ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

কিশোর অপরাধ : শাস্তি নয় সংশোধন

কিশোর অপরাধ : শাস্তি নয় সংশোধন
×

মো. আব্দুর রাজ্জাক:

মো. আব্দুর রাজ্জাক

প্রকাশ: ২২ জুলাই ২০২৫ | ২০:৩২ | আপডেট: ২২ জুলাই ২০২৫ | ২২:৪৯

বাংলাদেশে সাম্প্রতিককালে একটি মারাত্মক সামাজিক সমস্যা হলো কিশোর অপরাধ। রাজধানী ঢাকা সহ দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত কিশোর অপরাধ প্রকট আকার ধারণ করেছে। ছোট ছোট অপরাধ মূলক কার্যক্রম থেকে শুরু করে তাদের দ্বারা বড় বড় অপরাধগুলো সংঘটিত হচ্ছে। একশ্রেণীর লোক তাদের ব্যবহার করে সমাজে ও রাষ্ট্রে লৌহ মর্ষক  ঘটনা ঘটিয়ে যাচ্ছে। রাজনৈতিক ছত্র ছায়ায় অথবা বড় ভাইদের আশ্রয় প্রশ্রয়ে তারা হুকুম তামিল করতে যেয়ে অন্ধকার জগতে প্রবেশ করছে। তারা ভবিষ্যতের কথা চিন্তা না করে না বুঝে অপরাধ মূলক কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে থাকে। ইদানিং রাস্তাঘাটে পাড়া মহল্লায় তাদের হাতে ছুরি চাকু রামদা চাপাতি পিস্তল প্রভৃতি মারণাস্ত্র দেখা যাচ্ছে যা ঢাকাবাসীর কাছে রীতিমতো আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এজন্য সমাজের সর্বস্তরের মানুষ জীবনযাপন ও চলাফেরায় দারুন  আতঙ্কগ্রস্থ।

বাংলাদেশ পেনাল কোড অনুযায়ী সাত থেকে ১৬ বছর বয়সের ছেলেমেয়েদেরকে কিশোর বলা হয়। সামাজিক মূল্যবোধের পরিপন্থী ও সমাজবিরোধী কার্যকলাপই হচ্ছে কিশোর অপরাধ। এই বয়সে তারা সমাজ ও রাষ্ট্র বিরোধী অপরাধমূলক কার্যক্রমে জড়িত থাকে। অর্থাৎ সমাজ কর্তৃক আকাঙ্খিত আচরণ প্রদর্শনের ব্যর্থতায় হল কিশোর অপরাধ।

বাংলাদেশে কিশোর অপরাধের ধরন বহুবিধ। যেমন পিতা-মাতা ও শিক্ষকদের অবাধ্যতা স্কুল পালানো উশৃঙ্খলতা প্রদর্শন রাজনৈতিকভাবে নাশকতা মূলক কাজ করা বোমাবাজি এসিড নিক্ষেপ পকেটমার মারপিট চোরাকারবারের  বাহক চোরাই মাল ও মাদকদ্রব্য বহন অপহরণ খুনসহ নানাবিধ কর্মকান্ডে তারা জড়িত থাকে।

বাংলাদেশে কিশোর অপরাধ নানাবিধ কারণে সংঘটিত হয়। যেমন বংশগত ভৌগলিক অর্থনৈতিক সামাজিক রাজনৈতিক প্রশাসনিক প্রভৃতি কারণগুলো অনেকাংশে  দায়ী। এর মধ্যে দারিদ্র্য দাম্পত্য কলহ বিবাহ বিচ্ছেদ মূল্যবোধের অবক্ষয় ত্রুটিপূর্ণ সামাজিকীকরণ শিল্পায়ন ও শহরায়ন অসৎসঙ্গ বস্তির প্রভাব অশ্লীল পত্র-পত্রিকা ব্লু ফিল্ম প্রভৃতি কারণ গুলো অন্যতম। 

কিশোর অপরাধীরা সঙ্ঘবদ্ধভাবে শহরে ঘোরাফেরা করে। সঙ্গবদ্ধভাবেই নিরীহ মানুষের উপর আক্রমণ করে সর্বস্ব হাতিয়ে নিয়ে থাকে। তারপরেও তাদেরকে শাস্তি দিয়ে যদি কারাগারে পাঠানো হয় তাহলে জেলখানায় দাগি আসামিদের সাথে মিশে অপরাধের আধুনিক পদ্ধতি কলাকৌশল রপ্ত করে ভয়ংকর অপরাধী হিসেবে সমাজে আত্মপ্রকাশ করবে এবং তাদের মধ্যে কারা বরণের জিঘাংসা বা প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার জন্য ভয়ংকর রূপে সমাজে আবির্ভূত হবে। তাই তাদেরকে শাস্তি নয় বরং সংশোধনের মাধ্যমে আমরা তাদেরকে আলোর পথে ফিরিয়ে আনতে পারি। 

মানব শিশুর প্রথম প্রতিষ্ঠান হল পরিবার। এই পরিবারের প্রথম শিক্ষক হলো মা-বাবা। যৌথ পরিবার হলে দাদা-দাদি চাচা চাচি ভাই বোন। জন্মগ্রহণ করার পরে বেড়ে ওঠার সাথে সাথে তাকে আদর যত্ন ভালোবাসা দিয়ে নীতি নৈতিকতা মূল্যবোধ সকল ভাল কাজের দিকনির্দেশনা দিতে হবে। পারিবারিক শিক্ষায় তাকে বড় করবে বিনয়ী ও মানবিক গুণাবলী অর্জনে সহায়ক হবে। ভালো মানুষ হতে গেলে যা যা করা দরকার পরিবার তাকে সেই শিক্ষাই দিবে। নরম কাঁদার উপর আঙুলের ছাপ দিলে যেমন সেই ছাপটি দীর্ঘস্থায়ী হয় তেমনি কোমলমতি শিশুদের যা শেখানো হবে সে তাই শিখবে এবং সেটাকে সে ধারণ লালন ও পালন করবে।

সংশোধনের জন্য ধর্মীয় শিক্ষার উপর গুরুত্ব আরোপ করতে হবে। স্কুলে মা-বাবার সাথে যাওয়া ভালো বন্ধু নির্বাচন করা সঙ্গ দোষ থেকে দূরে থাকা ভালো খেলার সাথী নির্বাচন করা সন্ধ্যার পূর্বে বাড়িতে ফেরা পড়ার সময় অন্য কিছু করছে কিনা খেয়াল রাখা এবং সর্বোপরি এইচএসসি পরীক্ষার পূর্ব পর্যন্ত মোবাইল থেকে দূরে রাখা। সন্তানদেরকে ভালো মানুষ করে গড়ে তোলার জন্য এ কাজগুলো পরিবারকে দায়িত্বশীলতার সাথে পালন করতে হবে।

দেশের অন্যান্য সামাজিক সমস্যার মধ্যে অন্যতম একটি সমস্যা হল কিশোর অপরাধ। রাস্তাঘাটে মানুষ এখন বের হতে ভয় পায়। কিছু নির্দিষ্ট রাস্তা আছে যেগুলো মানুষ এড়িয়ে চলে। দিনেই রেহাই পায় না অনেক মানুষ। শাস্তি দিয়ে কখনো এদের ভালো করা যাবে না। দরদ দিয়ে ভালোবাসা দিয়ে সংশোধনাগারে পাঠিয়ে ভালো কাউন্সেলিং এর মাধ্যমে তাদেরকে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। 

শাস্তি নয় সংশোধন এই মন্ত্রে উজ্জীবিত হয়ে সমাজের বিত্তবান ব্যবসায়ী মসজিদের ইমাম মাদ্রাসার সুপার স্কুলের প্রধান শিক্ষক কলেজের অধ্যক্ষ রাজনীতিবিদদের মাধ্যমে লেখাপড়ার পাশাপাশি কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রোগ্রামে তারা ভর্তি হতে পারে। বড় মন নিয়ে যদি সামাজিকভাবে তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা যায় তাহলে তাদের কলুষিত জীবন আলোর পথ দেখতে পারবে। এজন্য দরকার ঢাকা সহ বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে গঠিত একটি শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম। তাহলে তারাও হতে পারে এ সমাজের একজন উত্তম নাগরিক এবং পুনরায় ফিরে পেতে পারে   তাদের হারানো সুন্দর জীবন।

যে সকল শিক্ষার্থী স্কুল থেকে ঝরে পড়ে অপরাধ জগতের মধ্যে ঢুকে পড়ে কাউন্সিলিংয়ের মাধ্যমে ছাত্র শিক্ষকদের মধ্যে সোহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষক এবং স্কুলের ভয়ভীতি কাটানো শিক্ষকদের অতিরিক্ত শাসন বেত্রাঘাত বকাবকি ক্লাসে অপমান করা দাঁড়িয়ে রাখা হোমওয়ার্ক বেশি দেয়া এগুলো থেকে বিরত থেকে আদর ভালবাসা দিয়ে সুন্দর জীবনের স্বপ্ন দেখিয়ে তার নিকট থেকে পড়াগুলো আদায় করা। ছাত্রদেরকে বোঝাতে হবে শিক্ষক তোমার একজন ভালো বন্ধু ও বটে। 

কিশোর অপরাধীদের মধ্যে এমন অনেক শিশু আছে যারা জন্ম থেকে  বাবা-মায়ের আদর যত্ন ভালবাসা থেকে বঞ্চিত হয়েছে অথবা বস্তিতে মা-বাবা কে তাও জানে না। মানুষের বাড়িতে কাজ করতে যেয়ে ছোট ছোট ভুলের কারণে অনেক শাস্তি ভোগ করতে হয়েছে। তার এই অপরাধী হওয়ার পিছনে অনেক কারণ থাকতে পারে। এক্ষেত্রে সমাজকর্মীরা প্রত্যেককিশোর অপরাধীর কেস স্টাডি গ্রহণ করে তাদের অপরাধের পিছনের ইতিহাস জানতে পারে। বিভিন্ন এলাকা পাড়া মহল্লায় যদি কিশোর অপরাধীদের সংশোধনাগারে পাঠানো যায় তাহলে তাদের দেখাদেখি অনেক কিশোর অপরাধ জগত ছেড়ে ভালো পথে আসতে পারে। তবে সেখানে তাদের সুন্দর জীবনের নিশ্চয়তা প্রদান করতে হবে। 

আশরাফুল মাখলুকাত এ মানুষ সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব। সবকিছুর উপর আল্লাহ মানুষকে  শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন। কেউ পাপী হয়ে জন্মগ্রহণ করে না। দেখা যায় মায়া-মমতা ভালোবাসা এবং সঠিক পরিচর্যার অভাবে এরা অংকুরে বিনষ্ট হয়ে যায়। তাদের ভালো কাজে অংশগ্রহণ নির্মল চিত্ত বিনোদনের ব্যবস্থা করা পাশাপাশি অভিভাবকদের কাউন্সিলিং এর ব্যবস্থা করা সন্তানদের প্রতি যত্ন ও খেয়াল রাখা তাদের মনোভাব বুঝে কথা বলা এবং অতিরিক্ত শাসন থেকে দূরে থাকা। সন্তানদের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের জন্য এবং ভালো মানুষ রুপে গড়ে তোলার জন্য  পরিবারকে এ দায়িত্ব গুলো সুন্দরভাবে পালন করতে হবে। 

সর্বোপরি সমাজের সর্বস্তরের মানুষ তাদেরকে যদি সহানুভূতি ও ভালোবাসা দৃষ্টিতে দেখে তাহলে আমরা পেতে পারি একটি কিশোর অপরাধ মুক্ত সমাজ ।তারাও পেতে পারে স্বপ্ন ঘেরা সুন্দর ভবিষ্যৎ । যেখানে থাকবে না কোন ভয়-ভীতি থাকবে শুধু মায়া মমতা ভালবাসা ও শ্রদ্ধা। মনে রাখতে হবে পাপকে ঘৃণা করুন, পাপীকে নয়।

মো. আব্দুর রাজ্জাক: অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, সমাজকর্ম বিভাগ, মোহাম্মদপুর কেন্দ্রীয় কলেজ ঢাকা।

আরও পড়ুন

×