সমকালীন প্রসঙ্গ
পাথুরে রাজনীতি জমে ক্ষীর
ফাইল ছবি
আদনান মনোয়ার হুসাইন
প্রকাশ: ২২ আগস্ট ২০২৫ | ২০:৩৪ | আপডেট: ২২ আগস্ট ২০২৫ | ২০:৪৩
বাঙালি এমনই এক জাতি যারা নাকি সব সময় নিজেরা নিজেদের সমালোচনায় ব্যস্ত থাকে। ইতিবাচক কিছু না দেখে সারাক্ষণ শুধু নেতিবাচকের চর্চা করে। পরিশ্রমী উদ্যোমীকে সহযোগিতার হাত না বাড়িয়ে বাঙালি নাকি উপরে উঠতে থাকা কারও পা ধরে টেনে নামাতে হুমড়ি খেয়ে পড়ে।
দেশের রাজনীতি নিয়েও কিছু মানুষ ব্যাপক হতাশ। তাদের অবিরাম হা-হুতাশের দীর্ঘশ্বাসে রাজনীতি নামক বস্তুটি একেবারে ঘোলা হয়ে গেছে। রাজনীতিতে আদর্শ নেই, রাজনীতিকদের মধ্যে ঐক্য নেই, পুলিশ ও প্রশাসনের সঙ্গে নেতাদের দূরত্ব ইত্যকার নানা সমালোচনার তীরে বিদ্ধ দেশের রাজনীতি।
অথচ তারা সিলেটের কোম্পানীগঞ্জের ভোলাগঞ্জের পর্যটনকেন্দ্র সাদাপাথরের দিকে তাকালেই আশার আলো খুঁজে পেতেন। সেখানে পাথুরে ঐক্যে রাজনীতি-প্রশাসন-পুলিশ সবাই জমে যেন ক্ষীর! দুদকের গোয়েন্দা শাখা বিষয়টি নিয়ে হালকা গবেষণা করেছে। তাদের প্রাথমিক অনুসন্ধানে পাথরকেন্দ্রিক ঐক্যের কেন্দ্রে দেখা গেছে ৪২ জন স্থানীয় রাজনীতিবিদ ও পাথর ব্যবসায়ীকে। নেতাদের মধ্যে বিএনপির ২১ জন, জামায়াতের দুজন, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) দুজন ও আওয়ামী লীগের সাতজন রয়েছেন। চমৎকার এ বন্দোবস্তে তালিকার দ্বিতীয় অবস্থানে ঠাঁই পেয়েছে আওয়ামী লীগ। অথচ মাত্র এক বছর আগে তাদের ক্ষমতাছাড়া করেছে তালিকায় থাকা বাকি দলগুলো। সাদাপাথরে যেখানে সাদামনের ঐক্য গড়ে উঠেছে, সিলেটের কাছাকাছি জেলা ময়মনসিংহে গত সোমবার তার বিপরীত চিত্র দেখা গেছে। ঐতিহ্যবাহী আনন্দমোহন কলেজের চুল-দাড়ি সাদা হয়ে যাওয়া ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মুচলেকা দিয়ে ক্যাম্পাস ত্যাগ করেছেন। অপরাধ, তাঁর ছোট ভাই স্থানীয় আওয়ামী লীগের রাজনীতি করেন।
সাদাপাথরে যেন ফাটল না ধরে তা দেখভাল করেছেন বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, থানার ওসি, বিজিবির সদস্য এবং খনিজ সম্পদ উন্নয়ন ব্যুরো। অবশ্য দুদক খামোখাই দোষারোপ করে বলছে, ওনারা দায়িত্বে অবহেলা করেছেন। বরং সবাই মিলেমিশে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কীভাবে পাথর ঠেলা যায় তার উদাহরণ তৈরি করেছেন তারা। তাদের এ অনন্য মেলবন্ধন ভবিষ্যতের জন্য প্রবাদে রূপ নিতে পারে।
গত ৮ জুলাই সিলেটের বিভাগীয় কমিশনারের সঙ্গে তাঁর কার্যালয়ে পাথর ব্যবসায়ী, পরিবহন শ্রমিক ও রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে বৈঠক হয়। সেখানে তারা মানুষের জীবন ও জীবিকা নিয়ে আলোচনা করেন। অচল স্থবির হয়ে এক জায়গায় পানিতে আধা তলিয়ে পড়ে থাকা পাথরের দুঃখ নিয়েও তারা মানবিক আলোচনা হয়তো করেছেন। সরকারি নির্দেশের কারণে ২০২০ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি থেকে পাথরগুলোকে দেশ ভ্রমণ করানো যাচ্ছিল না।
দুদকের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি ট্রাক পাথর বিক্রি হয় ৯১ হাজার টাকায়। তা থেকে ১০ হাজার টাকা পুলিশ ও প্রশাসনের জন্য আলাদা করা হয়। বাকি ৮১ হাজার টাকা অবৈধভাবে পাথর উত্তোলনকারীরা ভাগাভাগি করে নেন। ১০ হাজার টাকার মধ্যে পুলিশের (ওসি, সার্কেল এএসপি, এসপি ও অন্যান্য) জন্য পাঁচ হাজার টাকা এবং প্রশাসনের (তহশিলদার, এসিল্যান্ড, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, জেলা প্রশাসক ও অন্যান্য) জন্য পাঁচ হাজার টাকা হারে প্রদান করা হয়। প্রতিটি বারকি নৌকা থেকে এক হাজার টাকা নেওয়া হয়। তা থেকে পুলিশ বিভাগ পায় ৫০০ টাকা এবং প্রশাসন (ডিসি ও ইউএনও) পায় ৫০০ টাকা। পুলিশ নির্দিষ্ট সোর্সের মাধ্যমে এ অর্থ সংগ্রহ করে। ঘটনাস্থল থেকে মাত্র ৫০০ মিটার দূরত্বে থাকা বিজিবি ক্যাম্পের সদস্যরা নৌকাপ্রতি ৫০০ টাকা নেন। তা এখানে আপত্তির কী আছে? কথা হচ্ছে, এই পাথর উৎপাদন বা রক্ষণাবেক্ষণে কারও কি কোনো বিনিয়োগ আছে? তাহলে কীসের ভিত্তিতে ৯১ হাজার টাকা আপনি একাই পকেটে পুরবেন! এটি তো নিদারুণ বৈষম্য, সৎলোকের কাজ এমন হতে পারে না। সবাই মিলেমিশে থাকা, সম্পদের সুষম বণ্টনই তো কাম্য।
তবে সুশাসন একটি কঠিন বিষয়। সেজন্যই হয়তো কোম্পানীগঞ্জে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার পদে মাত্র এক বছরে চারজন কর্মকর্তাকে দেখা গেছে। তারা কেউ ৬ দিন, কেউ ১৫ দিন, কেউ পাঁচ মাস এবং সবশেষ ইউএনওই ছিলেন সবচেয়ে বেশি দিন, প্রায় ৭ মাস।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে, বিশেষ করে তিন মাস ধরে, পাথর উত্তোলন চলতে থাকে। এতে প্রায় ৮০ শতাংশ পাথর উধাও হয়ে যায়। এলাকাটি অসংখ্য গর্ত ও বালুচরে পরিণত হয়। জীবন-জীবিকা বেশি নিশ্চিত হয়ে যাওয়ার পর শুরু হয় বদহজম। এরপর ট্রাকে ট্রাকে পলায়নপর পাথর ধরে ফেলা হয়। টুকরি ভরে ভরে সেগুলোকে আগের জায়গায় ফিরিয়ে দেওয়ার অভূতপূর্ব আয়োজনের ছবি-ভিডিও দেখে অনেকেই বিস্ময়বোধে বিহ্বল হন।
শুক্রবার ভোলাগঞ্জ সাদাপাথর এলাকা পরিদর্শন করেছেন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মোখলেছুর রহমান। তিনি বলেছেন, পর্যটনকেন্দ্রটিকে ২৪ ঘণ্টা সিসি ক্যামেরার আওতায় আনা হবে। কে জানে, এরপরও কাজ না হলে হয়তো পাথরগুলোকে ভবিষ্যতে দড়ি বেঁধে রাখা হতে পারে। কদিন আগে সিলেটের ডিসি হিসেবে যোগ দিয়েই ভেজালবিরোধী অভিযান চালিয়ে খ্যাতি অর্জন করা কর্মকর্তা সারওয়ার আলম বলেছেন, পাথর লুট হলে জীবন ঝালাফালা করে দেবেন। তার এ গর্জন বর্ষণে পরিণত হোক। আমরা আশা করতে পারি, ভেজালের ঐক্যের ময়লা দূর করে সাদাপাথরের ঔজ্জ্বল্য তিনি কিছুটা হলেও ফিরিয়ে আনতে সফল হবেন।
আদনান মনোয়ার হুসাইন: সহকারী বার্তা সম্পাদক, সমকাল
- বিষয় :
- পাথর উত্তোলন
- সাদা পাথর
