দিবস
সবার আগে প্রবীণ– এ বোধ জাগ্রত হোক
ফাইল ছবি
মো. আমিনুল ইসলাম
প্রকাশ: ০১ অক্টোবর ২০২৫ | ২০:১৪
বাংলাদেশের সমাজে একটি দীর্ঘমেয়াদি অথচ পরিচিত সমস্যা হলো প্রবীণ সমস্যা। প্রবীণ বা বার্ধক্য একটি জটিল ও বহুমাত্রিক সামাজিক সমস্যা যা ব্যক্তিজীবন, পরিবার, গ্রাম, শহর, উন্নত, উন্নয়নশীল ও অনুন্নত সব অঞ্চলে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। বাংলাদেশকে উন্নয়নশীল হতে উন্নত রাষ্ট্রে রূপান্তরিত করার লক্ষ্যে প্রবীণ জনগোষ্ঠীকে কাজে লাগানো ও তাদের কল্যাণ নিশ্চিত করা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সত্যিকার অর্থে একটি জাতির উন্নয়নের প্রকৃত মাপকাঠি শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে নয় বরং তা নির্ধারিত হয় সমাজের সবচেয়ে দুর্বল ও অবহেলিত জনগোষ্ঠীর প্রতি তার দায়িত্ববোধ থেকে।
মাত্র চার দশক আগেও একান্নবর্তী পরিবারের ছায়ায় প্রবীণরা ছিলেন সম্মানিত ও নির্ভরতার প্রতীক। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় সমাজে একক পরিবার ব্যবস্থায় প্রবীণরা হয়ে উঠেছেন পরিবারের বোঝাস্বরূপ। সন্তানরা তাদের ভরণপোষণে অনাগ্রহ দেখাচ্ছে আর সমাজের ভেতরে প্রবীণদের মর্যাদা প্রায় বিলুপ্তির পথে। চারদিকে তাকালেই আমরা দেখতে পাই হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইন, ব্যাংকে হয়রানি, গণপরিবহনে অপমান, রাস্তা-ঘাটেও নানা বঞ্চনা ইত্যাদি। বিশেষ করে শারীরিকভাবে দুর্বল ও আয়বিহীন এই জনগোষ্ঠী প্রতিনিয়ত চিকিৎসা, বাসস্থান, সামাজিক সম্মান ও ন্যূনতম মানবিক সেবার অভাবে ভুগছেন। পত্রিকার পাতায় এখনও পড়তে হয় শিক্ষিত সন্তান মাকে রাখছেন বৃদ্ধাশ্রমে অথবা নিজের সন্তান মাকে ফেলে এসেছেন দূরের কোন জঙ্গলে। অন্যদিকে, সরকারি নিবাসে মাত্র ৩০০ জন প্রবীণের জায়গা বরাদ্দ রেখেছে অথচ দেশে ৬৫ ঊর্ধ্ব প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা প্রায় ১.৩ কোটি। যা প্রবীণদের প্রতি প্রহসন ব্যতীত আর কিছুই নয়!
২০১৩ সালে জাতীয় প্রবীণ নীতিমালায় প্রবীণদের মর্যাদা ও অধিকার নিশ্চিত করা, দারিদ্র্য বিমোচন ও কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক নিরাপত্তা, প্রতিষ্ঠানিক সেবা ও আবাসন সুবিধা, পরিবহন ও অন্যান্য সুবিধা, আইনি সহায়তা ও পরিচয়পত্র প্রদানের মতো বিষয় উল্লেখ থাকলেও তা চোখে পড়ার মতো বাস্তবায়ন এখনও দেখা যায়নি। সরকারের উদ্যোগগুলো অপ্রতুল, সমস্যাগ্রস্ত ও টপডাউন দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিচালিত; দ্বিতীয়ত, এসব কর্মসূচি বাস্তবায়িত হচ্ছে কিনা তার যথাযথ মনিটরিং ও মূল্যায়ন নেই; তৃতীয়ত, প্রশাসনিক জটিলতা ও ক্ষমতাসীন দলের দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করছে। চতুর্থত, প্রবীণরা নিজের সমস্যাগুলো প্রকাশ্যে বলতে দ্বিধাবোধ করেন। পঞ্চমত, প্রবীণবিষয়ক গবেষণার পরিমাণও অত্যন্ত কম। এ ছাড়া নানা ধরনের সমস্যার কারণে সরকারের উদ্যোগগুলো অনেক প্রবীণের দোরগোড়ায় সঠিকভাবে পৌঁছায় না।
আবার অনেক সময় দুর্নীতি, পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়নের অভাবের কারণে বহু প্রবীণ বঞ্চিত হন। টেকসই সমাজ বিনির্মাণে ও বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রাকে ত্বরান্বিত করতে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগানো এবং ভারসাম্যপূর্ণ সমাজ গঠনে এই জনগোষ্ঠীকে উন্নয়ন পরিকল্পনায় সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন। তাদের দক্ষতাকে কাজে লাগাতে হবে– তবেই সমাজ এগিয়ে যাবে, রাষ্ট্র এগিয়ে যাবে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে প্রবীণ জনগোষ্ঠী এখন সেই অবহেলিত শ্রেণি, যাদের অধিকাংশই পারিবারিক ভাঙনের পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বলয়ের বাইরে অবস্থান করে থাকেন। এদের কল্যাণে কিছু উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা কতটুকু বাস্তবায়নযোগ্য ও ফলপ্রসূ হয় সে প্রশ্ন আজ বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। আশা ও হতাশার দোলাচলে দিন পার করছেন দেশের কোটি প্রবীণ নাগরিক।
রাষ্ট্র প্রবীণদের জন্য বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা ইত্যাদি চালু করলেও তা সর্বজনীন নয়। অন্যদিকে ‘সিনিয়র সিটিজেন’ ঘোষণা করা হলেও রাষ্ট্র ব্যবস্থায় তার ন্যূনতম চিহ্ন নেই। অথচ অন্যান্য দেশের দিকে নজর দিলে আমাদের অবস্থান সহজেই অনুমান করতে পারি। নরওয়ে, সুইডেন, ডেনমার্কসহ অনেক দেশে ওয়েলফেয়ার স্টেট মডেল থাকার কারণে প্রবীণদের দায়িত্ব সরকার নিজে গ্রহণ করে। জার্মানিতে বাধ্যতামূলক সামাজিক পেনশন, ফ্রান্সে রাষ্ট্রীয় পেনশন ও আবাসিক সুবিধা, জাপানে দীর্ঘমেয়াদি কেয়ার ইন্স্যুরেন্স ব্যবস্থা রয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে রাষ্ট্রীয় পেনশন এবং জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা চালু থাকায় প্রবীণরা বার্ধক্য নিয়ে অতটা চিন্তিত নন। জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ১, ৩, ১০ ও ১৬ সবগুলো ধারাতেই প্রবীণদের অন্তর্ভুক্তি ও সুরক্ষার কথা বলা হয়েছে। বাংলাদেশে প্রবীণদের জরুরিভিত্তিতে সুরক্ষা নিশ্চিত করা অত্যাবশ্যক।
বাংলাদেশের মতো রাষ্ট্রের প্রবীণদের কল্যাণ নিশ্চিত করতে সরকারি উদ্যোগগুলো একদিকে যেমন প্রশংসার দাবিদার, অন্যদিকে এগুলোর যথাযথ পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়নের মাধ্যমে হতাশা দূর করতে সরকারকে আরও বদ্ধপরিকর হওয়া প্রয়োজন। ‘প্রবীণ ফাউন্ডেশন’ গঠন, সামাজিক সর্বজনীন পেনশন স্কিম, বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবা, প্রবীণদের জন্য আবাসন সুবিধা নিশ্চিতকরণের স্বার্থে প্রবীণদের পাশে আমাদের দাঁড়াতে হবে; তাদের প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে। রাষ্ট্র জাতীয় প্রবীণ নীতিমালার পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন, প্রবীণদের জন্য সুরক্ষা, সম্মান ও কার্যকর সেবা প্রদানের নিশ্চয়তা দিতে হবে। একই সঙ্গে আমাদের সামাজিক ও পারিবারিক মূল্যবোধে ‘সবার আগে প্রবীণ’ এই মানবিক বোধ জাগ্রত করতে ।
অধ্যাপক ড. মো. আমিনুল ইসলাম: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগে অধ্যাপনা করেন।
[email protected]
- বিষয় :
- প্রবীণ
