ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

প্রযুক্তি

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে মানবীয় দক্ষতা

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে মানবীয় দক্ষতা
×

কাজী হাসান রবিন

কাজী হাসান রবিন

প্রকাশ: ০৭ অক্টোবর ২০২৫ | ০৬:১৩ | আপডেট: ০৮ অক্টোবর ২০২৫ | ১৫:৫৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

একবিংশ শতাব্দীর দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্বে প্রযুক্তির ঢেউ আমাদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-এআই, স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা এবং রোবটিক্সের অবিরাম অগ্রযাত্রা মানবসমাজের চিরায়ত কর্মপদ্ধতিকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। মানুষের একচ্ছত্র অধিকারে থাকা একসময়ের অনেক কাজ এখন স্মার্ট মেশিন অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে সম্পন্ন করছে। উৎপাদন খাত থেকে শুরু করে ডেটা বিশ্লেষণ, এমনকি চিকিৎসা খাতের রোগ নির্ণয়ের মতো জটিল কাজও হচ্ছে ক্ষেত্রবিশেষে স্বয়ংক্রিয়ভাবে। এমন একটি বাস্তবতায় যখন চাকরির বাজারে মানুষের ভূমিকা সংকুচিত হচ্ছে; যন্ত্র মানুষের কাজ দখল করছে, তখন একটি প্রশ্ন অনিবার্যভাবে সামনে আসে, তবে মানুষের আলাদা মূল্য কোথায়?

এর উত্তর মানুষের সহজাত বৈশিষ্ট্যের গভীরেই নিহিত– মানবীয় দক্ষতা বা সফট স্কিল। প্রযুক্তি যতই উন্নত হোক, তা কখনও সহমর্মিতা, মানবিক যোগাযোগ, সৃজনশীল সমস্যা সমাধান বা একটি দলকে সফলভাবে পরিচালনার মতো কাজ পুরোপুরি রপ্ত করতে পারবে না। একটি অ্যালগরিদম হয়তো সবচেয়ে কার্যকরী ডেটা বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নিতে পারে, কিন্তু একজন সহকর্মীর মানসিক চাপ বুঝতে পেরে তাকে সাহস জোগানো বা একটি জটিল সামাজিক সমস্যা সমাধানে ভিন্ন ভিন্ন মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি একত্র করার মতো মানবিক স্পর্শ সে দিতে পারে না।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এ বিষয়টি আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা এখনও অনেকাংশে মুখস্থনির্ভর এবং পরীক্ষাকেন্দ্রিক, যা শিক্ষার্থীদের মধ্যে কেবল তাত্ত্বিক জ্ঞান অর্জনের প্রবণতা তৈরি করে। ফলে একজন শিক্ষার্থী উচ্চতর ডিগ্রি নিয়েও যখন কর্মজীবনে প্রবেশ করে, তখন তার সার্টিফিকেটের উজ্জ্বলতার আড়ালে প্রয়োজনীয় মানবিক দক্ষতার ঘাটতি ধরা পড়ে প্রকটভাবে। এই ঘাটতি শুধু করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর উৎপাদনশীলতাকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে না, বরং সমাজের সামগ্রিক ধৈর্য এবং সহনশীলতাকেও চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দেয়। এ প্রেক্ষাপটে সফট স্কিলকে নিছক একটি বাড়তি দক্ষতা হিসেবে না দেখে, বরং টিকে থাকার হাতিয়ার এবং সামাজিক ভারসাম্য রক্ষার অপরিহার্য উপাদান হিসেবে বিবেচনা করা জরুরি।

আমার ১২ বছরের অধিককালের কর্মজীবনে খুব কাছ থেকে দেখেছি কীভাবে প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও মানবিক দক্ষতার মধ্যে ভারসাম্যহীনতা কর্মপরিবেশে প্রভাব ফেলে।

অনেক করপোরেট প্রতিষ্ঠানে দেখেছি, কারিগরি জ্ঞানে অত্যন্ত দক্ষ কর্মীদের কোনো অভাব নেই। কিন্তু তাদের মধ্যে মানবিক দক্ষতা বা সফট স্কিলের ঘাটতির কারণে প্রজেক্টের সফলতা বারবার বাধাগ্রস্ত হয়।
বিশেষ করে দুর্বল অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ দলের মধ্যে এক ধরনের সমন্বয়হীনতা তৈরি করে। ভিন্ন ভিন্ন টিম বা প্রজেক্টের অংশ হিসেবে বহুবার এমনটা দেখেছি, একটি দল একটি নতুন প্রকল্প নিয়ে কাজ করছে, কিন্তু দলের এক অংশের সদস্যরা তাদের পরিকল্পনা বা কৌশল পরিবর্তনের কথা সময়মতো অন্যদের সঙ্গে ভাগ করে নিতে ব্যর্থ। এর ফলে অন্য অংশটি সেই পরিবর্তনের জন্য একেবারেই অপ্রস্তুত থেকেছে। এর পরিণতিতে পুরো কাজের ধারাকে পুনর্বিন্যাস করতে হয়েছে। যার ফলে শুধু মূল্যবান সময় আর অর্থই নষ্ট হয়নি; প্রতিষ্ঠানের কার্যক্ষমতা এবং সুনামের ওপরেও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার আলোকে বলতে পারি, শুধু যোগাযোগহীনতা নয়; দলগত কাজ করার মানসিকতার অভাবও বড় সমস্যা। বহু প্রতিভাবান কর্মী, যাদের ব্যক্তিগত নৈপুণ্য অসীম, তারাও কেবল একটি দলের অংশ হিসেবে নিজেদের মানিয়ে নিতে না পারার কারণে বড় কোনো প্রকল্পে কার্যকর অবদান রাখতে পারেননি।

একইভাবে আমি অনেক ম্যানেজার বা টিম লিডারকে চাপ সামলানোর অক্ষমতা, সিদ্ধান্তহীনতার কারণে নেতৃত্ব দিতে ব্যর্থ হতে দেখেছি। সংকটময় মুহূর্তে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে তাদের বিলম্ব, সহকর্মীদের প্রতি সহমর্মিতার পরিবর্তে বিদ্বেষমূলক মনোভাব এবং অন্যায় বা অযৌক্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ দলের মধ্যে এক ধরনের অস্থিরতা তৈরি করে। যার খেসারত নানাভাবে শেষ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানকেই দিতে হয়।
এটাও দেখেছি, যখন একটি দলে সুন্দর সমন্বয় থাকে, তখন সীমিত সম্পদ বা লজিস্টিকসের মতো বাধাও অনায়াসে পেরিয়ে যাওয়া সম্ভব। এখন আর শুধু কারিগরি দক্ষতা দিয়ে চাকরির বাজারে ভালো অবস্থানে থাকা যায় না। কর্মীর ব্যক্তিত্ব, তাঁর যোগাযোগ দক্ষতা, সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা এবং মানসিক চাপ সামলানোর দক্ষতা সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

বাংলাদেশের বৃহৎ তরুণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে সফট স্কিল সচেতনতা তৈরি করতে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ। শুধু ব্যক্তি উদ্যোগে পরিবর্তন সম্ভব নয়, বরং এটি সামগ্রিক উদ্যোগের অংশ হওয়া উচিত। এটি তিন স্তরে কার্যকর হতে পারে। 

প্রথমত, শিক্ষাক্ষেত্রে একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনা জরুরি।

ছোটবেলা থেকেই শিক্ষার্থীদের জীবনমুখী দক্ষতা শেখাতে হবে। সহশিক্ষা কার্যক্রম যেমন বিতর্ক প্রতিযোগিতা, নাটক, খেলাধুলা এবং স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজকে পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। শিক্ষকদেরও সফট স্কিল শেখানোর প্রশিক্ষণ দিতে হবে। কেবল লিখিত পরীক্ষার ফলাফলের ওপর নির্ভর না করে শিক্ষার্থীদের উপস্থাপনা, দলগত প্রজেক্ট এবং অন্যান্য সহশিক্ষা কার্যক্রমের মাধ্যমেও মূল্যায়ন করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, কর্মক্ষেত্রে পরিবর্তন আনতে হলে কর্মী নিয়োগের সময় থেকেই প্রতিষ্ঠানগুলোকে কৌশলগত পরিবর্তন আনতে হবে। চাকরির বিজ্ঞাপনে শুধু কারিগরি বা ‘হার্ড স্কিল’-এর চাহিদা উল্লেখ না করে, পাশাপাশি পদ অনুযায়ী যোগাযোগ, দলগত কাজ, সমস্যা সমাধান এবং নেতৃত্বদানের মতো গুরুত্বপূর্ণ সফট স্কিলের প্রয়োজনীয়তাও সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে।

এরপর কর্মী নির্বাচনের সময় কেবল প্রার্থীর একাডেমিক ফল বা পূর্ববর্তী কাজের অভিজ্ঞতাই নয়, বরং তার সফট স্কিল যাচাই করার জন্য বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। সাক্ষাৎকার, কেস স্টাডি বা দলগত আলোচনার মতো পদ্ধতির মাধ্যমে প্রার্থীর মানবিক দক্ষতাগুলো যাচাই করা যেতে পারে। এভাবে সঠিক প্রার্থী নিয়োগ নিশ্চিত করা সম্ভব হলে পরবর্তী সময়ে তাদের জন্য নিয়মিত ওয়ার্কশপ বা প্রশিক্ষণের মাধ্যমে পারস্পরিক যোগাযোগ এবং সহযোগিতার একটি শক্তিশালী কর্মসংস্কৃতি গড়ে তোলা সহজ হবে। সর্বোপরি কর্মীর বার্ষিক পারফরম্যান্স মূল্যায়নের সময় কারিগরি দক্ষতার পাশাপাশি তার সফট স্কিলের অগ্রগতিকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

তৃতীয়ত, সামাজিক ক্ষেত্রে সচেতনতা বৃদ্ধি করা দরকার। গণমাধ্যমে সফট স্কিলের গুরুত্ব নিয়ে ব্যাপক প্রচার প্রয়োজন। কমিউনিটি পর্যায়ে তরুণদের জন্য বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কর্মসূচির আয়োজন করা যেতে পারে। একই সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য করে মানসিক চাপ মোকাবিলার কৌশল শেখানোও সমাধানের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। একটি মানবিক এবং সহানুভূতিশীল সমাজ গঠনের জন্য প্রত্যেক মানুষের মধ্যে এ দক্ষতাগুলো থাকা অপরিহার্য।

প্রযুক্তি যতই উন্নত হোক না কেন, মানুষের মানবিক গুণাবলি যেমন সহানুভূতি, ধৈর্য, যোগাযোগ এবং সহযোগিতা– এর বিকল্প তৈরি করতে পারেনি। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সফট স্কিলের গুরুত্ব কেবল চাকরির বাজারে টিকে থাকার জন্য নয়, বরং একটি মানবিক, সহনশীল ও শান্তিপূর্ণ সমাজ গঠনের জন্যও অপরিহার্য।

আজকের তরুণ প্রজন্মের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা– শুধু ডিগ্রি বা কারিগরি দক্ষতা নিয়ে সন্তুষ্ট থাকলে চলবে না। তাদের সফট স্কিলকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। কারণ এটি শুধু চাকরি পাওয়ার পথই সুগম করে না, বরং কর্মসংস্কৃতি এবং সমাজের ওপর ইতিবাচক প্রভাব রাখার জন্যও অপরিহার্য। শিক্ষা ব্যবস্থা, করপোরেট প্রতিষ্ঠান, সমাজ– এই তিনটি ক্ষেত্র যদি একযোগে কাজ করে, তবেই বাংলাদেশ মানবিক, সহনশীল ও প্রযুক্তিনির্ভর দেশ হিসেবে গড়ে উঠবে, যেখানে যন্ত্র হবে মানুষের সহায়ক; বিকল্প নয়।

কাজী হাসান রবিন: রিজিওনাল অ্যাম্বাসাডর (সাউথ এশিয়া), অ্যালামনাই ইউকে 

আরও পড়ুন

×