পরিবেশ
উজানের হাতেই কেন ভাটির নিয়তি
আবরার ফাহাদ
মুহম্মদ হিলালউদ্দিন
প্রকাশ: ১১ অক্টোবর ২০২৫ | ০৬:১৯ | আপডেট: ১১ অক্টোবর ২০২৫ | ১২:০৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
মহাসড়ক ধরে ঢাকা থেকে সিলেট যাওয়ার পথে ভৈরবের পরে একটি রেস্তোরাঁ আছে, যার নাম উজান-ভাটি। সেখানে উজান ও ভাটির শকটগুলো এসে থামে। ক্ষুধা এবং প্রাকৃতিক প্রয়োজনীয়তার মিশেলে উজান-ভাটিতে ২৪ ঘণ্টাই ভিড় লেগে থাকে। ওই মহাসড়ক রেস্তোরাঁর উজানেও সুখ, ভাটিতেও সুখ। মানুষ মানুষকে পণ্য করে, বন্য করে এবং নানাভাবে ধন্যও করে।
বলা যায়, উজান-ভাটির গল্পটি একেবারেই সরল নয়; বরং গরলময়। আমাদের নদীগুলোর উজান-ভাটিও যেন অনুরূপ, সরল-গরলের মিশ্রণ। তদুপরি এখানে বরং উজানের হাতেই বুঝি ভাটির নিয়তি। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের দীপ্র ধ্বনি ‘পদ্মা-মেঘনা-যমুনা: তোমার আমার ঠিকানা’। সদ্য প্রয়াত লালনকন্যা ফরিদা পারভীনের হৃদয় চুরমার করা গানের কলি: ‘এই পদ্মা এই মেঘনা, এই যমুনা সুরমা নদীতটে’। মন-প্রাণ জুড়িয়ে যায় বাংলাদেশের ভূগোলের উচ্ছ্বাসে। রাজনৈতিক ভূগোল আর প্রাকৃতিক ভূগোলের বাস্তবতা ভিন্ন। পৃথবীর সর্বত্র। সব নদীর উজান-ভাটির ক্ষোভ-কান্নার নিজস্ব ইতিহাস আছে।
পদ্মা-মেঘনা-যমুনা আমাদের ঠিকানা। তবে এই ঠিকানার উৎসমুখ উজানের ঠিকুজি নিন। পদ্মার উৎস গঙ্গা। গঙ্গার উদয় হিমালয়ের গঙ্গোত্রী থেকে। মেঘনার উৎস বরাক নদ; নাগাল্যান্ডের গহিন অরণ্যানী পাহাড় যার আদিসূত্র। আর যমুনা? ব্রহ্মপুত্র বাংলাদেশ উজিয়ে ভারত, তারপর চীনের মানস সরোবর। তিস্তার উৎস পার্বত্য সিকিম।
এই নদীগুলোর জলসম্পদ ব্যবহারের উজান-ভাটি গণতন্ত্র পৃথিবীতে আজও প্রতিষ্ঠিত হয়নি। বরং উজানের দাপুটে শক্তিই পৃথিবীর সর্বত্র বিরাজমান। পাকিস্তান আমলে ভারত পশ্চিমাঞ্চলে সিন্ধু প্রভৃতি নদনদীর ওপর বাঁধ দিয়েও ৮০ শতাংশ পানি পাকিস্তানে ছেড়ে দেওয়ার এক ব্যতিক্রমী চুক্তি করে তা ‘অপারেশন সিঁদুর’ পর্ব পর্যন্ত বজায় রেখেছিল। ভারতের পূর্বাঞ্চলে গঙ্গা নদীতে ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণ করে ১৯৭৪ সালে তা পরীক্ষামূলক চালু করেছিল। সেই পরীক্ষা আর শেষ হয়নি। অবশেষে ১৯৯৭ সালে বাংলাদেশের সঙ্গে একটি চুক্তিতে ভারত উপনীত হয়, যে চুক্তি এখন প্রায় মেয়াদোত্তীর্ণ। তিস্তা নদীতে গজলডোবা বাঁধ দিয়ে ভারত বাংলাদেশ অংশের তিস্তাকে শুকিয়ে মারছে কিংবা এর পারের মানুষদের ডুবিয়ে মারছে বন্যার ঢলে। প্রতিবছর। অভিন্ন নদীতে ভিন্ন ভিন্ন বিপদ।
ভারতের ভেতরেও বিপদ। কাবেরী নদীর উজানে কর্ণাটক। ভাটিতে চেন্নাই। দুই রাজ্যে কাবেরী-সংঘাতের সুরাহা হয়নি। উত্তর ইতালি আর দক্ষিণ ইতালিতে উজান-ভাটির রুদ্র সংকট। দক্ষিণ আফ্রিকা আর বতসোয়ানার মধ্যেও উজান-ভাটির সংকট। দুর্বল বতসোয়ানা উজানে থেকেও দাপুটে কৌশল নিতে সাহসী হতে পারছে না।
সম্প্রতি চীন ব্রহ্মপুত্রের আদি উৎসের কাছে পৃথিবীর বিশালতম বাঁধ তৈরি করার কথা ঘোষণা করেছে বিদ্যুৎ ইত্যাদির ঘোষিত প্রয়োজনে। বাঁধের বিরুদ্ধে নই; আমরা মেগা বাঁধের বিরুদ্ধে। মেগা বাঁধ প্রকৃতিতে বিপুল বিপর্যয় বয়ে আনে। গণচীনের এই পরিকল্পিত বাঁধ সরাসরি ভারত ও বাংলাদেশের জন্য সবিশেষ বিপর্যয় ডেকে আনবে। আমাদের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা বঙ্গোপসাগরের অভিভাবক হিসেবে উত্তর-পূর্ব ভারত-চিকেন নেক-সেভেন সিস্টার্স, তাদের বঙ্গোপসাগরে প্রবেশ নিয়ে চীনে গিয়ে অনেক কথা বললেন। কিন্তু চীনে নির্মীয়মাণ ব্রহ্মপুত্র মহা-মেগা বাঁধজনিত মেগা বিপর্যয় নিয়ে একটি কথাও উচ্চারণ করলেন না। এমনকি ভূরাজনীতির উত্তাল-জটিল সময়ে ভারতও এ প্রশ্নে মুখে কুলুপ দিয়ে বসে আছে।
একুশ শতকের সূচনায় ভারত তার উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বরাক নদের ওপর টিপাইমুখ মেগা বাঁধ নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছিল। বরাক নদের শাখা বাংলাদেশের সুরমা ও কুশিয়ারা। সুরমা ও কুশিয়ারার পথে পথে নানা নদী এসে যুক্ত হয়ে উজান মেঘনার সৃষ্টি। ভাটি মেঘনা ভৈরব-চাঁদপুর হয়ে বঙ্গোপসাগরে। ভারত তার সীমানা পর্যন্ত পরিবেশ সমীক্ষা করে। বাংলাদেশ অংশে তা করেনি। টিপাইমুখ বাঁধ নিয়ে প্রতিবাদ-হল্লা-চিল্লা তৈরি করার কাজ চলে মণিপুরে এবং বাংলাদেশে। এই মেগা বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা অতঃপর হিমঘরে চলে যায়। জানি না কবে আবার তা উষ্ণঘরে চলে আসবে!
অন্ধ হলেই প্রলয় বন্ধ থাকে না। পৃথিবীর সব প্রকৃতিবাদীকেই সোচ্চার হতে হবে চীনের সর্বশেষ নির্মীয়মাণ ব্রহ্মপুত্র মেগা বাঁধের বিরুদ্ধে। তিস্তা-পদ্মা-মেঘনা হুমকির মুখে। এখন এই ব-দ্বীপ গঠনে অপরিসীম ভূমিকা পালনকারী ব্রহ্মপুত্র যদি একই পরিণতি বরণ করে, তাহলে আমাদের অস্তিত্বই শুধু হুমকির মুখে পড়বে না; এশিয়ার একটি উল্লেখযোগ্য অংশকেও অস্তিত্ব সংকটে ফেলবে।
মুহম্মদ হিলালউদ্দিন: প্রকৌশলী ও
পরিবেশ আন্দোলনকর্মী
