বুদ্ধিজীবী হত্যা-১
স্বজনের বুকে জমে থাকা কান্না
বিচারপতি ওবায়দুল হাসান
প্রকাশ: ১২ ডিসেম্বর ২০১৯ | ১৩:৪৪
প্রতি বছর ১৪ ডিসেম্বর অত্যন্ত ভাবগম্ভীর পরিবেশে বিনম্র শ্রদ্ধায় জাতি
স্মরণ করে তার শ্রেষ্ঠ মেধাবী সন্তানদের। জাতির জন্য এটি বেদনাবৃত একটি
কালো দিন। সুসংগঠিত পরিকল্পনায় ১৯৭১ সালের এই দিনে জাতির শ্রেষ্ঠ
মেধাসম্পন্ন সন্তানদের নির্মমভাবে হত্যা করে পাকিস্তানি দখলদার সেনাবাহিনীর
এ দেশীয় কুখ্যাত দোসর আলবদররা। ১৯৭১ সালে ৯ মাসের স্বাধীনতা যুদ্ধকালে
বাংলাদেশের ভূখণ্ডে সুসংগঠিতভাবে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধ, গণহত্যাসহ এই
বুদ্ধিজীবীদের বর্বর হত্যাকাণ্ডের বিচার চেয়ে আসছিল জাতি। এ লক্ষ্যে ১৯৭৩
সালে বঙ্গবন্ধুর দৃঢ়তায় প্রণীত হয় ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস (ট্রাইব্যুনালস)
অ্যাক্ট, ১৯৭৩। কিন্তু ১৯৭৫-এর আগস্টে সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর
সামরিক শাসকদের দৃশ্যমান অনুমোদনে শুরু হয় বিচারহীনতার সংস্কৃতি। অসীম
বেদনা বুকে নিয়ে জাতি হতে থাকে রক্তাক্ত। ১৯৭৩ সালে প্রণীত আইনটি থেকে যায়
নীরব।
বিচারহীনতার গ্লানি থেকে জাতিকে মুক্ত করার সাহসী উদ্যোগ নেন
বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ লক্ষ্যে ২০১০ সালের ২৫ মার্চ
গঠিত হয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। ২০১২-এর মার্চে গঠিত হয় আরেকটি
ট্রাইব্যুনাল। শুরু হয় শীর্ষস্থানীয় রাজাকার, আলবদর এবং পাকিস্তানি দখলদার
সেনাবাহিনীর 'শক্তিধর' দোসরদের বিচার কাজ। বিচার শুরু হয় শহীদ বুদ্ধিজীবী
হত্যাকাণ্ডের। বিচারকার্য সম্পন্ন করে ২০১৩ সালের ৩ নভেম্বর আন্তর্জাতিক
অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ 'বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের' মূল নায়ক আশরাফুজ্জামান
খান ওরফে নায়েব আলী খান এবং চৌধুরী মঈনুদ্দীনকে দোষী সাব্যস্ত করে রায়
ঘোষণা করেন। ট্রাইব্যুনালের ওয়েবসাইটে এই রায়সহ ঘোষিত সব রায়ই আপলোডেড
রয়েছে। দেখা যায়, এই মামলায় ১১টি চার্জ গঠন করা হয়। ২৫ জন সাক্ষীর মৌখিক
সাক্ষ্য ও দালিলিক সাক্ষ্য তথা তথ্যনির্ভর সমসাময়িক দেশি-বিদেশি
পত্রপত্রিকার রিপোর্ট বিবেচনায় নিয়ে ট্রাইব্যুনাল প্রত্যেকটি চার্জেই এই
দুই অভিযুক্তকে দোষী সাব্যস্ত করে সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করেন।
এ ধরনের বর্বর প্রকৃতির আন্তর্জাতিক অপরাধ সংশ্নিষ্ট মামলায় অভিযুক্তকে
দোষী সাব্যস্ত করে দণ্ড প্রদানই একমাত্র লক্ষ্য নয়। এ প্রকৃতির মামলার
রায়ের মাধ্যমে জাতি, বিশেষ করে নতুন প্রজন্ম জানতে পারবে- কী অসীম
রক্তস্নাত আত্মত্যাগের বিনিময়ে আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি, পেয়েছি প্রিয়
মাতৃভূমি 'বাংলাদেশ'। আর এই নির্মম প্রতিষ্ঠিত সত্যই নতুন প্রজন্মকে
স্বাধীনতার চেতনাকে বুকে ধারণ করতে অনুপ্রাণিত করবে। একই সঙ্গে বিশ্বও
জানবে এসব সত্য। আর এই সত্যের অংশ হিসেবে বুদ্ধিজীবী হত্যা মামলায় শহীদদের
স্বজনের বুকে জমে থাকা ক্ষত ও নিরন্তর কান্নাকে তাদের ভাষায় তুলে ধরার
প্রয়াসেই এই লেখা। একই সঙ্গে রায়ে প্রতিফলিত বিচারকদের বিশেষণপ্রসূত
ভাবনাগুলোও প্রাসঙ্গিকভাবে এসে যাবে এ লেখায়।
বিচারকরা তাদের রায়ে উল্লেখ করেছেন বুদ্ধিজীবী শ্রেণি বাঙালি জাতিগোষ্ঠীর
মেধা ও মনন। এই হত্যাকাণ্ড ছিল জাতিকে মেধাশূন্য করার এক নীলনকশা।
বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের দায়ে দোষী সাব্যস্ত করে এ মামলায় মঈনুদ্দীন ও
আশরাফুজ্জামানকে সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়ার যৌক্তিকতা তুলে ধরে রায়ে বলা হয়-
বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের হিংস্রতা মৌলিক মানবতাবোধের জন্য হুমকি। ইতিহাস
বলে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নানা সময়ে বেসামরিক নিরস্ত্র জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্য
করে নানা ধরনের নৃশংস আক্রমণ হয়েছে। কিন্তু বিশ্বের ইতিহাস এমন অভিজ্ঞতার
মুখোমুখি হয়নি, যেখানে জাতির বিবেক সরব মেধাদীপ্ত বুদ্ধিজীবীদের লক্ষ্য করে
ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়েছে।
এই
পাশবিক হত্যাযজ্ঞ শুধু অপরাধীর অপরাধের মাত্রাই বাড়ায়নি, গোটা জাতির হৃদয়ে
অবর্ণনীয় এক যন্ত্রণার ছাপ এঁকে দিয়েছে। দশকের পর দশক ধরে জাতি ও শহীদ
বুদ্ধিজীবীদের পরিবারের সদস্যরা সেই অব্যক্ত যন্ত্রণা বুকে চেপে আছেন।
আইনের অক্ষর এখানে নির্বিকার থাকতে পারে না। বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডে
অপরাধের প্রকৃতি, মাত্রা ও গভীরতার বিচারে একমাত্র মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হলে
ন্যায়বিচার করা হবে। ট্রাইব্যুনাল-২ প্রদত্ত রায়ে এসব পর্যবেক্ষণ দেন। তখন
আমি ছিলাম আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এর চেয়ারম্যান। আমার সঙ্গে
ট্রাইব্যুনালের বিচারিক প্যানেলের অপর দুই সদস্য বিচারক ছিলেন ব্রাদার জাজ
বিচারপতি মুজিবুর রহমান মিয়া (বর্তমানে হাইকোর্ট বিভাগে কর্মরত) এবং
বিচারপতি মো. শাহিনুর ইসলাম (বর্তমানে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর
চেয়ারম্যান)।
যেহেতু অভিযুক্ত দু'জনই পলাতক ছিল, তাই আইনের বিধান অনুযায়ী তাদের পক্ষে
স্টেট ডিফেন্স আইনজীবী নিয়োগের জন্য দু'জন দক্ষ আইনজীবীর নাম সরকারের কাছে
পাঠাই এবং আমাদের মনোনীত আইনজীবীদের সরকার মামলাটি পরিচালনার জন্য রাষ্ট্র
নিযুক্ত আইনজীবী বা স্টেট ডিফেন্স আইনজীবী হিসেবে নিয়োগ প্রদান করে।
মামলাটি 'চিফ প্রসিকিউটর বনাম আশরাফুজ্জামান খান ওরফে নায়েব আলী খান ও
চৌধুরী মঈনুদ্দীন' নামে নামাঙ্কিত হয়। প্রসিকিউশন পক্ষে মামলা পরিচালনায়
অংশগ্রহণকারী আইনজীবীরা ছিলেন- চিফ প্রসিকিউটর গোলাম আরিফ টিপু এবং তার
সহযোগী ছিলেন সৈয়দ হায়দার আলী, জেয়াদ আল মালুম, সাহিদুর রাহমান, তুরিন
আফরোজ, নুরজাহান মুক্তা, সাবিনা ইয়াসমিন খান প্রমুখ বিজ্ঞ প্রসিকিউটর।
অভিযুক্তদের পক্ষে ছিলেন রাষ্ট্র নিযুক্ত আইনজীবী আব্দুস শুকুর খান
(আশরাফুজ্জামানের পক্ষে) এবং সালমা হাই টুনি (চৌধুরী মঈনুদ্দীনের পক্ষে)।
যে কোনো অপরাধ-সংশ্নিষ্ট মামলার রায় প্রদান করতে গিয়ে সাক্ষীদের সাক্ষ্য
পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যালোচনা করা হয়। এই সাক্ষ্য ও পারিপার্শ্বিক আরও অন্যান্য
সাক্ষ্যের ওপর নির্ভর করা হয়। যৌক্তিকভাবে এসবের বিশ্নেষণ করা হয়। এভাবেই
সিদ্ধান্তে উপনীত হতে হয়। আর এটি করতে গিয়ে রায়ে সাক্ষীদের সবটুকু বক্তব্য
আলোচনায় আসে না। কেবল প্রদত্ত বক্তব্যের প্রাসঙ্গিক অংশটুকুই তুলে ধরা হয়। এ
মামলার রায় প্রচারিত হয়েছে ছয় বছর আগে। রায়টির সারাংশ ও ট্রাইব্যুনালের
পর্যবেক্ষণ তখনকার দেশি-বিদেশি পত্রপত্রিকায় প্রকাশ হয়েছিল। বর্তমানে
পূর্ণাঙ্গ রায়টি সংশ্নিষ্ট নথিতে ট্রাইব্যুনালে সংরক্ষিত আছে। যেহেতু
দণ্ডিত দু'জন আইনে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আত্মসমর্পণের পর এই রায়ের
বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে কোনো আপিল দায়ের করেনি, তাই বিষয়টি আর সাবজুডিশ বা
বিচারাধীন নয়। এটি এখন একটি পাবলিক ডকুমেন্ট বা গণদলিল। ট্রাইব্যুনালের
ওয়েসবাইটে এবং আইসিসি লিগ্যাল টুলস প্রজেক্টের ওয়েবসাইটেও তা আপলোডেড
রয়েছে। যে কেউ চাইলেই এই রায় সেখান থেকে পেতে পারেন, পড়তে পারেন।
যেহেতু এ মামলার রায় ও সাক্ষ্য সবই এখন পাবলিক ডকুমেন্ট, সেহেতু দেশের
মানুষের জানার অধিকার আছে, মামলার সাক্ষীরা ট্রাইব্যুনালে এসে স্বজন
হারানোর বেদনা কীভাবে ব্যক্ত করেছেন। সাক্ষীদের মধ্যে অনেকেই শহীদদের
সন্তান, নিকটাত্মীয়, স্বজন ও কাছের মানুষ। এই মামলার সাক্ষীরা
ট্রাইব্যুনালে কথাগুলো বলেছিলেন বাংলায়। সঙ্গত কারণেই ইংরেজিতে অনুবাদ করেই
রায়ে তুলে ধরা হয়েছে। রায় প্রদানের মাধ্যমে যে সত্য, জাতির যে আত্মত্যাগের
বিষয়টি বেরিয়ে আসে, তা বিশ্ব সম্প্রদায়ের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্যই
ইংরেজিতে রায় লেখার প্রয়াস। সাক্ষীদের আবেগের কথা রায়ে সামান্যই উল্লেখ
আছে। কেননা রায়ে এর সবটুকু প্রতিফলিত করা বেশ কঠিন।
১৪ ডিসেম্বরের তরুণ প্রজন্ম জানতে চায় সেই কালো দিনটির নির্মম সত্যের
অধ্যায়টি। তাই সাক্ষীদের সাক্ষ্যের উল্লেখযোগ্য অংশগুলো পাঠকদের জন্য তুলে
ধরছি। আমার বিশ্বাস, এটি থেকে সবাই জানতে পারবেন ক্ষত ও বেদনায় পূর্ণ
সত্যটি। জানতে পারবেন কীভাবে সেদিন জাতির শ্রেষ্ঠ মেধাবী সন্তান
বুদ্ধিজীবীদের বাসা থেকে কুখ্যাত আলবদররা ধরে নিয়ে যায় এবং তারপর কীভাবে
স্বজনরা তাদের প্রিয় মানুষটির লাশের খোঁজ পেয়েছিলেন বা আদৌ পাননি।
সাক্ষীদের এসব কথার প্রতিটিই যেন তাদের বুকে বয়ে বেড়ানো নিরন্তর কান্না।
তাদের কান্না থেকে বেরিয়ে এসেছে- কীভাবে এই শহীদ পরিবারগুলো এমনকি ছোট ছোট
সন্তান বুকে নিয়ে সামনের পথে হেঁটেছে। কীভাবে তারা বেঁচে থাকার সংগ্রাম
করেছেন এবং বর্তমানে তারা কেমন আছেন।

