রাজনীতি
গণঅভ্যুত্থানজয়ীদের আত্মতুষ্টির অবকাশ নেই
খায়রুল কবীর খোকন
খায়রুল কবীর খোকন
প্রকাশ: ০৩ অক্টোবর ২০২৫ | ০৬:১৮ | আপডেট: ০৩ অক্টোবর ২০২৫ | ০৬:২০
| প্রিন্ট সংস্করণ
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপিকে দেড় দশক ধরে ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগ সরকার ও তাদের সহযোগীরা মিলে গণরায় নেওয়ার সুযোগই দেয়নি। দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলকে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বাইরে রেখে টানা ক্ষমতায় থেকেছে আওয়ামী লীগ। সেই সরকারকে সমর্থন দিয়েছে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সাম্প্রদায়িক রাজনীতির ধারক-বাহক চক্র। তাদের উদ্দেশ্য ছিল সুস্পষ্ট– বাংলাদেশ থেকে আধিপত্যবাদী ও নয়া উপনিবেশবাদী সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা আদায়।
টানা ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনে একদিকে যেমন নিষ্পেষিত হয়েছে বিএনপিসহ গণতান্ত্রিক সব রাজনৈতিক শক্তি, অন্যদিকে এই সময়ে প্রায় ২৮ লাখ কোটি টাকা পাচার হয়ে গেছে দেশ থেকে। আওয়ামী লীগ আমলে অর্থনীতিতে অনিয়ম ও দুর্নীতি তদন্তে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটি এই হিসাব দিয়েছে। দেশের ভেতরে আরও ৪০ লাখ কোটি টাকার দুর্নীতি হয়েছে বলে কোনো কোনো পরিসংখ্যানে দেখা গেছে। পাচার অর্থের ১০ শতাংশও ফেরত আনা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
গত দেড় দশকে বিএনপির লাখ লাখ নেতাকর্মীর ওপর বর্বরতার স্টিমরোলার চালিয়েছে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন স্বৈরাচারী সরকার। বিরোধী দল নির্যাতনের সরকারটি বেপরোয়া দানব হয়ে উঠেছিল। বিরোধী রাজনীতিকদের ওপর সারাদেশে গুম, খুন, লাখ লাখ মামলা, হামলা, অত্যাচার, নিপীড়নে সারাবিশ্বের জন্য নিকৃষ্ট নজির সৃষ্টি করেছিল আওয়ামী লীগ সরকার। দেশের ভেতর ও বাইরে প্রতিবাদ হয়েছে, কিন্তু তারা কোনো কিছুর তোয়াক্কা করেনি।
এমন দমন-পীড়নের মধ্যেও বিএনপি টানা আন্দোলন করে এসেছে রাজপথে। সেই অহিংস গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থী সমাজ নেমে আসে রাজপথে। তারা প্রথমে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও জুলাই মাসে রাজপথ রক্তের বন্যায় ভাসিয়ে দেয় আওয়ামী লীগ ও আওয়ামী লীগ সরকারের বিভিন্ন বাহিনী, ছাত্রলীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ। আন্দোলনের বিপক্ষে মাঠে নামে স্তাবক ও মোসাহেব বাহিনী। সরকারের জুলুম-নির্যাতন চরমে উঠলে ছাত্র-জনতা সরকার পতনের এক দফা আন্দোলনে নামতে বাধ্য হয়।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে বিএনপি কর্মীরা রাজপথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই চালিয়েছে। সরকারি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও বেসরকারি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর হামলার বিপক্ষে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন বিএনপি নেতাকর্মীরা। জুলাই-আগস্ট মাসে দানব বাহিনীর গুলিতে শহীদ হন হাজারের ওপরে। রাষ্ট্রীয় বাহিনী ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর হামলায় রাজপথে কমপক্ষে ১৩ হাজার গুরুতর আহত হন; তাদের অনেকেরই চোখ, হাত-পাসহ বিভিন্ন অঙ্গহানি ঘটে এবং পঙ্গুত্বের দিকে চলে যায়। এমনকি শিশু, নারী, কিশোর-কিশোরীও এসব বর্বর হামলা থেকে রেহাই পায়নি। শহীদ ও আহতদের মা-বাবা, ভাইবোন ও অন্য স্বজনদের আর্তচিৎকারে গোটা বাংলাদেশ এক কান্নার রাজ্যে পরিণত হয়েছিল। বিশ্বের কোথাও কোনো সরকার নিজ দেশের নাগরিকের ওপর এমন হামলা সাম্প্রতিক কয়েক দশকে করেনি। দেশবাসী স্তম্ভিত হয়ে যায় ফ্যাসিবাদী সরকারের এই নিষ্ঠুরতা দেখে।
রাজপথে রক্ত দেওয়া শিক্ষার্থী, বিএনপি কর্মী, অন্যান্য রাজনৈতিক কর্মীর সম্মিলিত প্রতিরোধে শেখ হাসিনা ক্ষমতা ছেড়ে দিয়ে দেশত্যাগ করতে বাধ্য হন। লড়াইরত জনতার সৌভাগ্য– বাংলাদেশ সেনাবাহিনী এ সময় জনগণের পাশে দাঁড়ায়। স্মরণ রাখা দরকার, আমাদের এই সামরিক বাহিনীর জন্ম হয়েছিল ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে জিয়াউর রহমানসহ অন্যান্য বীর মুক্তিযোদ্ধার হাত ধরে। তারা সেই ঐতিহ্যগত সম্মান ও মর্যাদা এবারও সমুন্নত রেখেছে। জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে দেশবাসী অভিবাদন জানিয়েছে। যেমন আরেকবার অভিবাদন জানিয়েছিল ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সিপাহি-জনতার বিপ্লবকালে। সেবারও দিশেহারা জাতিকে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য জিয়াউর রহমান দেশ পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন।
বাংলাদেশে জুলাই গণঅভ্যুত্থান বিশ্বব্যাপী ইতিহাস ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের মাইলফলক সৃষ্টি করেছে। নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূস গত এক বছর ধরে রাষ্ট্রকে সংস্কারের পথে নেওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। এখন সামনের ফেব্রুয়ারিতে হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে যে পরিবর্তন এসেছে, সেটার সুফল জনগণের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে হবে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে।
এই প্রেক্ষাপটে চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপির দায়িত্ব এখন সবচেয়ে বেশি। সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দল ও সর্বাপেক্ষা সুসংগঠিত সংগঠন হিসেবে দেশবাসী তাকিয়ে আছে বিএনপির দিকে। সবাই স্বীকার করছেন– আগামী নির্বাচনে বিএনপি জনগণের রায় নিয়ে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পথে। তবে আমাদের নেতা তারেক রহমান বারবার বলে যাচ্ছেন– স্বৈরাচার আওয়ামী লীগ পতনের আন্দোলনে সক্রিয় সব রাজনৈতিক দলকে সঙ্গে নিয়েই সরকার পরিচালনা করবে বিএনপি। গণঅভ্যুত্থানজয়ী সবার সমর্থন নিয়েই দেশে গণতন্ত্র ও সুশাসন কায়েম করবে বিএনপি।
এই পর্যায়ে এসে আত্মতুষ্টিতে ভোগার অবকাশ নেই। এখন বিএনপি কর্মীদের সতর্ক থাকতে হবে, যাতে জুলাই গণঅভ্যুত্থানকালে গণহত্যাকারী সবার বিচার হয়। কোনো স্বৈরাচার যেন কখনও গণতন্ত্র হত্যার ষড়যন্ত্র সফল করতে না পারে। যারা ফ্যাসিবাদের পুনর্বাসনে আগ্রহী, তাদেরও প্রতিরোধ করতে হবে। তবে সেটা ‘মব সন্ত্রাস’ দিয়ে নয়, বরং আইনি ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। সে জন্য গণঅভ্যুত্থানের পরও ঘুমিয়ে যাওয়া চলবে না। কারণ ফ্যাসিবাদীদের মূলোৎপাটন করতে হলে গণহত্যাকারীদের বিচারের আওতায় আনার লড়াইটা আরও বড়। রাজপথে বিজয় এসেছে, কিন্তু রাজপথ ছাড়া যাবে না।
খায়রুল কবীর খোকন: বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব; সাবেক সংসদ সদস্য ও ডাকসুর সাবেক
সাধারণ সম্পাদক
- বিষয় :
- খায়রুল কবীর খোকন
