ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

সমকালীন প্রসঙ্গ

মব সন্ত্রাস: অশনিসংকেত

মব সন্ত্রাস: অশনিসংকেত
×

মো. আসাদুজ্জামান

প্রকাশ: ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ২০:৩০ | আপডেট: ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ২১:০৮

জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে যে ‘মব সন্ত্রাস’ মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে, তা সাধারণ আইনশৃঙ্খলার অবনতির চেয়েও বেশি কিছু। এটি একটি সামাজিক ব্যাধি, যা বিচারহীনতার দীর্ঘদিনের সংস্কৃতি থেকে পুষ্টি লাভ করে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার প্রতি জনগণের চূড়ান্ত অনাস্থার প্রকাশ ঘটাচ্ছে। মব সন্ত্রাস উত্থানের পেছনে একাধিক মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক কারণ বিদ্যমান। বছরের পর বছর ধরে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় অপরাধীদের পার পেয়ে যাওয়া এবং বিচার ব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতা সাধারণ মানুষের মনে এই বিশ্বাস জন্ম দিয়েছে যে প্রচলিত ব্যবস্থায় ন্যায়বিচার অসম্ভব। এই আস্থাহীনতাই তাদের আইন নিজের হাতে তুলে নিতে প্ররোচিত করছে। পূর্ববর্তী সরকারের বিরুদ্ধে পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ও হতাশা অভ্যুত্থানের পর এক ধরনের সামাজিক বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে। চুরি, ছিনতাই বা অন্য কোনো অপরাধের ঘটনায় জনগণের এই পুঞ্জীভূত ক্ষোভ সন্দেহভাজন ব্যক্তির ওপর হিংস্রভাবে আছড়ে পড়ছে, যা প্রায়ই গুজব বা সামান্য সন্দেহের ভিত্তিতে ঘটে। কিছু ক্ষেত্রে মব রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার প্রবণতাও লক্ষ্য করা যাচ্ছে। 

মব সন্ত্রাসের সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো, এটি সমাজে এক ধরনের ‘চিলিং ইফেক্ট’ বা ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি করে। যখন রাষ্ট্র তার নাগরিককে নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয় এবং উচ্ছৃঙ্খল জনতা নিজেদের আইন প্রয়োগ করতে শুরু করে, তখন সাধারণ মানুষ কথা বলতে, মত প্রকাশ করতে বা এমনকি ভিন্ন হতেও ভয় পায়। যে কোনো সময় গুজব বা সন্দেহের বশে উন্মত্ত জনতার শিকারে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা বাকস্বাধীনতা এবং চিন্তার স্বাধীনতার ওপর এক অদৃশ্য সেন্সরশিপ আরোপ করে। এটি সংবিধান প্রদত্ত মৌলিক অধিকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। এই ভয়ের পরিবেশ একটি গণতান্ত্রিক সমাজের বিকাশের পথে সবচেয়ে বড় বাধা, কারণ গণতন্ত্রের প্রাণ হলো মুক্ত আলোচনা, সমালোচনা এবং ভিন্নমত প্রকাশের স্বাধীনতা।

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান প্রতিটি নাগরিককে কিছু অলঙ্ঘনীয় মৌলিক অধিকার প্রদান করেছে, যা যে কোনো ধরনের বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বা শাস্তিকে সরাসরি বাতিল করে দেয়। অনুচ্ছেদ ২৭ অনুযায়ী সব নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী। অনুচ্ছেদ ৩১ অনুযায়ী আইনের আশ্রয়লাভ প্রত্যেক নাগরিকের অধিকার এবং আইনানুযায়ী ছাড়া কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে এমন কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে না, যাতে তার জীবন, স্বাধীনতা, দেহ, সুনাম বা সম্পত্তির হানি ঘটে। অনুচ্ছেদ ৩২ অনুযায়ী ব্যতীত জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতা থেকে কোনো ব্যক্তিকে বঞ্চিত করা যাবে না।    

গণপিটুনির প্রতিটি উপাদান দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর অধীনে কঠোর শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত। ধারা ১৪১ অনুযায়ী পাঁচ বা ততোধিক ব্যক্তির সমাবেশ, যার সাধারণ উদ্দেশ্য কোনো অপরাধ সংঘটন করা, তা একটি ‘বেআইনি সমাবেশ’ বলে গণ্য হবে। একটি উন্মত্ত জনতা, যা কাউকে শাস্তি দেওয়ার জন্য একত্র হয়, তা এই সংজ্ঞার অন্তর্ভুক্ত। ধারা ১৪৬ অনুযায়ী যখন কোনো বেআইনি সমাবেশ কর্তৃক বা তার কোনো সদস্য দ্বারা বল বা সহিংসতা প্রয়োগ করা হয়, তখন ওই সমাবেশের প্রত্যেক সদস্য ‘দাঙ্গা’ করার অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হবেন। ধারা ৩০২ ধারা ৩০৪ অনুযায়ী গণপিটুনির সবচেয়ে গুরুতর আইনি দিকটি হলো সম্মিলিত দায়বদ্ধতার নীতি। দণ্ডবিধির ধারা ৩৪ এবং ধারা ১৪৯ অনুযায়ী, যখন কোনো বেআইনি সমাবেশের সদস্যরা একটি সাধারণ উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য কোনো অপরাধ করে, তখন সেই সমাবেশের প্রত্যেক সদস্য– তিনি নিজে আঘাত করুন বা না করুন– সেই অপরাধের জন্য সমানভাবে দায়ী হবেন। এর অর্থ, যে জনতা একজনকে পিটিয়ে হত্যা করে, সেই জনতার প্রত্যেক সদস্যই হত্যার দায়ে অভিযুক্ত হতে পারেন। এই আইনি বিধান জনতার ভিড়ে দায়মুক্তির ধারণাকে সম্পূর্ণরূপে বাতিল করে দেয়। আইন শুধু অপরাধের সংজ্ঞা দিয়েই ক্ষান্ত হয়নি, এটি প্রতিরোধে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ওপর সুস্পষ্ট দায়িত্বও অর্পণ করেছে।

ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮ ধারা ১২৭ ও ১২৮ অনুযায়ী যে কোনো নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট বা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে কোনো বেআইনি সমাবেশকে ছত্রভঙ্গ হওয়ার আদেশ দেওয়ার এবং প্রয়োজনে ছত্রভঙ্গ করার জন্য শক্তি প্রয়োগের ক্ষমতা ও দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। সুতরাং গণপিটুনির সময় পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা শুধু নৈতিক স্খলন নয়, এটি একটি আইনগত কর্তব্যে অবহেলা। এই আইনি বিশ্লেষণ থেকে এটি পরিষ্কার যে বাংলাদেশে গণপিটুনি মোকাবিলার জন্য আইনের কোনো ঘাটতি নেই। বরং যা অনুপস্থিত, তা হলো আইনের কঠোর প্রয়োগ। 

মব সন্ত্রাসের এই করাল গ্রাস থেকে বাংলাদেশকে মুক্ত করতে হলে শুধু দমন-পীড়নমূলক ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়। এর জন্য প্রয়োজন একটি সমন্বিত, বহুস্তরীয় এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, যার মূলে থাকবে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও সামাজিক জাগরণ। গণপিটুনির প্রতিটি ঘটনায় জড়িতদের দ্রুততম সময়ের মধ্যে গ্রেপ্তার করে দণ্ডবিধির সংশ্লিষ্ট ধারায় (বিশেষ করে, ধারা ৩০২/১৪৯) বিচার করতে হবে। যেসব পুলিশ কর্মকর্তা বা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যের উপস্থিতিতে গণপিটুনির ঘটনা ঘটবে বা যারা এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে ইচ্ছাকৃত নিষ্ক্রিয়তা দেখাবেন, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর বিভাগীয় এবং ফৌজদারি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। একটি স্বাধীন, নিরপেক্ষ এবং জবাবদিহিমূলক পুলিশ বাহিনী প্রতিষ্ঠা করা অপরিহার্য। নিয়োগ, পদোন্নতি এবং প্রশিক্ষণের প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণভাবে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করতে হবে। বিচার বিভাগকে শক্তিশালী করতে হবে, যাতে মামলাজট কমে এবং মানুষ দ্রুত ন্যায়বিচার পায়।  দেশের সব রাজনৈতিক দল, বিশেষ করে জুলাই অভ্যুত্থানের নেতৃত্বদানকারী ছাত্রসমাজকে দ্ব্যর্থহীনভাবে মব সন্ত্রাসকে নিন্দা জানাতে হবে। সংবাদমাধ্যম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ-মন্দিরসহ সব সামাজিক প্ল্যাটফর্ম থেকে গণপিটুনির বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। মানুষকে বোঝাতে হবে যে ‘মব জাস্টিস’ কোনো বিচার নয়, এটি একটি সামাজিক অপরাধ এবং এর ফলে একজন নিরীহ মানুষও প্রাণ হারাতে পারে। 

জুলাই অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়েছিল আইনের শাসন, ন্যায়বিচার এবং মানবিক মর্যাদাপূর্ণ একটি সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য। মব সন্ত্রাসের বর্তমান উত্থান সেই স্বপ্নের প্রতি এক নির্মম পরিহাস। এই পরিস্থিতি শুধু আইনশৃঙ্খলার অবনতি নয়, এটি রাষ্ট্রের ভিত্তিমূলের প্রতি এক চ্যালেঞ্জ। এ সংকট পরাস্ত করা শুধু আইন প্রয়োগের বিষয় নয়; এটি অভ্যুত্থানের আত্মাকে রক্ষা করার এবং বাংলাদেশের জন্য একটি সভ্য ও নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার এক নৈতিক ও রাজনৈতিক অগ্নিপরীক্ষা। এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার ওপরই নির্ভর করছে আমাদের জাতীয় অস্তিত্বের ভবিষ্যৎ।

মো. আসাদুজ্জামান: সহকারী অধ্যাপক, আইন ডিসিপ্লিন, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]
 

আরও পড়ুন

×