ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা

প্রতিকার ও প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ জরুরি

প্রতিকার ও প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ জরুরি
×

সম্পাদকীয়

প্রকাশ: ১১ অক্টোবর ২০২৫ | ০৬:২২ | আপডেট: ১১ অক্টোবর ২০২৫ | ১২:০১

| প্রিন্ট সংস্করণ

দেশে মানসিক সমস্যা রহিয়াছে এমন ব্যক্তিদের ৯২ শতাংশ এখনও চিকিৎসাসেবার বাহিরে বলিয়া শুক্রবার প্রকাশিত সমকালের এক প্রতিবেদনে যাহা বলা হইয়াছে, তাহা উদ্বেগজনক। এই সংবাদে স্পষ্ট হয়, দেশে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সম্পর্কে যদ্রূপ জনসচেতনতার ঘাটতি রহিয়াছে, তদ্রূপ তাহার আয়োজনও সীমিত। মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে সর্বশেষ জাতীয় সমীক্ষা হইয়াছিল ২০১৮-১৯ সালে। উক্ত জরিপ অনুসারে, দেশের প্রায় ১৮ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক ও ১৩ শতাংশ কিশোর-কিশোরী বিভিন্ন ধরনের মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত। অথচ মানসিক স্বাস্থ্য নীতিমালা অনুযায়ী, দেশে মানসিক স্বাস্থ্য পেশাদারের সংখ্যা চাহিদার তুলনায় অনেক কম। দেশে প্রতি লক্ষ মানুষের জন্য শূন্য দশমিক ১৩ জন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ এবং শূন্য দশমিক ১ জন সংশ্লিষ্ট অন্যান্য-বিষয়ক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক আছেন। অন্যান্য স্বাস্থ্যসেবাকর্মীর মধ্যে শূন্য দশমিক ৮৭ জন মানসিক স্বাস্থ্য সেবাদানকারী নার্স; দশমিক ১২ জন মনোবিজ্ঞানী ও অন্যান্য পেশার মানসিক স্বাস্থ্যকর্মী। দেশে প্রতি লক্ষ মানসিক রোগীর জন্য শয্যা মাত্র শূন্য দশমিক ৪টি। মানসিক স্বাস্থ্যে ‘দিবাযত্ন’ (ডে-কেয়ার) চিকিৎসা সুবিধা যে অধিকতর কার্যকর, তাহা অদ্যাবধি দেশে প্রতিষ্ঠিতই হয় নাই। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক ডা. মো. জোবায়ের মিয়া বলিয়াছেন, সময়মতো চিকিৎসা পাইলে অধিকাংশ রোগ নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভবপর হইলেও মানসিক সমস্যায় ভোগা ব্যক্তিদের সিংহভাগ যদ্রূপ চিকিৎসা গ্রহণে দ্বিধান্বিত, তদ্রূপ স্বাস্থ্য খাতে সরকারের বরাদ্দ মোট বাজেটের মাত্র ৩ দশমিক ৩২ শতাংশ এবং তন্মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার জন্য ব্যয় ১ শতাংশেরও কম। অধিকতর ভয়ংকর হইল, মানসিক সমস্যা দেখা দিলে অনেকেই কবিরাজ বা ঝাড়ফুঁককারীর শরণাপন্ন হন, যে চিকিৎসার কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নাই। ঝাড়ফুঁকের নামে এমন চিকিৎসা চলে যাহার কারণে রোগীর অবস্থা জটিল রূপ ধারণ করে। ক্ষেত্রবিশেষে প্রাণহানিও ঘটিয়া থাকে।

বস্তুত শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য পৃথক কিছু নহে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, মানসিক, শারীরিক ও সামাজিক কার্যকারিতা পরস্পর নির্ভরশীল। কিছু ক্ষেত্রে জিন বা বংশগত কারণ থাকিলেও মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার প্রধান কারণ মূলত ক্রমবর্ধমান সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য, দীর্ঘস্থায়ী দ্বন্দ্ব, সহিংসতা এবং জনস্বাস্থ্যের সামগ্রিক সংকট। এই জন্য বিশেষজ্ঞদের মতে, অন্য অসুস্থতার ন্যায় মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কেও ধারণা রাখিতে হয়। বিশেষত শিশু-কিশোরদের ক্ষেত্রে অভিভাবকদের এহেন সতর্কতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সম্প্রতি প্রকাশিত ইউনিসেফের একটি জরিপ বলিতেছে, ৫ হইতে ১৭ বৎসর বয়সী শিশুদের মধ্যে মানসিক দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভোগার প্রবণতা বেশি এবং এই বয়সী শিশুদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা ৮ শতাংশ এবং ক্রমবর্ধমান। বাংলাদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলিতে শারীরিক নির্যাতন বন্ধে সরকারি নির্দেশনা রহিয়াছে, সত্য; তবে মানসিক নির্যাতন বন্ধের ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট কোনো পদক্ষেপ নাই। অথচ শিশুদের মৌখিক বা নীরব বুলিং তাহাদের অন্তরে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করিতে পারে, যাহার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবে শিশুর সার্বিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। উপরন্তু বিশেষত বিভিন্ন ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মূলত পুরাতন ধ্যান-ধারণার বশবর্তী হইয়া শারীরিক নির্যাতনও চলে। 

এই সকল কিছুর পরিপ্রেক্ষিতে সরকারের পক্ষ হইতে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা বিষয়ে বহুমুখী পদক্ষেপ জরুরি হইয়া পড়িয়াছে। প্রথমেই মানসিক স্বাস্থ্যসেবা খাতে সরকারের বরাদ্দ বাড়াইতে হইবে। মানসিক স্বাস্থ্যসেবার পরিকাঠামো সবল এবং দক্ষ জনবলের ঘাটতি দূরীকরণে কার্যকর উদ্যোগ লইতে হইবে। দ্বিতীয়ত, মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে সকল প্রকার কুসংস্কার দূর এবং উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ বিষয়ে জনসচেতনতা গড়িয়া তুলিবার পদক্ষেপও প্রয়োজনীয়। আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে অনেকে চিকিৎসা গ্রহণে দ্বিধান্বিত থাকেন। এই বিষয়ও সরকারকে সুরাহা করিতে হইবে। মানসিক স্বাস্থ্য স্বাভাবিক ও সুস্থ রাখিতে না পারিলে উন্নত মনের, সুস্থ মনের পরিণত মানুষ, উন্নত জাতি আশা করা যায় না। এই সত্য অনুধাবন করিয়া নাগরিকদের মধ্যে পারস্পরিক সহমর্মিতাপূর্ণ মানসিকতা গড়িবার কাজও চালাইতে হইবে।

আরও পড়ুন

×