ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

রাজনীতি

দক্ষিণপন্থি ধর্মাশ্রয়ী দলগুলোর জনপ্রিয়তার  কারণ

দক্ষিণপন্থি ধর্মাশ্রয়ী দলগুলোর জনপ্রিয়তার  কারণ
×

ফাইল ছবি

মো. মোস্তাফিজার রহমান 

প্রকাশ: ১৯ জুলাই ২০২৫ | ২০:৫৬

চিন্তকদের  কারও কারও ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ চব্বিশের অভ্যুত্থানের পর থেকে জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামপন্থি দলগুলোর সাংগঠনিক প্রভাব ও জনসমর্থন বাড়ছে। আমার ধারণা মধ্যপন্থি গণতান্ত্রিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের তিন-তিনবার ভুয়া নির্বাচন, দুর্নীতি ও অপশাসনের ফলে রাজনীতিতে সৃষ্ট শূন্যতা পূরণের সুযোগ তৈরি হওয়াই হতে পারে তার প্রধান কারণ। ভোটের রাজনীতিতে শূন্যতা কেউ না কেউ পূরণ করবে। গ্রহণ-বর্জন তো জনমত তৈরির স্বাভাবিক রীতি। সাধারণ মানুষ কোনো দলকে বর্জন করার সঙ্গে সঙ্গে তার পছন্দের দলের প্রতি অনুরক্ত হবে।  সে ক্ষেত্রে বিকল্প দলগুলোর মধ্যে অপেক্ষাকৃত ভালোটাকে বাছাইয়ের জন্য তুলনামূলক বিচার-বিশ্লেষণ হতে পারে। দেশের মানুষের কল্যাণ চিন্তায় সুবিচার ও সুশাসনের  প্রতি  আন্তরিক  ও জনগণের আস্থা অর্জনে সক্ষম এমন দলগুলোই তাদের পছন্দের তালিকায় অগ্রাধিকার পায়। রাষ্ট্রক্ষমতা কার হাতে গেলে দেশ চাঁদাবাজ, দখলদার, সন্ত্রাস, লুটপাট ও দুর্নীতিমুক্ত হবে, মানুষের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, আত্মমর্যাদা, গণতন্ত্র ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে, দেশের সম্পদ বিদেশে পাচার হবে না, মেধাবী ও যোগ্যজনদের মূল্যায়ন হবে, সর্বোপরি বৈষম্য-বঞ্চনা দূর হবে এবং জনমতের ভিত্তিতে রাষ্ট্র পরিচালিত হবে–  সেটাই মনে হয় আজ মানুষের ভাবনার মূল বিষয়। তেমন উদ্দেশ্যেই জনমনে রাষ্ট্র সংস্কারের প্রত্যাশা প্রবল হয়ে উঠেছে। রাষ্ট্র সংস্কারের পক্ষে-বিপক্ষে দলগুলোর অবস্থান কী, সেটাও মনে হয় এই মুহূর্তে দল নির্বাচনে জনগণের বিবেচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।  

মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ-বিপক্ষ, ভারত-পাকিস্তানের পক্ষ-বিপক্ষের পুরোনো রাজনীতির জায়গা  থেকে মানুষ বেরিয়ে এসে সুশাসন ও উন্নয়নের ফল হাতে হাতে পেতে চাইছে। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে গণতন্ত্রের চর্চা আজ মানুষের ভাবনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। আবার  মানুষ সন্ত্রাস, কট্টরপন্থা, উগ্রবাদ বা জঙ্গিবাদের বিপক্ষে। সাধারণ মানুষ তুলনামূলকভাবে বিচার-বিশ্লেষণ করে পছন্দের রাজনৈতিক দল বেছে নিতে আগ্রহী হয়েছে। ধারণা করা হয়, তেমন বিবেচনা থেকে এবং শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগ দলটির নেতাদের ভারতে আশ্রয় দান ও বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের বিপক্ষে মিডিয়াতে প্রতিবেশী দেশটির মনগড়া প্রচার ও অবস্থানের কারণে গণঅভ্যুত্থানের পক্ষের দলগুলোর প্রতি সিংহভাগ সাধারণ মানুষ আগ্রহী হয়ে উঠেছে। এমন পরিস্থিতিতে সাংগঠনিক শক্তি থাকলেও সাধারণ মানুষের মধ্যে যে দলগুলোর অতীতে  ব্যাপক সমর্থন ছিল না, তেমন দক্ষিণপন্থি ও ধর্মাশ্রয়ী দল জামায়াতে ইসলামীসহ অন্যান্য দলের প্রতি মানুষ কিছুটা হলেও ঝুঁকে পড়েছে। পথে-প্রান্তরে, নগরে-বন্দরে, চায়ের আড্ডায় আলাপচারিতায় মানুষের মনের তেমন ভাবনা অনুভূত হয়। শনিবার জামায়াতের সমাবেশে উপস্থিতিও তার প্রমাণ। তবে দক্ষিণপন্থি দলগুলোর জনপ্রিয়তা বাড়লেও তা কতটা বেড়েছে, সে বিষয়ে নির্বাচন পর্যন্ত মনে হয় আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। 

অতীত অভিজ্ঞতার আলোকে ধারণা করা হয়, স্বাধীনতার পরে আগস্ট পূর্ববর্তীকালে ক্ষমতাসীন সব রাজনৈতিক দলের যথার্থ গণতন্ত্র চর্চায় অপারগতা, বিশেষ করে ’৯০-এর গণঅভ্যুত্থানের পর ক্ষমতাসীন দুই বৃহৎ দলের প্রতি  মানুষের অনাগ্রহ, অনাস্থাই তৃতীয়  শক্তি হিসেবে ইসলামপন্থি দলগুলোর ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তার  কারণ। ‘জ্বলন্ত উনুন থেকে ফুটন্ত কড়াই’, ‘যেই লাউ সেই কদু’ মানুষ আজও ভুলতে পারেনি। তবে সুদীর্ঘকাল ক্ষমতার বাইরে থাকা ও দমন-পীড়নের শিকার হওয়ায় বিএনপি একালে জনগণের সহানুভূতি লাভ করতে অনেকটা সক্ষম  হলেও, দলটি সম্পর্কে অনেকের মনে নেতিবাচক ধারণা ও আওয়ামী লীগ দলের জনবিচ্ছিন্নতার কারণে ভোটের রাজনীতিতে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা পূরণে বিএনপি কিছুটা এগিয়ে গেলেও সে ক্ষেত্রে ধর্মাশ্রয়ী দক্ষিণপন্থি দলগুলো জনগণের আস্থা অর্জনে অতীতের তুলনায় বেশি অগ্রসর হয়েছে বা হচ্ছে অনুভূত হয়। মহাত্মা গান্ধীর ধর্মনিরপেক্ষ ভারতে হিন্দু জাতীয়তাবাদী দল বিজেপির উত্থানের শক্তি তাকে উৎসাহ জোগাতেও পারে। সাধারণ মানুষের মনে ক্রিয়া করতে পারে, ভারতে হিন্দুত্ববাদী দল পরপর তিনবার ক্ষমতায় আসীন হতে পারলে বাংলাদেশে ইসলামপন্থি দল ক্ষমতায় আসার ক্ষেত্রে  আপত্তি  কোথায়?  আমার ধারণা এটিকে প্রতিযোগিতায় পেছনে ফেলতে হলে বিএনপি, ছাত্র-তরুণদের নতুন দল এনসিপিসহ সব উদার মধ্যপন্থি গণতান্ত্রিক দলের সে ক্ষেত্রে অগ্রসর হওয়ার সক্ষমতা অর্জন করতে হবে। বিএনপিকে পুরোনো রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে,  রাষ্ট্রব্যবস্থা সংস্কারে জনমতের প্রত্যাশা অনুযায়ী অন্যান্য রাজনৈতিক দল ও সংস্কার কমিশনের সঙ্গে ঐকমত্য তৈরির ক্ষেত্রে যথার্থ উদ্যোগ নিতে হবে। অর্থাৎ সংস্কার, নির্বাচন ও আওয়ামী লীগ প্রসঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকার, ঐকমত্য কমিশনের  রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে জাতির বৃহত্তর স্বার্থে ও যৌক্তিক কারণে মৌলিক বিষয়ে ঐকমত্য গড়তে হবে। কারণ গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে তৈরি হওয়া বিপ্লবের আকাঙ্ক্ষার প্রতিও মানুষের আশা-স্বপ্ন পরিলক্ষিত হচ্ছে এবং স্বৈরাচারী ব্যবস্থার অবসান এবং বৈষম্য-বঞ্চনা নিরসনে মানুষের ভাবনাও বল লাভ করেছে।

অতীতের অভিজ্ঞতা বলে, সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ আজও মধ্যপন্থি রাজনৈতিক দলকে নিরাপদ আশ্রয়ের জায়গা মনে করে। তবে মানুষ পুরোনো রাজনীতি বদলানোর পক্ষে। অনেক মানুষের মনে প্রশ্ন, ৫ আগস্টের পর তারা মামলা-হামলা থেকে মুক্তি পেল, জেল থেকে বেরিয়ে এলেও তাদের রাজনীতি ও তৃণমূল পর্যায়ের দলের কর্মকাণ্ড আগের মতোই থেকে গেল কেন? নির্বাচনের লেবু নেতারা এতই চিপতে থাকলেন যে  তা জনমনে তেতো হয়ে গেল। শুধু নির্বাচনে গেলেই যদি সব সমস্যার সমাধান হয়, তবে ’৯০-এর অভ্যুত্থানের পর সেটা হয়নি কেন? কেবল ক্ষমতার হাতবদলই কি অভ্যুত্থানের উদ্দেশ্য? জনমনে আরও প্রশ্ন, ক্ষমতায় যাওয়ার আগেই হাট-মাঠ-ঘাট চাঁদাবাজির স্থানগুলো তাঁরা দখলে নিল কেন? শূন্যই থাকত। অন্তত জনগণকে বলতে পারত, আমরা অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে বিরত আছি, আর চাঁদাবাজি হবে না। জনগণ আশ্বস্ত হতো, সেটা হলে জনমত আরও বেশি বিএনপির পক্ষে যেত। বিএনপির বদলে যাওয়ার ক্ষেত্রও প্রস্তুত হতো। আমার ধারণা উদার মধ্যপন্থি দল হিসেবে বিএনপির জনমত পক্ষে নেওয়ার অমিত সম্ভাবনা এখনও উজ্জ্বল। তার সেই পুরোনো পথ পরিহার করে অতীত ভুলের জায়গাগুলো থেকে বেরিয়ে আসার বিষয়ে আন্তরিক হলে এবং সে বিষয়ে যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণ করা হলে এখনও ভোটের রাজনীতিতে জনগণের আস্থা অর্জনের উজ্জ্বল সম্ভাবনার ফসল দলটি ঘরে তুলতে পারে। সেটা না হওয়ায় এবং বাম দলগুলোর সাংগঠনিক দুর্বলতার ফলে জনসম্পৃক্ততা সংকটের কারণে ধর্মভিত্তিক দলগুলোর  জনগণের আস্থা অর্জনের নিশ্চিতভাবেই অনেকখানি সুযোগ তৈরি হয়েছে।

চিন্তক সমাজের কেউ কেউ ধর্মাশ্রয়ী দক্ষিণপন্থি দলগুলোকে কট্টরপন্থি বিবেচনা করছেন। কিন্তু ধর্মাশ্রয়ী হলেই তারা কট্টরপন্থি হবে এমন ভাবনা সঠিক না-ও তো হতে পারে। বিদ্যমান সমাজ বাস্তবতায় জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলের চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে চলার সক্ষমতা তারা অর্জন করতেও পারে। অতীত অভিজ্ঞতা ও প্রজ্ঞা সে কাজে তাদের সহায়তা করতে পারে। সেটা বোঝা যাবে যদি তারা রাষ্ট্রক্ষমতায় যাওয়ার মতো জনপ্রিয় হয় বা রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয় তাহলে। তবে ধারণা করা হয়, দক্ষিণপন্থিরা ক্ষমতায় এলে তারা যদি সত্যি সত্যি কট্টরপন্থি হয়ে ওঠে, তাদের সংস্কৃতির চরিত্রে যদি তার প্রতিফলন  ঘটে, সঙ্গে সঙ্গে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও মুক্তবুদ্ধির চর্চা যদি ব্যাহত হয়, তাহলে তারা ক্ষমতায় যে-ই আসুক, বৈষম্য দূরীকরণে ভালো কাজ করলেও হয়তো শাসনক্ষমতায় টিকে থাকা তাদের পক্ষে কষ্টসাধ্য হতে পারে।  

ড. মো. মোস্তাফিজার রহমান: অধ্যক্ষ (অব.), নওগাঁ সরকারি কলেজ

আরও পড়ুন

×