নরেন্দ্র মোদি নন আইকে গুজরাল
ড. মইনুল ইসলাম
প্রকাশ: ২১ নভেম্বর ২০১৯ | ১৩:১৯
বাংলাদেশের রাজনীতিতে যেহেতু বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামীর মতো দলগুলো
এখনও পাকিস্তান প্রেমে বুঁদ হয়ে রয়েছে, তাই হয়তো বিএনপি বা জামায়াত-শিবিরের
সমর্থকদের দৃষ্টিতে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশ যে কোনো চুক্তি করলেই সেটাকে
দেশ বিক্রয়ের সমতুল্য মনে হবে। তবুও বলব, বাংলাদেশের নীতি-প্রণেতাদের খুবই
সাবধানতার সঙ্গে ভারতের 'আঞ্চলিক আধিপত্যবাদী' মনোভাবের মোকাবিলা করে
দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। এটা সবসময় মনে রাখতে হবে যে,
বিজেপির নরেন্দ্র মোদি কখনই ইন্দর কুমার গুজরাল হতে পারবেন না। 'গুজরাল
ডকট্রাইন' এখন আর প্রতিবেশীদের প্রতি ভারতের বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকারের
দৃষ্টিভঙ্গিকে পরিচালিত করে না। এমনকি, কংগ্রেস-নেতৃত্বাধীন সরকার যখন
ভারতে ক্ষমতাসীন ছিল তখনও প্রতিবেশী বাংলাদেশের সুবিধা-অসুবিধা ভারতের
শাসকদের দৃষ্টিভঙ্গিকে অনেকখানি নমনীয় রাখত। কিন্তু নরেন্দ্র মোদি নিজেও
কট্টর হিন্দুত্ববাদী, তার বিজেপির নেতারা এবং ক্ষমতাসীন সরকারের মন্ত্রীরাও
কট্টর হিন্দুত্ববাদী। ভারতের সুপ্রিম কোর্ট যদিও নরেন্দ্র মোদিকে গুজরাটের
দাঙ্গায় হাজারেরও বেশি মুসলিম-নিধনের অভিযোগ থেকে খালাস দিয়েছেন, তবুও
আমরা যারা ওই ঘটনার ধারাবাহিকতা গভীরভাবে অনুসরণ করেছি তাদের কাছে বিবেকের
এই দায় থেকে মোদি কখনই মুক্তি পাবেন না। গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী মোদি ওই সময়
যেভাবে টেলিভিশন ক্যামেরার সামনে 'রক্তচক্ষু আলটিমেটাম' উচ্চারণ করেছিলেন
'এদেরকে চরম শিক্ষা পেতেই হবে', সেটা জীবনেও ভুলতে পারা যাবে না! ওই
উচ্চারণের পথ ধরেই শুরু হয়েছিল গুজরাটের দাঙ্গা।
বিজেপির আরেকজন কট্টর হিন্দুত্ববাদী মন্ত্রী রাজনাথ সিং যখন ভারতের
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন তখন তিনি একবার দম্ভভরে বলেছিলেন, ভারত থেকে
বাংলাদেশে গরু পাচার বন্ধ করে তিনি বাংলাদেশিদের 'শিক্ষা' দেবেন। তার ওই
দম্ভোক্তির মানে হলো, ভারত থেকে গরু চোরাচালান না হলে বাংলাদেশিরা ভীষণ
বিপদে পড়বে। গরুর গোশতের দাম আকাশচুম্বী হয়ে যাবে বাংলাদেশে। তিনি ভুলে
গিয়েছিলেন যে, ভারত সরকার নিজেদের নাগরিকদের ধর্মীয় সেন্টিমেন্টের কারণে
বৈধ পথে বাংলাদেশে (মানে তদানীন্তন পূর্ব বাংলায় বা পূর্ব পাকিস্তানে) গরু
রপ্তানি নিষিদ্ধ রাখায় উভয় পক্ষের জন্য সুবিধাজনক বিবেচনায় ১৯৪৭ সালের দেশ
বিভাগের পর থেকে নিজেদের শত্রুতামূলক সম্পর্ক সত্ত্বেও এই গরু চোরাচালানের
প্রতি ভারত ও পাকিস্তান নীরব সমর্থন (মানে দেখেও না দেখার ভান করা) নীতি
গ্রহণ করে আসছিল। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরও দু'দেশের সরকার গরু
চোরাচালানের প্রতি এই 'দেখেও না দেখার ভান' নীতি অনুসরণ অব্যাহত রেখেছিল।
অথচ ভারত অন্যান্য দেশে গরুর গোশত রপ্তানির ক্ষেত্রে বিশ্বের
দ্বিতীয়-সর্বোচ্চ রপ্তানিকারকের স্থানটি দখল করে রয়েছে। তাহলে কি প্রশ্ন
তোলা যায় না, বাংলাদেশকে কী কারণে অন্যায়ভাবে বৈধ আমদানির সুযোগ থেকে
বঞ্চিত করে দু'দেশের চোরাকারবারিদের মুনাফাবাজির সুযোগ করে দেওয়া হয়েছিল?
যাক, রাজনাথ সিংয়ের এমন ধরনের উক্তির চার বছরের মধ্যেই বাংলাদেশ হয়তো গরু
উৎপাদনে প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করে ফেলেছে, যার ফলে গত ঈদুল আজহার
সময় বাংলাদেশে প্রায় দশ লাখ গরু উদ্বৃত্ত ছিল!
২০১৪
সালে মোদি ভারতে ক্ষমতায় আসার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অত্যন্ত
প্রশংসনীয় দক্ষতায় মোদি সরকারের সঙ্গে সদ্ভাব বজায় রেখে চলেছেন। শেখ
হাসিনার সরকারের সঙ্গে ভারতের কংগ্রেস সরকারের বেশি দহরম-মহরম ছিল- অভিযোগ
তুলে বিএনপি মরিয়া প্রয়াস চালিয়েছে মোদি সরকারের সঙ্গে শেখ হাসিনার মানসিক
দূরত্ব সৃষ্টি করতে, তাদের ওই অপপ্রয়াস এখনও সফল হয়নি। তবে বাংলাদেশ যে
মোদির রাজনীতি পছন্দ করছে তা মনে করার কোনো কারণ নেই! বিশেষত, মোদি সরকার
ক্ষমতাসীন হয়েই যেভাবে বিসিআইএম-ইকোনমিক করিডোর আঞ্চলিক সহযোগিতা চুক্তিকে
ঠান্ডাঘরে পাঠিয়ে দিয়েছে সেটা পছন্দ করার কোনো কারণ নেই বাংলাদেশের। ২০১৬
সালে গণচীন বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) ঘোষণার দেড় দশক আগেই
বিসিআইএম-ইকোনমিক করিডোর গঠনের কাজ শুরু হয়েছিল 'কুনমিং ইনিশিয়েটিভ'-এর
মাধ্যমে। ভারতের তদানীন্তন কংগ্রেস সরকার বিসিআইএম-ইকোনমিক করিডোরের
কার্যক্রমে প্রায় এক দশক ধরে অত্যন্ত উৎসাহের সঙ্গে অংশগ্রহণ করেছে। কিন্তু
২০১৪ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকার
ক্ষমতাসীন হয়েই বিসিআইএম আঞ্চলিক সহযোগিতা চুক্তি বাস্তবায়ন বন্ধ করে দেয়।
ফলে এখন 'কুনমিং ইনিশিয়েটিভ' জীবন্মৃত অবস্থায় ঝুলে গেছে বলা চলে।
এরপর আসামের এনআরসি ইস্যু। ভারতের একাধিক মন্ত্রী বিষয়টিকে বাংলাদেশের কথিত
অবৈধ অভিবাসী ইস্যুর সঙ্গে জড়িয়ে বক্তব্য রাখা সত্ত্বেও এ ব্যাপারে
বাংলাদেশ সরকার প্রশংসনীয় বাকসংযম দেখিয়ে চলেছে। আসামের এক মন্ত্রী তো
সরাসরি হুমকি দিয়ে বসেছেন, যারা এনআরসির বাইরে থেকে যাবে তাদের বাংলাদেশে
ঠেলে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহও প্রায় একই রকম
উগ্র কথাবার্তা বলে চলেছেন এই ইস্যুতে। যদিও মোদি নিজে এই ইস্যুতে এখনও মুখ
খোলেননি, তবুও বোঝা যাচ্ছে বিজেপি এই ইস্যুতে বাংলাদেশকে চাপে রাখতে
চাইছে। এতসব উস্কানিমূলক বাক্যবাণ সত্ত্বেও বাংলাদেশ সরকার এই ইস্যুতে
ভারতকে এখনও কোনো অজুহাত তুলে দেয়নি বলা যায়। এরপর হঠাৎ বিনা নোটিশে ভারত
পেঁয়াজ রপ্তানি নিষিদ্ধ করে বাংলাদেশকে একেবারে অপ্রস্তুত অবস্থায় ফেলে
দিল।
প্রতিবেশীর সুবিধা-অসুবিধা মোদি সরকারের মোটেও বিবেচ্য নয়। ২০১৫ সালে
নরেন্দ্র মোদির ভারত যেভাবে নেপালের অর্থনীতিতে অবরোধ আরোপ করে নেপালের
ভূমিকম্প-বিধ্বস্ত অর্থনীতিকে প্রায় ধসিয়ে দিয়েছিল সে কথা মনে রাখলে ভারতের
এই 'দাদাগিরি' যে তাদের মজ্জাগত সমস্যা সেটা বুঝতে অসুবিধে হবে না।
এই পরিপ্রেক্ষিতে বিবেচনা করলে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক
চুক্তিগুলোকে অনেকের কাছেই ভারতের জন্য 'একতরফা সুবিধাজনক' মনে হতেও পারে।
চট্টগ্রাম, মোংলা কিংবা পায়রাবন্দর ভারতের 'সেভেন সিস্টার্স' রাজ্যগুলোকে
ব্যবহার করতে দিলে বাংলাদেশের তেমন কোনো অসুবিধা হবে না। অতএব, এই আঞ্চলিক
সহযোগিতার ব্যাপারটাকে আমি খুব নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখতে চাই না। এমনকি,
ফেনী নদীর পানি ত্রিপুরার সাবরুম শহরের সুপেয় পানি সমস্যার সমাধানে ব্যবহার
করতে দিলেও বাংলাদেশের বড় কোনো অসুবিধা হওয়ার আশঙ্কা আমি দেখছি না। ভারতের
সেভেন সিস্টারসে এলপিজি রপ্তানিও একটা 'উইন-উইন' ব্যবস্থা- এতেও আমি
আপত্তির কারণ দেখি না। আমি শঙ্কিত বাংলাদেশের সমুদ্র-উপকূলে ভারতের সাতটি
রাডার স্টেশন স্থাপনের চুক্তিটির ব্যাপারে। ভারতকে কোন যুক্তিতে এই রাডার
স্টেশনগুলো পরিচালনায় অংশীদার করতে যাচ্ছি আমরা? ভারত কেন বাংলাদেশের
সমুদ্র-উপকূলে যৌথ বা এককভাবে রাডার স্টেশন স্থাপন করার অধিকার পাবে? এই
চুক্তির মাধ্যমে আমরা ভারত ও চীনের ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় জড়িয়ে যাচ্ছি
কি-না? আমাদের ভুললে চলবে না যে, আমরা যখন চীন থেকে দুটো পুরোনো সাবমেরিন
কিনেছিলাম তখন ভারত এ ব্যাপারে তাদের উষ্ফ্মা প্রকাশ করেছিল। ওখানেই তারা
থেমে থাকেনি, পরবর্তী সময়ে তারা মিয়ানমারকে একটা সাবমেরিন দিয়েছে। আমি
নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ না হলেও এই প্রশ্নগুলোর সদুত্তর আমাকে পেতেই হবে।
ইতোমধ্যেই দেশের একজন সাবেক পররাষ্ট্র সচিব তওহীদ হোসেন এই প্রশ্নগুলো
উত্থাপন করেছেন। আমি দেশের অন্যান্য নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদেরও দৃষ্টি আকর্ষণ
করছি এ বিষয়ে বিশ্নেষণমূলক আলোচনা উপস্থাপনের জন্য। প্রধানমন্ত্রী শেখ
হাসিনার প্রতি আমার আহ্বান, এই চুক্তিটি পুনর্বিবেচনা করুন।
অর্থনীতিবিদ; অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
- বিষয় :
- ভারত
- ড. মইনুল ইসলাম

