ঢাকা মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬

আন্তর্জাতিক নারী দিবস

প্রজন্মই হোক সমতার সারথি

প্রজন্মই হোক সমতার সারথি
×

আহসানুল তৈয়ব জাকির। ছবি: সংগৃহীত

--

প্রকাশ: ০৭ মার্চ ২০২০ | ১৫:০০

আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে সমকাল পরিবারের পক্ষে আমরা নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবাইকে শুভেচ্ছা জানাই। এ বছর, বিশেষ করে আমরা আহ্বান জানাতে চাই নতুন প্রজন্মকে। আমাদের সভ্যতা ও সমাজে নারীর প্রতি বৈষম্যের বিরুদ্ধে যে হাজার বছরের লড়াই ও সংগ্রাম- তাকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব বহুলাংশে নতুন প্রজন্মের ওপর, মনে রাখতে হবে। এও মনে রাখতে হবে, নারীর প্রতি বৈষম্য নিরসনে সামাজিক সংস্কার একটি বড় বাধা। আমরা বিশ্বাস করি, নতুনতর প্রজন্ম এই সংস্কার থেকে অপেক্ষাকৃত মুক্ত। একবিংশ শতাব্দীতে প্রযুক্তির বিপুল সম্প্রসারণ নেতিবাচক নানা সংস্কার থেকে উত্তরণে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। বস্তুত ইতোমধ্যে আমরা দেখেছি, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি নারীর জন্য অনেক অর্গল ভেঙে দিয়েছে। অস্বীকার করা যাবে না, প্রযুক্তির খোলা জানালা দিয়ে আলোর পাশাপাশি অনেক ধুলোও প্রবেশ করছে। কিন্তু এটাও স্বীকার করতে হবে, আগের তুলনায় নারী বহির্বিশ্ব ও সমাজের সঙ্গে সংযোগ ঘটাতে পারছে প্রযুক্তির মাধ্যমেই। এর ব্যবহার অনেক ক্ষেত্রে নারীকে করেছে আরও বেশি তথ্যসমৃদ্ধ ও প্রতিকারসজ্জিত। ফলে নারীমুক্তির আমরা যে স্বপ্ন শতাব্দীর পর শতাব্দী দেখে আসছি, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে নতুন প্রজন্মের হাত ধরে তার বাস্তবায়নের সম্ভাবনা এখন আগের যে কোনো সময়ের তুলনায় বেশি।

আমরা দেখছি, এ বছর আন্তর্জাতিক নারী দিবসের যে প্রতিপাদ্য নির্ধারিত হয়েছে, বাংলাদেশের নারী ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পক্ষে তার বাংলা ভাবানুবাদ হয়েছে এভাবে- 'প্রজন্ম হোক সমতার; সকল নারীর অধিকার'। জাতিসংঘ ঘোষিত প্রতিপাদ্যে অবশ্য আরও সরাসরি নতুন প্রজন্মকে নারীর অধিকার সুরক্ষায় দায়িত্বশীল হওয়ার কথা বলা হয়েছে। বলা হয়েছে, 'আই অ্যাম জেনারেশন ইক্যুয়ালিটি; রিয়েলাইজিং উইমেনস রাইটস।' আমরাও মনে করি, চলতি বছরের বাংলাদেশ ও বৈশ্বিক প্রতিপাদ্য আমাদের দেশের জন্য বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক।

অস্বীকার করা যাবে না যে, নীতি ও কাঠামোগত দিক থেকে নারীর ক্ষমতায়নের প্রশ্নে বাংলাদেশ বিশ্বের অনেক দেশের তুলনায় এগিয়ে রয়েছে। এ চিত্র অনেক উন্নত দেশের জন্যও ঈর্ষার হতে পারে যে, গত তিন দশক প্রায় একটানা নারী প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেতা পেয়ে এসেছে বাংলাদেশ। বর্তমান সংসদে স্পিকার হিসেবেও আমরা পেয়েছি একজন নারীকে। বর্তমান সংসদের ভেতরে একজন নারী বিরোধীদলীয় নেতা তো রয়েছেনই; সংসদের বাইরের রাজনীতিতেও অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দলটির নেতাও একজন নারী। এও স্বীকার করতেই হবে- সংসদে, মন্ত্রিসভায়, প্রশাসনেও নারীর অংশগ্রহণ তৃতীয় বিশ্বের বাস্তবতায় যথেষ্ট উৎসাহব্যঞ্জক। আমরা শ্নাঘার সঙ্গে দেখতে পারি- সংসদে ও স্থানীয় সরকারে নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসন ব্যবস্থা চালুর পর কেন্দ্রে ও তৃণমূলে নারীর প্রতিনিধিত্ব বেড়েছে। আমরা জানি, জাতীয় ও স্থানীয় সরকারে সংরক্ষিত নারী কোটার বাইরেও সাধারণভাবে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক নারী নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন। সংশোধিত গণপ্রতিনিধিত্ব আইন অনুযায়ী, রাজনৈতিক দলেও বাধ্যতামূলক করা হয়েছে নারী নেতৃত্ব। আমরা গভীর উৎসাহের সঙ্গে দেখছি- রাজনীতির বাইরে প্রশাসনেও কীভাবে নারীর ক্ষমতায়ন দৃশ্যমান হয়ে চলছে। আইনশৃঙ্খলা-সংক্রান্ত পেশায় নারীর অংশগ্রহণ দীর্ঘকাল আমাদের দেশে নানা মাত্রায় নিরুৎসাহিত ছিল। সেই অর্গলও ক্রমে ভেঙে চলছে আমাদের নতুন প্রজন্মের নারীরা। আমলাতন্ত্রের সর্বোচ্চ পদ সচিব হিসেবে নারীর দৃপ্ত পদচারণা আমাদের উদ্দীপ্ত করে। মাঠ পর্যায়ের প্রশাসনেও সাফল্যের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন উল্লেখযোগ্যসংখ্যক নারী।

নারীর এসব 'অগ্রগতি' সত্ত্বেও এ প্রশ্ন এখনও আমাদের সামনে এসে দাঁড়ায় যে- নারীর অবদান পরিবারে, সমাজে ও রাষ্ট্রে কতটা স্বীকৃতি পাচ্ছে? সমাজের বহু ক্ষেত্রে পশ্চাৎপদ ও পুরুষতান্ত্রিক কাঠামো নারীর অগ্রগতির পথে পথে যে কাঁটা বিছিয়ে রেখেছে, তা আমরা কতটা অপসারণ করতে পেরেছি? এখনও যেভাবে নির্যাতিত নারীরা আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়; এখনও যেভাবে ফতোয়া বা কথিত সালিশের শিকার নারীই হয়; তা যথেষ্ট হতাশা ও উদ্বেগের। এত পরিকল্পনা, কর্মসূচি সত্ত্বেও এখনও শহর-গ্রামে ধর্ষণ বা অ্যাসিড নিক্ষেপের মতো অপরাধ কেন নির্মূল করা যায়নি, নারী দিবসে দাঁড়িয়ে আমরা সেই প্রশ্ন নিজেদেরই করতে চাই।

আমরা প্রত্যাশা করি, সমতার সারথি হবে নতুন প্রজন্ম। আবহমান কাল থেকে বাংলাদেশে নারীরা যে সংগ্রাম, সাহস ও সক্ষমতা দেখিয়ে আসছে, তাতে নতুন মাত্রা যুক্ত করবে নতুনতর প্রজন্ম। নিছক অঙ্গীকার নয়; নিজের জীবন, পরিবার ও সমাজে নিজের সামর্থ্যের মধ্য দিয়ে আমাদের পুরুষ প্রজন্ম আমাদের নারী প্রজন্মের পাশে দাঁড়াবে। নারী ও পুরুষ প্রজন্ম মিলেই গঠন করবে নারীবান্ধব ও বৈষম্যহীন এমন সমাজ। সন্দেহ নেই, নারী-পুরুষ সমতার লড়াই অনিঃশেষ; কিন্তু নারী ও পুরুষ যদি নিজ নিজ পরিসরে সচেতন হয়, সংবেদনশীল হয়; তাহলে সেই পথে এগিয়ে যাওয়া নিশ্চয়ই সহজতর হয়।

আরও পড়ুন

×