ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

মানবাধিকার

অভিযুক্ত ব্যক্তিকে হাতকড়া পরানো আইনসম্মত?

অভিযুক্ত ব্যক্তিকে হাতকড়া পরানো আইনসম্মত?
×

শামসুল হুদা

শামসুল হুদা

প্রকাশ: ০৮ অক্টোবর ২০২৫ | ০৬:২২ | আপডেট: ০৮ অক্টোবর ২০২৫ | ১১:৫০

| প্রিন্ট সংস্করণ

সম্প্রতি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবিতে দেখা গিয়েছিল, সাবেক শিল্পমন্ত্রী নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ুন হাতকড়া পরা অবস্থায় হাসপাতালে শুয়ে আছেন। এ নিয়ে সংবাদমাধ্যমেও প্রতিবেদন প্রকাশ হয়। দৈনিক প্রথম আলোতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, ‘কেউ কেউ বলছেন, মৃত্যুর পরও তাঁর হাতে হাতকড়া পরানো ছিল’ (১ অক্টোবর ২০২৫)। 

সংবিধানের ৩৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ও কোনো অভিযুক্ত ব্যক্তির সঙ্গে এমনকি দণ্ডপ্রাপ্ত আসামির সঙ্গেও কোনো ধরনের নিষ্ঠুর, অমানবিক বা অমর্যাদাকর আচরণ না করার নির্দেশনা রয়েছে। যতদূর জানি, উচ্চতর আদালত থেকেও কয়েক বছর আগে বন্দিদের হাতকড়া, ডান্ডাবেড়ি পরানো ইত্যাদি নিয়ে বেশ কিছু পালনীয় সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। জাতিসংঘের মানবাধিকার সনদসহ বিভিন্ন ঘোষণা, কনভেনশনে একই ধরনের বিধান বহাল আছে, যার প্রায় সব কয়টিতে বাংলাদেশ অনুস্বাক্ষর করেছে। 

এ ছাড়া পুলিশ প্রবিধানের ৩৩০ ধারায়ও বলা আছে– বন্দিদের হাতকড়া পরানো বা দড়ির ব্যবহার প্রায় ক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয় ও অমর্যাদাকর। এতে আরও বলা রয়েছে, বয়স বা দুর্বলতার কারণে যাদের নিরাপত্তা রক্ষা করা সহজ ও নিরাপদ, তাদের ক্ষেত্রেও কড়াকড়ি করা উচিত হবে না। পুলিশ প্রবিধানে এই নির্দেশনা স্পষ্টভাবে দেওয়া সত্ত্বেও পুলিশ একজন মধ্য-সত্তরোর্ধ্ব অভিযুক্ত কারাবন্দিকে মুমূর্ষু ও চিকিৎসারত বেডেও হাতকড়া পরিয়ে রেখেছিল?

এত কিছুর পরও আমাদের পুলিশ প্রশাসন ওইসব বিধান, প্রবিধান লঙ্ঘন করে অহরহ অভিযুক্ত ব্যক্তিদের সঙ্গে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে নিষ্ঠুর, অমর্যাদাকর ও অমানবিক আচরণের অনেক দৃষ্টান্ত একের পর এক স্থাপন করে চলেছে।

যদিও পরে কারা কর্তৃপক্ষ নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ুন বিষয়ে সামাজিক মাধ্যম ও সংবাদমাধ্যমের তথ্য সঠিক নয় বলে দাবি করেছে; সেই দাবি সন্দেহাতীত নয়। কারণ সম্প্রতি আরও কিছু ক্ষেত্রে হাতকড়ার অতি উৎসাহী ব্যবহার বা অপব্যবহারের খবর ও আলোকচিত্র সংবাদমাধ্যমে এসেছে। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ ও জোটসঙ্গী রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদের ক্ষেত্রে তো ঘটেছেই; বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক বা সাংবাদিকরাও রেহাই পাচ্ছেন না। যেমন অধ্যাপক ও অর্থনীতিবিদ ড. আবুল বারকাতের আদালতে হাজিরা দেওয়ার সময় পেছনে দুই হাত এক করে হাতকড়া পরানোর ছবি দেখা গেছে। এটা ঠিক, তিনি সাবেক সরকারের আমলে জনতা ব্যাংকের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেছেন। সেই সময়ের ব্যাংক ঋণ দেওয়ার অনিয়ম বা খেলাপি ঋণ-সংক্রান্ত দুর্নীতি দমন কমিশনের অভিযোগে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। কিন্তু সেই অভিযোগ ও বিচার প্রক্রিয়ার সঙ্গে হাতকড়া পরানোর কী সম্পর্ক? 

এই প্রশ্নও জরুরি, রাজনীতিক ও নাগরিক সমাজের বয়স্ক সদস্যদের আদালতে আনা-নেওয়ার সময় পেছনে দুই হাত এক করে হাতকড়া পরিয়ে নিতে হবে কেন? তারা কি কোনো ভয়ংকর অপরাধী? হাতকড়া না থাকলে কি দৌড়ে পালিয়ে যেতে পারেন? অভিযুক্ত হলেই কাউকে অসম্মান করা যায়? এটা কি কোনো সভ্য সমাজের রীতি? 

বিগত স্বৈরশাসনামলে ভিন্ন মতাবলম্বী, সাংবাদিক, শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নাগরিকদের সঙ্গে সীমাহীন অমানবিক, অমর্যাদাকর আচরণের অনেক নজির আমরা প্রত্যক্ষ করেছি। আয়নাঘরের নিপীড়ন, হত্যা, টার্গেট কিলিং আমাদের নির্মম অভিজ্ঞতার ভান্ডার ও অনুভূতিতে রক্তক্ষরণের বেদনা জাগায়। শুধু তো ১০-১৫ বছর নয়; তার আগেও অনেক নিষ্ঠুর, অমানবিক ঘটনার দৃষ্টান্ত ছিল। আমরা ভুলিনি। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার তো ওই সকল অমানবিক, নিষ্ঠুর আচরণের অবসান ঘটিয়ে সব ধরনের বৈষম্য নির্মূল করা এবং মানবাধিকারকে মর্যাদা দেওয়ার অঙ্গীকারের ওপর দাঁড়িয়েই দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। তাদের আমলে তো এমন দৃশ্য চোখে পড়ার কথা ছিল না। এই সরকারের বেশ কয়েকজন উপদেষ্টা আছেন, যারা মানবাধিকার আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকেই তাদের সামাজিক অবস্থান তৈরি করেছেন। সাধারণ নাগরিকরা নিম্ন আদালত থেকে উচ্চ আদালত পর্যন্ত সব পর্যায়ে ন্যায়বিচার পাবে– এটি ভেবেই অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর আস্থা রেখেছিল। নিরাপদ জীবনযাপনের অধিকার পেতে চাওয়া কিংবা ন্যায্য মানবিক আচরণ পাওয়ার আশা করা কি কোনো অন্যায় চাওয়া? 

বিগত দেড় দশক ধরে আদালত অঙ্গনে কর্মরত আইনজীবীদের মধ্যে রাজনৈতিক বিভাজনের অনিবার্য ফল হিসেবে স্বাধীন বিচার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পথই যে নানাভাবে বাধাগ্রস্ত হয়েছে, তা নয়; আদালত অঙ্গনে অনাকাঙ্ক্ষিত অনেক ঘটনার দৃষ্টান্তও সৃষ্টি হয়েছে। অভিযুক্ত নাগরিকদের সঙ্গে পুলিশের অমানবিক আচরণ যে তারই অংশ, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। 

অন্তর্বর্তী সরকার তো শপথ নিয়েই সেই বাধাগুলো অপসারণের প্রতিজ্ঞা করেছিল। রাতারাতি তারা সব ওয়াদা পূরণ করতে পারবে– তেমন আশা কেউ করেনি। তবে স্বৈরশাসকদের রেখে যাওয়া দলীয় রাজনৈতিক প্রভাবের খারাপ দৃষ্টান্তগুলো তাদের একইভাবে অনুসরণ করতে হবে কোন যুক্তিতে? যেসব বয়স্ক, অসুস্থ ব্যক্তিকে অভিযুক্ত হিসেবে আদালতে আনা হয় কিংবা জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়; সামাজিক অবস্থান কিংবা রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে তাদের সঙ্গে কোনো অমানবিক, অমর্যাদাকর আচরণ করা হবে না– আমরা নাগরিক হিসেবে ন্যূনতম এই আশাটুকু কি করতে পারি না?   

ঠিক আগের বছরগুলোর মতোই ভুয়া ফেসবুক আইডি খুলে প্রান্তিক এবং বিশেষত ধর্মীয় সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর ওপর হামলা, তাদের বাড়িঘরে আগুন দিয়ে উচ্ছেদের চেষ্টা, লুটপাট তো মাঝেমধ্যেই চলছে। এখনও সেই পুরোনো স্বৈরনীতির পুনরাবৃত্তি। নজির তো মাত্র ক’দিন আগে রংপুরের গঙ্গাচড়ায় প্রত্যক্ষ করে এলাম। তার পরের ঘটনা তো গত ৩০ সেপ্টেম্বর খাগড়াছড়ির গুইমারার হত্যাকাণ্ড, যেখানে তিন পাহাড়ি আদিবাসী প্রাণ হারিয়েছেন। 

সত্য ঘটনাকে কারও ‘ষড়যন্ত্র’ আখ্যায়িত বা প্রকৃত ঘটনাকে আড়াল করার চেষ্টাও কিন্তু পূর্বতন সরকারের নিয়মেই করা হচ্ছে। গুলি, হত্যা, মব সন্ত্রাস যা-ই ঘটুক, তাকে অস্বীকার না করে, শাক দিয়ে মাছ ঢাকার চেষ্টা না করে প্রকৃত ঘটনার জন্য যারা দায়ী তাদের শনাক্ত করতে সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ তদন্ত ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা যেখানে জরুরি; সে ক্ষেত্রে উল্টোপথে হেঁটে সরকার মানুষকে বিভ্রান্ত করার ব্যর্থ চেষ্টা করছে– এমনটা আর দেখতে চাই না।  

কারও বিরুদ্ধে ফৌজদারি অপরাধের অভিযোগে মামলা এবং তাঁর সঙ্গে প্রায় সম্পর্কহীন কয়েকশ লোকের নাম দিয়ে মানুষকে হয়রানির যে নিকৃষ্ট রেওয়াজ গত সরকারের আমলে এক শ্রেণির পুলিশ ও রাজনীতিবিদের প্ররোচনায় শুরু হয়েছিল, তা বন্ধ তো হয়ইনি; বরং গণহয়রানির অস্ত্র হিসেবে এখনও ব্যবহৃত হচ্ছে। আইন উপদেষ্টা ও স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার একাধিকবার আশ্বাস প্রদান সত্ত্বেও তার পরিসমাপ্তি হয়নি। সংখ্যায় কমেছে, বলা হচ্ছে। প্রকৃতপক্ষে উল্লিখিত অমানবিক আচরণ যে ওইসব খারাপ দৃষ্টান্তের পুনরাবৃত্তিকেই উস্কে দেবার ইন্ধন জোগাচ্ছে, তার দায় কে নেবেন?

শামসুল হুদা: মানবাধিকারকর্মী; নির্বাহী পরিচালক, এএলআরডি

আরও পড়ুন

×