সেন্টমার্টিনে ট্রলারডুবি
মানব পাচারের নির্মম বলি
×
ছবি: ফাইল
--
প্রকাশ: ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২০ | ১২:৩৯
সেন্টমার্টিনের অদূরে মঙ্গলবার সমুদ্রে যাত্রীবাহী ট্রলারডুবির ঘটনায় আমরা হতবাক হলেও বিস্মিত নই। বস্তুত বঙ্গোপসাগরের ওপর দিয়ে অবৈধ বিদেশযাত্রায় মানব পাচার চক্র যেভাবে বেপরোয়া ও বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে- এটা তারই অংশ। সমকালের প্রতিবেদন অনুসারে ট্রলারটি অন্তত ১৩৮ জন যাত্রী নিয়ে মালয়েশিয়া যাচ্ছিল, যাদের অধিকাংশই ছিল রোহিঙ্গা শরণার্থী। তারা মানব পাচারকারীদের প্ররোচনায় পড়ে উন্নত জীবনের আশায় এই ঝুঁকিপূর্ণ পথে পা বাড়িয়েছিল। ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, তারা গন্তব্যে যেতে পারেনি। তার আগেই চিরতরে অনেকের স্বপ্নের মৃত্যু হয়। বুধবার পর্যন্ত অন্তত ১৬ জনের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে, জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে ৭৩ জনকে। অর্থাৎ এখনও নিখোঁজ রয়েছে অন্তত অর্ধশত। সংবাদমাধ্যমে আমরা দেখেছি, অনেক রোহিঙ্গা তরুণীও মানব পাচারকারীদের ফাঁদে পা দিয়েছে বিয়ে করে সংসার করার আশায়। মূলত প্রতিবছর শীতকাল এলেই মানব পাচারকারীদের অপতৎপরতা বেড়ে যায়। দালালরা এই সুযোগের আশায় থাকে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে যারা এ কাজে পা দিয়েছে, তাদের সিংহভাগেই রোহিঙ্গা। স্থানীয় দালাল চক্র তো রয়েছেই, রোহিঙ্গাদের মধ্যেই এই দালাল তৈরি হয়েছে, যারা নানা প্রলোভন দিয়ে রোহিঙ্গাদের পাচার করছে। সহযোগী এক দৈনিকের প্রতিবেদন বলছে, গত এক বছরে প্রায় আটশ' রোহিঙ্গা ও দু'জন বাংলাদেশিকে উদ্ধার করা হয়। ২০১৫ সালে মানব পাচারের ঘটনা বেশ তোলপাড় হয় থাইল্যান্ডের জঙ্গলে গণকবর আবিস্কার করার পর। এমনকি মালয়েশিয়ায় পাওয়া যায় গণকবর। আমরা তখন অসহায়ের মতো ট্রলারডুবির মতো ভূমধ্যসাগরে উন্নত জীবনের প্রত্যাশায় পাড়ি দেওয়া মানুষের সলিল সমাধির খবর দেখেছি। তাদের মধ্যে দুঃখজনকভাবে হতভাগ্য অনেক বাংলাদেশিও ছিল। এরপর সরকারের পদক্ষেপ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর অবস্থানের কারণে পরবর্তী বছরগুলোতে মানব পাচারের মতো অপরাধ আমরা কিছুটা কম দেখলেও ২০১৯ সাল থেকে তাদের অপতৎপরতা দেখা যায়। মঙ্গলবারের ট্রলারডুবির ঘটনার পর আমরা মানব পাচারকারী দালালদের এর ব্যাপকতা নতুন করে উপলব্ধি করছি। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুসারে, দালাল চক্র প্রত্যেকের কাছ থেকে মালয়েশিয়া নেওয়ার নাম করে ২০ থেকে ৪৫ হাজার টাকা করে হাতিয়ে নেয়। বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গা শরণার্থীদের কাছে এ পরিমাণ টাকা কত বড় অঙ্কের তা বলার অপেক্ষা রাখে না। আমরা মনে করি, এ ব্যাপারে স্থানীয়দের তো বটেই, রোহিঙ্গাদেরও সচেতন করা জরুরি। মনে রাখতে হবে, দালা চক্রের নিশানা এখন রোহিঙ্গারা। তাছাড়া মানব পাচারকারীদের খপ্পরে বিশেষত তারাই পড়ে, যারা বেকার কিংবা দেশে কাঙ্ক্ষিত কর্ম করতে পারছে না। ফলে মানব পাচার বন্ধে প্রথমত কর্মসংস্থান বাড়াতে হবে, বেকারদের জন্য নতুন কর্মউদ্যোগে প্রেষণা দিতে হবে। একই সঙ্গে মানব পাচারকারীদের বিচারের আওতায় আনতে হবে। আমরা বিস্মিত যে, একটি প্রতিবেদন বলছে, ২০১২ সালের পর থেকে এখন পর্যন্ত ছয় শতাধিক মামলা হলেও একটিরও বিচার হয়নি। আমরা মনে করি, তাদের বিচার হতেই হবে। এক্ষেত্রে দালাল চক্র চিহ্নিত করে শাস্তির ব্যবস্থা করা জরুরি। সেন্টমার্টিনের ট্রলারডুবির ঘটনায় নিহতদের প্রতি আমরা শ্রদ্ধা জানাই। তাদের পরিবার ও নিখোঁজ স্বজনদের শোকসন্তপ্ত পরিবারগুলোর প্রতি আমাদের সমবেদনা।
- বিষয় :
- সেন্টমার্টিনে ট্রলারডুবি
