ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

ইসলাম ও সমাজ

সম্পদ উপার্জনে মধ্যম পন্থা

সম্পদ উপার্জনে মধ্যম পন্থা
×

.

আবু রুফাইদাহ রফিক

প্রকাশ: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ০৬:০১

সম্পদ উপার্জনে পরিমিতিবোধ ইমানদারের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। প্রকৃত ইমানদার জীবন ধারণের তাগিদে হালাল পন্থায় উপার্জন করবে। কিন্তু সে অন্তরে সম্পদের লোভ লালন করবে না এবং সম্পদের আধিক্য তাঁর স্বস্তির কারণ হয় না। অপ্রয়োজনীয় সম্পদ উপার্জনে সময় ব্যয় না করে সে স্বল্প সম্পদে তুষ্ট থেকে আল্লাহর ইবাদতে সময় ব্যয় করে। সে জানে, অধিক সম্পদ উপার্জন যেমন আল্লাহর স্মরণ ও ইবাদত থেকে গাফেল থাকার কারণ হয়, তেমনি প্রয়োজনের অতিরিক্ত সম্পদ জমা করা ফিতনায় পতিত হয়। অধিক সম্পদ উপার্জন ও জমা মানুষের ব্যস্ততা এবং দুশ্চিন্তা বাড়িয়ে দেয়। ফলে সে আল্লাহ ও আখিরাতকে ভুলে যেতে থাকে। এটা শুধু আখিরাতের দিক থেকেই ক্ষতিকর নয়, বরং মানুষের বিপদ-আপদ ও অনিরাপত্তাও বাড়িয়ে দেয়। এ জন্য ইসলাম মানুষের কল্যাণার্থে অধিক সম্পদ উপার্জন ও ব্যয় করাকে নিরুৎসাহিত করে এবং দুনিয়ার জীবনকে মুসাফির অবস্থা হিসেবে গ্রহণ করতে বলে। হাদিসে বলা হয়েছে– দুনিয়ায় প্রবাসী কিংবা পথিকের মতো অবস্থান করো। (বুখারি) 

সাহাবি ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন, রাসুল (সা.) এর চাটাইয়ের ওপর ঘুমানোর ফলে তাঁর পিঠে দাগ পড়ে যায়। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসুল, আমরা যদি আপনাকে একটি নরম বিছানা তৈরি করে দিতাম। তখন রাসুল (সা.) বললেন, ‘আমার সঙ্গে দুনিয়ার সম্পর্ক কী? দুনিয়ায় আমি তো সেই আরোহীর মতো, যে পথিমধ্যে গাছের ছায়ায় বিশ্রাম নেয়, অতঃপর কিছুক্ষণ আরাম করার পর আবার গন্তব্যে রওনা করে।’ (তিরমিজি) 

স্বল্প সম্পদ কিয়ামতের হিসাব হালকা করে দেবে। যেমন আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘দরিদ্ররা জান্নাতে প্রবেশ করবে ধনীদের তুলনায় অর্ধেক দিন আগে, যা পাঁচশত বছরের সমান হবে।’ (তিরমিজি, হাদিস: ২৩৫২) অর্থাৎ যাদের সম্পদ কম, তাদের জবাবদিহিও তুলনামূলক সহজ হবে।
স্বল্প সম্পদ অন্তরে পরিতৃপ্তি আনে, হৃদয়ে প্রশান্তি জাগায় এবং অনেক গুনাহ থেকেও বাঁচিয়ে রাখে।

রাসুল (সা.) বলেন, ‘ধনসম্পদে সমৃদ্ধ হওয়া মানেই প্রকৃত ধনী নয়; বরং প্রকৃত ধনী সে-ই, যার অন্তরে পরিতৃপ্তি আছে।’ (বুখারি: ৬৪৪৬; মুসলিম: ১০৫১)
অল্প সম্পদ মানুষকে লোভ থেকে দূরে রাখে; সন্তুষ্ট থাকতে শেখায়; দুনিয়ার দায়িত্ব কম থাকে। পক্ষান্তরে অধিক সম্পদ থাকলে মানুষের ওপর আত্মীয়-স্বজন, সমাজ ও রাষ্ট্রের নানা রকম দায়ভার এসে পড়ে। কিন্তু স্বল্প সম্পদ মানুষকে এ ঝামেলা থেকে মুক্ত রাখে। এ জন্যই নবী করিম (সা.) দোয়া করেছেন, ‘হে আল্লাহ! মুহাম্মদের পরিবারকে শুধু প্রয়োজনীয় আহারই দিন।’ (বুখারি: ৬৪৬০; মুসলিম: ১০৫৫)
অর্থাৎ শুধু জীবনধারণের জন্য যথেষ্ট রিজিকই সর্বোত্তম। অধিক সম্পদ মানুষকে ভুল পথে নিয়ে যেতে পারে। এটা পরকালের হিসাব কঠিন করে দেয়।

রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘ধনী ব্যক্তিদের জন্য হিসাব অনেক দীর্ঘ হবে।’ (বুখারি ও মুসলিম) কারণ প্রতিটি টাকার হিসাব কীভাবে আয় হলো এবং কোথায় খরচ হলো, তা জিজ্ঞাসা করা হবে। তা ছাড়া অধিক সম্পদ মনে অহংকার ও অবহেলার জন্ম দেয়।

কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই মানুষ সীমা লঙ্ঘন করে, যখন সে নিজেকে অমুখাপেক্ষী মনে করে।’ (সুরা আল-আলাক: ৬-৭)
ইসলাম দারিদ্র্য কামনা করতে বলে না; আবার ধনসম্পদের পেছনে অন্ধভাবে ছুটতেও নিষেধ করেছে। আসল শিক্ষা হলো– পরিমিত জীবনযাপন, আল্লাহর দেওয়া রিজিকের জন্য কৃতজ্ঞ থাকা এবং বৈধ পথে উপার্জিত সম্পদ আল্লাহর পথে ব্যয় করা। স্বল্প সম্পদে সন্তুষ্ট থাকা অনেক সময় মানুষের ইমান রক্ষার জন্য কল্যাণকর। অধিক সম্পদ সঠিকভাবে ব্যবহার না করলে আখিরাতে শাস্তির কারণ হতে পারে।

আবু রুফাইদাহ রফিক: সহকারী অধ্যাপক, আরবি, জয়নারায়ণপুর ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসা, বেগমগঞ্জ, নোয়াখালী

আরও পড়ুন

×