ঢাকা মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬

অত তাড়াতাড়ি কোথাও যেতে হলে...

অত তাড়াতাড়ি কোথাও যেতে হলে...
×

--

প্রকাশ: ১২ মার্চ ২০২০ | ১২:৫৪

ঢাকার যাত্রাবাড়ী থেকে মাওয়া হয়ে ফরিদপুরের ভাঙ্গা পর্যন্ত ৫৫ কিলোমিটার 'এক্সপ্রেসওয়ে' উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ যে নতুন যুগে প্রবেশ করেছে, ওইদিন সমকালে প্রকাশিত এ সংক্রান্ত প্রতিবেদনের শিরোনামে যথার্থই তুলে ধরা হয়েছে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকীর দ্বারপ্রান্তে এই এক্সপ্রেসওয়ে বা 'ঝটিকা পথ' উদ্বোধন আমাদের সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত যোগাযোগ ব্যবস্থাকে উন্নততর করার যে মহানব্রত বঙ্গবন্ধু সূচনা করেছিলেন, তারই কন্যা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার টানা তিন মেয়াদের শাসনামলে তা নানা দিক থেকে ভিন্নমাত্রায় উন্নীত হয়েছে। যে দেশে একসময় বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান ছাড়া মাঝারি দৈর্ঘ্যের সেতুও নির্মাণের কথা চিন্তা করা যেত না, সেই দেশেই নিজস্ব অর্থায়নে নির্মিত হচ্ছে দেশের দীর্ঘতম সেতু। প্রমত্তা নদীর বুকে ক্রমেই মাথা তুলে একদা 'তলাবিহীন ঝুড়ি' বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতার জয়গান গাইছে পদ্মা সেতু। সেতুটি যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়ার পর সদ্য উদ্বোধন হওয়া এক্সপ্রেসওয়ের পূর্ণ সুফল আমরা পাব। দক্ষিণাঞ্চলের সঙ্গে রাজধানীর যোগাযোগ ব্যবস্থা তখন প্রবেশ করবে আরেকটি নতুন যুগে, সৃষ্টি হবে উন্নত জীবনমানের সুযোগ। পদ্মা সেতুকে 'বড় অবকাঠামো গড়ার আত্মবিশ্বাস' আখ্যা দিয়ে এই দুই পাশের এক্সপ্রেসওয়ে উদ্বোধন করতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্য এ ক্ষেত্রে প্রণিধানযোগ্য- শুধু সড়কপথ নয়, নৌপথ, রেল ও আকাশপথে সমগ্র বাংলাদেশে এমন একটি যোগাযোগ নেটওয়ার্ক তৈরি করা হচ্ছে, যা মানুষকে জীবনমান উন্নত করার সুযোগ করে দেবে।
আমরা দেখতে চাইব- নতুন চালু হওয়া এক্সপ্রেসওয়ে কেবল গতি বাড়ায়নি, সড়কপথের নিরাপত্তাও নিশ্চিত করেছে। আমরা জানি, এ ধরনের সড়কপথ নির্মিত হলে যেমন সময়ের, তেমনই জ্বালানি সাশ্রয় হয়। কিন্তু সেক্ষেত্রে সড়কের শৃঙ্খলা গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়। আমরা দেখেছি- দেশে আগেই কয়েকটি জাতীয় মহাসড়ক নির্মিত হলেও পথে পথে বাজার ও ব্যবসাকেন্দ্র বসানোয় কাঙ্ক্ষিত গতি পাওয়া যায়নি। বরং বেড়েছে দুর্ঘটনার হার। বর্তমান সরকারের টানা তিন মেয়াদেই একাধিক জাতীয় মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত হলেও সেখানেও আমরা বিশৃঙ্খলা দেখছি। বিশেষত ধীরগতির যানবাহন চলাচলের কারণে দ্রুতগতির যানবাহনগুলো স্বাভাবিক ছন্দে চলতে পারে না। স্বস্তির বিষয়, ছয় লেনের এক্সপ্রেসওয়েতে যত্রতত্র বাজার বা ব্যবসাকেন্দ্র বসানোর সুযোগই রাখা হয়নি। যেখানে-সেখানে চৌরাস্তা ও পারাপার এড়াতে বরং নির্মিত হয়েছে প্রায় একশ' ছোট-বড় সেতু, উড়াল সেতু ও সুড়ঙ্গ। ধীরগতির যানবাহনের জন্য তৈরি হয়েছে সমান্তরাল 'সার্ভিস লেন'। অবশ্য ভুলে যাওয়া চলবে না যে, এক্সপ্রেসওয়েতে চলাচলের জন্য যানবাহনের ফিটনেসে ছাড় দেওয়া যাবে না। দ্রুতগামী সড়কে লক্কড়ঝক্কড় যানবাহন অন্যদের জন্যও দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি করে। এছাড়া গাড়ির টায়ারের মানও ঠিক রাখতে হবে। বর্তমানে অপেক্ষাকৃত ধীরগতির সড়কে নিম্নমানের টায়ার দিয়ে কাজ চললেও এক্সপ্রেসওয়েতে অবশ্যই উন্নতমানের টায়ার ব্যবহার করতে হবে। অন্যথায় তা গরম হয়ে দুর্ঘটনার আশঙ্কা থেকেই থাকে। আমরা আশা করি, গতি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখার এত আয়োজন বিফলে যাবে না। দেশের প্রথম এক্সপ্রেসওয়েটি নিরাপত্তা ও নান্দনিকতা অক্ষুণ্ণ থাকবে।
কবি জীবনানন্দ দাশ বলেছিলেন- 'আমি অত তাড়াতাড়ি কোথাও যেতে চাই না।' কারণ তার হেঁটে হেঁটে গন্তব্যে পৌঁছবার সময় ছিল; পৌঁছে অপেক্ষার অবসরও ছিল। কথিত রয়েছে, ত্রিশের দশকে কলকাতার সড়কে প্রথম মোটরকার দেখে 'উনিশশো চৌত্রিশের' কবিতায় তিনি এমন অভিব্যক্তি ব্যক্ত করেছিলেন। তখন তার কাছে অতি গতিকে মনে হয়েছিল 'অন্ধকার'। কিন্তু আমরা এখন একুশ শতকে। এখানে গতিই অগ্রগতি। আমরা প্রত্যাশা করি- সেই ধারায় দেশের প্রথম এক্সপ্রেসওয়ে অন্ধকার নয়, আলোই ছড়াবে। তবে অত তাড়াতাড়ি কোথাও যেতে হলে যে সতর্কতাটুকু প্রয়োজন, তা যেন আমরা ভুলে না যাই।

আরও পড়ুন

×