দুর্গাপূজায় নিরাপত্তা
রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ ও জনসচেতনতা জরুরি
.
সম্পাদকীয়
প্রকাশ: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ০৬:০০ | আপডেট: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫ | ১১:৪০
মহালয়া উদযাপনের মধ্য দিয়া রবিবার ভোর হইতে শুরু হইয়াছে শারদীয় দুর্গোৎসবের ক্ষণ গণনা। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস, মহালয়ার দিনে কৈলাস হইতে দেবী দুর্গা পিতৃগৃহে আগমন করেন; সূচনা হয় দেবীপক্ষের। রীতি মান্য করিয়া রবিবারও রাজধানীসহ সমগ্র দেশের মণ্ডপে মণ্ডপে নানা অনুষ্ঠান হইয়াছে। ২ অক্টোবর বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়া সমাপ্ত হইবে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের সর্ববৃহৎ এই ধর্মীয় উৎসব। অন্যান্য বৎসরের ন্যায় এইবারও দুর্গাপূজা নির্বিঘ্নে অনুষ্ঠিত হইবে– ইহাই প্রত্যাশা। দুর্ভাগ্যবশত সাম্প্রতিক কয়েক দশকে অনেকবারই এই প্রত্যাশা আহত হইয়াছে। উদাহরণস্বরূপ দুর্গাপূজার পূর্বে গোপনে বা প্রকাশ্যে মূর্তি ভাঙা যেন প্রায় নিয়মিত ঘটনায় পরিণত। যেই কোনো অজুহাতে মণ্ডপে ঢুকিয়া পূজারী বা দর্শনার্থীদের হেনস্তা করিবার ঘটনাও দেখা যায়। এই কারণে সাম্প্রতিক বৎসরগুলিতে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার ঘেরাটোপে পূজা-অর্চনা প্রায় নিয়মে পরিণত হইয়াছে। দূর অতীতে যাইতে হইবে না; ২০২১ সালে কুমিল্লায় নিরাপত্তা ব্যবস্থার ফাঁক গলাইয়া দুর্গাপূজা মণ্ডপে অন্য ধর্মের ধর্মগ্রন্থ রাখিয়া প্রায় সমগ্র দেশে কী ভয়ংকর ঘটনাবলি ঘটানো হইয়াছিল, তাহা স্মরণ করিলেই চলিবে।
প্রসঙ্গত, আসন্ন দুর্গাপূজা উপলক্ষে দেশের পাঁচটি জেলাকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ও ২৪টি জেলাকে মাঝারি ঝুঁকিপূর্ণরূপে চিহ্নিত করিয়া সতর্কবার্তা জারি করিয়াছে ‘সম্প্রীতি যাত্রা’ নামে একটি সামাজিক উদ্যোগ। আমরা উদ্যোগটির এই বক্তব্যের সহিত একমত– ধর্মীয় স্বাধীনতা উপভোগ করা দেশের প্রত্যেক নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার। একই সঙ্গে ধর্মীয়, জাতিগত, ভাষিক ও সংস্কৃতিগত প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা নিশ্চিতকরণ রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। যদি আগাম প্রস্তুতি, কার্যকর আইন প্রয়োগ, জবাবদিহিমূলক প্রশাসনিক ব্যবস্থা এবং স্থানীয় সমাজের অংশগ্রহণ একত্র করা যায়, তবে কেবল দুর্গাপূজা মণ্ডপ কিংবা মন্দির নহে; মাজার, আখড়া এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব।
এই বৎসর রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ ও জনসচেতনতা আরও জরুরি বলিয়া আমরা মনে করি। কারণ মূল উৎসব যতই আগাইয়া আসিতেছে ততই হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে তো বটেই, সচেতন মহলেও এইবারের দুর্গাপূজা লইয়া নানা শঙ্কা লক্ষ্য করা যাইতেছে। শুক্রবার রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবে বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু মহাজোট আয়োজিত ‘আসন্ন দুর্গাপূজায় নিরাপত্তা ও হিন্দু সম্প্রদায়ের ভাবনা’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় বক্তারা যেই সকল উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা প্রকাশ করিয়াছেন, সেইগুলিই যথেষ্ট পরিস্থিতির গভীরতা উপলব্ধি করিতে। বক্তাদের অভিযোগ, হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ, তাহাদের বাসাবাড়ি, ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় স্থানে অতীতে যতবার হামলা হইয়াছে, অদ্যাবধি কোনোটারই বিচারকার্য সম্পন্ন হয় নাই। উপরন্তু গত বৎসর ৫ আগস্টের পর যত সাম্প্রদায়িক সহিংসতা সংঘটিত হইয়াছে, সেইগুলি অনেকাংশে সরকারের পক্ষ হইতে স্বীকৃতই হয় নাই। এহেন পরিস্থিতিতে গত কয়েক দিনে কুষ্টিয়া, গাজীপুরসহ কয়েকটি জায়গায় প্রতিমা ভাঙচুরের যেই খবর প্রকাশিত হইয়াছে, তাহাতে বিস্মিত হইবার কোনো কারণই থাকে না।
অনস্বীকার্য, সমগ্র দেশে গতবার ৩১ সহস্র ৪৬১টি মণ্ডপ ও মন্দিরে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হইয়াছিল। এইবার সংখ্যাটি ৩৩ সহস্র ৩৫৫, যথায় রাষ্ট্রীয় প্রণোদনা ও নিরাপত্তার আশ্বাস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখিয়াছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাগণ পূজামণ্ডপে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের কথা বলিয়াছেন। কিন্তু সম্প্রতি বিশেষত মব সহিংসতা দমনে এই সংস্থাগুলির ব্যর্থতা বিভিন্ন প্রশ্নের জন্ম দিয়াছে। তবে ইহাও সত্য, রাষ্ট্রের নীতি ও নিরাপত্তা-সংক্রান্ত কার্যক্রমের সহিত উৎসবমুখর ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হইবার গুরুত্ব সম্পর্কে জনসচেতনতা যুক্ত থাকিলে পরিস্থিতির উন্নতি হইতে বাধ্য।
- বিষয় :
- সম্পাদকীয়
- দুর্গাপূজা
- নিরাপত্তা
- জনসচেতনতা
