ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

দুর্যোগ

আমার দেখা আফগানিস্তান এবং ভূমিকম্পের ক্ষত

আমার দেখা আফগানিস্তান এবং ভূমিকম্পের ক্ষত
×

এফ এম আনোয়ার হোসেন

এফ এম আনোয়ার হোসেন

প্রকাশ: ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ০৬:১৭ | আপডেট: ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ০৬:১৮

আফগানিস্তানে ভূমিকম্পের খবর শুনে প্রথমেই ভেসে উঠল কিছু মুখ। ২০১৫-১৬ সালের স্মৃতিতে এখনও জ্বলজ্বল করছে কুনার জেলার খোশ কুনার গ্রামের সেই ছবি– সবুজ পাহাড়ের কোলে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা মাটির ঘরবাড়ি, সরল মানুষের হাসিমুখ আর প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য। সেই গ্রামগুলো এখন ধ্বংসস্তূপে পরিণত। গত ৩১ আগস্ট সংঘটিত ভূমিকম্পের এপিসেন্টার থেকে মাত্র আধা ঘণ্টার দূরত্বে অবস্থিত এই এলাকা।

আমার প্রাক্তন দু’জন সহকর্মী সাফিউল্লাহ ও মুশফিক এখন কাবুলে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থায় নেতৃস্থানীয় পদে। ভূমিকম্পের খবর শুনে ফোন দিয়েছিলাম। তারা ফোনে যে বর্ণনা দিয়েছেন এই বিপর্যয়ের, তার সামান্যই মিডিয়ায় এসেছে। বিশেষত মুশফিকের নিজের বাড়ি নানগারহার প্রদেশে। সেখানে তিনি দিনরাত এক করে ভূমিকম্প-পরবর্তী ধ্বংসলীলায় উদ্ধার ও সহায়তা কাজ করছেন। বললেন, শুক্রবার কুনারে যাবেন সরেজমিন পরিস্থিতি দেখতে।

আফগানিস্তানের গ্রামাঞ্চলে মানুষ সাধারণত সন্ধ্যার পরপরই ঘুমিয়ে পড়ে। গত ৩১ আগস্ট স্থানীয় সময় রাত ১১টা ৪৭ মিনিটে যখন ভূমিকম্প আঘাত হানে, পূর্ব আফগানিস্তানের পাহাড়ি গ্রামগুলো ততক্ষণে গভীর ঘুমে তলিয়ে ছিল। রিখটার স্কেলে ৬ মাত্রার কম্পন শুধু মাটিই কাঁপায়নি, বরং হাজারো জীবনকে ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছে ঘুমের মধ্যেই। যারা বেঁচে আছেন, তাদের জীবনও দুর্বিষহ। 
এবারের ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত প্রধান এলাকাগুলো, বিশেষত কুনারের নুরগাল, চাওকায়, ওয়াদির, শোমাশ, মাসুদ, আরিত, মাজার-ই-দারা এবং আন্দারলাচাক গ্রাম এমনিতেই পাহাড়ি ও দুর্গম এলাকা। স্বাভাবিক সময়েও পৌঁছতে অনেক সময় লাগে। অধিকাংশই মাটি ও পাথরের ঘরবাড়ি। এর ৯৫ শতাংশেরও বেশি স্থাপনা এখন ধ্বংসস্তূপ মাত্র। নিচে চাপা পড়ে আছে মানুষ। বৃহস্পতিবার পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা প্রায় দেড় হাজার; উদ্ধার তৎপরতা পুরোদমে চললে এই সংখ্যা নিঃসন্দেহে বাড়বে। কিছু মানুষের খোঁজ হয়তো কখনোই মিলবে না। 

উদ্ধারকারীরা ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়া মানুষদের খুঁজে বের করার জন্য লড়াই করছেন, কিন্তু পাহাড়ি পথের ভূমিধস, জঙ্গল এবং পরবর্তী কম্পনগুলো কাজকে আরও কঠিন করে তুলেছে; এমনকি হেলিকপ্টারও কিছু এলাকায় পৌঁছাতে পারছে না।

যারা বেঁচে থাকবেন, তারাও এই ভূমিকম্পের ক্ষতি শিগগির কাটিয়ে উঠতে পারবেন বলে মনে হয় না। যেমন কৃষিক্ষেত্রে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। নানগারহারের জালালাবাদ এলাকায় সাইট্রাস ফল এবং ধানের চাষাবাদ প্রভাবিত হয়েছে ফ্ল্যাশ ফ্লাডিং ও ভূমিধসের কারণে। এতে ফসলের জমি ধ্বংস হয়েছে। নিশ্চিতভাবেই আফগানিস্তানের নাজুক অর্থনীতি আগামী দিনগুলোতে আরও ভঙ্গুর ও দুর্বল হয়ে উঠবে। বস্তুত এবারের দুর্যোগ শুধু প্রাকৃতিক বিপর্যয় নয়; বরং আফগানিস্তানের দীর্ঘস্থায়ী সংকটের নতুন অধ্যায়।

আফগানিস্তানের ভৌগোলিক অবস্থানই দেশটিকে ভূমিকম্পের উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। দেশটি ভারতীয় এবং ইউরেশীয় টেকটোনিক প্লেটের সংঘর্ষস্থলে অবস্থিত। যার ফলে এখানে ঘন ঘন কম্পন ঘটে। ২০২৩ সালে হিরাত প্রদেশে ৬.৩ মাত্রার ভূমিকম্পে দুই হাজারের বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছিল। কিন্তু এবারেরটি এসেছে সাম্প্রতিক বন্যা ও ভূমিধসের পরে; মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে।
দুর্যোগের সবচেয়ে করুণ দিক হলো সাধারণ মানুষের কষ্ট। আফগানিস্তানে সেটা আরও দ্বিগুণ হয়ে আসার কথা। কারণ দেশটিতে বেশির ভাগ মানুষের জীবন ও জীবিকা এমনিতেই কঠিন। কেবল দুই বেলা দুই টুকরো রুটির জন্য মানুষ কীভাবে কষ্ট করে, আফগানিস্তানে থাকাকালে দেখেছি। শিশু ও নারীরা এ ধরনের দুর্যোগে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকে। আফগানিস্তানে শিশু ও নারীদের অবস্থা এমনিতেই নাজুক। ভূমিকম্পের পর তারা আরও প্রান্তিক হয়ে পড়বে। হাসপাতালগুলোতে আহতদের মধ্যে নারী ও শিশুর সংখ্যাই বেশি বলে মুশফিক আমাকে জানালেন। সৌভাগ্যবশত তাঁর পরিবারের কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। কিন্তু অনেকেই পুরো পরিবার হারিয়েছেন। তাদেরই একজন নুরগাল জেলার শ্রমিক মুহাম্মদ আজিজ পাঁচ সন্তানসহ পরিবারের ১০ জনকে হারিয়েছেন। 

এই মানবিক সংকট আফগানিস্তানের দীর্ঘকালীন দারিদ্র্য এবং যুদ্ধের ক্ষত গভীরতর করে তুলবে। মন্দের ভালো, রাজনৈতিক মতপার্থক্য সত্ত্বেও তালেবান সরকার সবাইকে নিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করছে। জাতিসংঘের মানবিক সংস্থা ইউএনওসিএইচএ বলেছে, অন্তত ১২ হাজার মানুষ প্রত্যক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত এবং তারা সাহায্য পাঠাচ্ছে। আইএফআরসি ও ডব্লিউএফপি ওষুধ, খাদ্য এবং আশ্রয় সরবরাহ করছে। আন্তর্জাতিক এনজিওগুলো মোবাইল স্বাস্থ্যসেবা, পানি সরবরাহ, শিশুবান্ধব স্পেস, আইওএমের সঙ্গে যৌথ মূল্যায়ন এবং সামগ্রী মজুত করে কাজ শুরু করেছে; দ্রুত সাড়া এবং পুনর্বাসনের ওপর জোর দিয়ে তারা ছয় মাসের সহায়তার উদ্যোগ নিয়েছে। ভারত ও তুরস্ক দুটি করে ফ্লাইটে সাহায্য পাঠিয়েছে; পাকিস্তান থেকে কয়েকটি ট্রাক এসেছে; তাজিকিস্তানও সাহায্য পাঠিয়েছে। 

সার্বিক তথ্য বিশ্লেষণ করে এটি বলা যায়, এই দুর্যোগ আফগানিস্তানের দুর্বল অবকাঠামোকে উন্মোচন করেছে। তালেবান সরকারের গভর্ন্যান্স সক্ষমতা সীমিত, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং আন্তর্জাতিক অস্বীকৃতি তাদের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাকে দুর্বল করছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বন্যা এবং ভূমিধস বেড়েছে, যা ভূমিকম্পের পর উদ্ধারকে জটিল করে। সরকারকে দুর্যোগ প্রতিরোধী অবকাঠামো গড়ে তোলার দিকে মনোযোগ দিতে হবে। 

ধ্বংসের মধ্যেও আশার আলো হচ্ছে, উদ্ধারকারীদের অক্লান্ত পরিশ্রম এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর দ্রুত সাহায্য দেওয়ার প্রচেষ্টা। কুনার প্রদেশের মিডিয়া উপস্থিতি, যেমন ২০০৮-এর মার্ভেল সিনেমা ‘আয়রন ম্যান’-এর শুরুর দৃশ্য প্রেক্ষাপট– এমনটি যদি হতো যে কোনো সুপারম্যান-সদৃশ ঘটনা ঘটে, ধ্বংসের পরিবর্তে কুনার ও নানগারহারের বিধ্বস্ত মানুষের কষ্ট লাঘব করবে, উদ্ধার করবে পাহাড়ের মাটিতে চাপা পড়ে থাকা মানুষদের। আমেরিকা কি এগিয়ে আসবে সত্যিকার মানবতার খাতিরে?

ভূমিকম্প অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের তুলনায় এতটাই ভয়ংকর যে, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় সর্বোচ্চ প্রস্তুতি দরকার। বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশে, যদি ঢাকার মতো শহরে এমন ভূমিকম্প হয়, তাহলে লাখ লাখ মানুষের প্রাণহানি এবং অবকাঠামোগত ধ্বংস হবে অকল্পনীয়। কারণ আমাদের অনেক ভবন ভূমিকম্প-প্রতিরোধী নয়। 
অন্তর্বর্তী সরকার যদিও অনেক সংস্কার এবং কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তবু আফগানিস্তানে কিছু ত্রাণ ও পুনর্বাসন সামগ্রী পাঠানো হবে একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ। বিশ্বকে এগিয়ে আসতে হবে। কারণ এই দুর্যোগ শুধু আফগানিস্তানের নয়; বরং মানবতার।

এফ এম আনোয়ার হোসেন: উন্নয়নকর্মী ও লেখক 
[email protected]
 

আরও পড়ুন

×