারা দ্রুত ও দৃঢ়তার সঙ্গে যোগাযোগ করে।
শিশুরা কাজ করতে পারে কিনা এটি কোনো প্রশ্ন নয়। প্রশ্নটি হলো, আমরা তাদের তা করতে দিতে ইচ্ছুক কিনা। দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলে আম্পান, রিমাল, ডানার মতো সাম্প্রতিক ঘূর্ণিঝড়গুলোতে সাড়ামূলক কাজ করার সময় মাঠ পর্যায়ের কর্মীরা বারবার একটি চিত্র লক্ষ্য করেছেন, যেসব এলাকায় স্কুল পর্যায়ে প্রস্তুতি নিয়ে সক্রিয়ভাবে আলোচনা করা হয় বা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা প্রকল্প আছে সেখানকার শিশুরা দ্রুত সতর্ক সংকেত বুঝতে পারে এবং তাদের পরিবারকে ঘূর্ণিঝড়ের আগে জরুরিভাবে নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে সরে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তা জানাতে ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করতে পারে। কিন্তু যেসব জনপদে এই সুযোগ নেই সেখানে দ্বিধা এবং বিভ্রান্তি রয়ে গেছে। যেসব পরিবারের প্রাপ্তবয়স্করা গবাদি পশু, সম্পত্তি বা সামাজিক রীতিনীতির চিন্তায় দেরি করেন, সেখানে প্রায়ই শিশুরাই দূরবর্তী কোনো সতর্কসংকেতকে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তে রূপান্তরিত করে বিভ্রান্তি ভাঙে এবং সময়মতো পরিবারের অন্যদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যেতে সহায়তা করে।

এগুলো বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; মাঠ পর্যায়ে পরীক্ষিত কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিকভাবে উপেক্ষিত এক ব্যবস্থার উদাহরণ। যে শিশু বোঝে– বিপদ সংকেতের অর্থ হলো এখনই চলে যাওয়া, সে কোনো কমিটির সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষা করে না।
স্কুল থেকে দুর্যোগের পাঠ নিয়ে শিশুরা তাদের পরিবেশে পুঁথিগত ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার অনানুষ্ঠানিক অনুবাদক হিসেবে কাজ করে থাকে। দুর্যোগ প্রস্তুতির ক্ষেত্রে বিদ্যালয়গুলো তাই প্রান্তিক অবস্থানে থাকতে পারে না। সেগুলোকে এর সম্মুখ সারিতে রাখতে হবে।
এর অর্থ হলো, বছরে একবার বা দুইবার লোক দেখানো মহড়ার বাইরে গিয়ে দৈনন্দিন শিক্ষার মধ্যে ঝুঁকি-সচেতনতাকে অন্তর্ভুক্ত করা। দুর্যোগের সময় কী করতে হবে; শুধু তা শেখানো নয়।
শিক্ষার্থীদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে তারা কীভাবে অন্যদের ওই জ্ঞান শেখাতে পারে। তাহলে তারা বিদ্যালয়ের বাইরে থাকা শিশু-কিশোর-কিশোরীদের জন্য সমবয়সী পরামর্শদাতা হয়ে উঠবে। এর ফলে যে কোনো দুর্যোগের সময় পরিবারের অন্য সদস্যরা বিচলিত হলে বা সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগলেও ওই শিশুটি পরিবারের সবচেয়ে অবিচল সদস্য হয়ে পথ দেখাবে।
যখন প্রত্যেক শিশু একটি সতর্কসংকেত সহজে বুঝতে পারে ও বোঝাতে পারে, তখন দুর্যোগ প্রস্তুতি শুধু একটি বার্তা থাকে না। বরং তা একটি সম্মিলিত ভাষায় পরিণত হয়। এভাবেই সম্ভব দুর্যোগ প্রস্তুতির ‘শেষ মাইল’ অর্থাৎ ঝুঁকিপূর্ণ জনপদে সময়মতো পদক্ষেপ নেওয়ার ঘাটতিকে জয় করা।
আইনি সমর্থন ছাড়া শিশুকেন্দ্রিক পদ্ধতিগুলো দাতাচালিত পরীক্ষামূলক প্রকল্প হয়েই থাকবে। সেগুলো আপাতত দৃশ্যমান এবং প্রশংসিত হলেও পরিশেষে অস্থায়ী। এই ধারায় পরিবর্তন দরকার। দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাসে নিছক সুবিধাভোগীর পরিবর্তে শিশুদের সক্রিয় অংশগ্রহণকারী হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য ২০১২ সালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আইনটি সংশোধন করা আশু প্রয়োজন।
২০২৬-৩০ সালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা জাতীয় নীতিতে অবশ্যই এই বিধান রাখতে হবে– সকল প্রস্তুতিমূলক ব্যবস্থা তৈরি হবে শিশুদের প্রবেশগম্যতা ও অংশগ্রহণের কথা মাথায় রেখে এবং তা নিশ্চিত করে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, একই সঙ্গে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন, প্রতিষ্ঠান ও সুশীল সমাজের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কোনো দুর্যোগ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় শিশুদের পরিচালিত সামাজিক নিরীক্ষায় কোনো ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র ব্যবহার অযোগ্য বা সতর্কীকরণ ব্যবস্থা অচল বলে ধরা পড়লে সেই পর্যবেক্ষণটি দ্রুত গ্রহণ করতে হবে। এর প্রতিফলন ইউনিয়ন, পৌরসভা ও উপজেলার বাজেট বরাদ্দে থাকতে হবে। এই নিয়ম মানা না হলে স্থানীয় নির্বাচিত সরকার ও প্রশাসনকে উন্নয়ন তহবিল দেওয়া হবে না। যখন বাজেট ও অন্যান্য সম্পদের বণ্টন শিশুদের অংশগ্রহণে ঝুঁকিপূর্ণ জনপদের প্রমাণিত প্রস্তুতির সঙ্গে যুক্ত থাকে, তখন জবাবদিহি আর ঐচ্ছিক থাকে না।
শশাঙ্ক সাদী: লেখক ও উন্নয়ন বিশ্লেষক
