ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

দুর্যোগ ঝুঁকি

সিডিএমপি স্বেচ্ছাসেবকের পুনরুজ্জীবন জরুরি

সিডিএমপি স্বেচ্ছাসেবকের পুনরুজ্জীবন জরুরি
×

সাখাওয়াত স্বপন

প্রকাশ: ১৪ অক্টোবর ২০২৫ | ০৬:২০ | আপডেট: ১৪ অক্টোবর ২০২৫ | ১৪:০৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি ভৌগোলিকভাবে বিশ্বের অন্যতম দুর্যোগপ্রবণ দেশ। প্রতিবছর ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, জলোচ্ছ্বাস, খরা ও ভূমিকম্প মানুষের জীবন, সম্পদ এবং অর্থনীতির ব্যাপক ক্ষতি করে। তবে দীর্ঘ কয়েক দশকের অভিজ্ঞতায় দেশ দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাসে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধন করেছে। এই অগ্রগতির অন্যতম শক্তি ছিল কম্প্রিহেনসিভ ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট প্রোগ্রামের (সিডিএমপি) স্বেচ্ছাসেবক নেটওয়ার্ক। তারা মাঠে সক্রিয় থেকে দুর্যোগ মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই কাঠামো অনেকাংশে নিস্তেজ হয়ে গেছে। 

দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাসে অগ্রগতি
প্রাতিষ্ঠানিকভাবে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর এবং স্থানীয় পর্যায়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠন করা হয়েছে, যা নীতি নির্ধারণ এবং স্থানীয় বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। প্রযুক্তির ব্যবহারও বেড়েছে। স্যাটেলাইটভিত্তিক আবহাওয়া পূর্বাভাস, মোবাইলে এসএমএস সতর্কবার্তা এবং কমিউনিটি রেডিওর মাধ্যমে মানুষকে দ্রুত তথ্য পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। অবকাঠামোগত উন্নয়নেও অগ্রগতি লক্ষণীয়। উপকূলীয় এলাকায় বহুমুখী আশ্রয়কেন্দ্র, বাঁধ ও সাইক্লোন শেল্টার নির্মাণ করা হয়েছে। ফলে মানবিক ক্ষয়ক্ষতি কমেছে। উদাহরণস্বরূপ, ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ে এক লাখের বেশি মানুষ মারা গেলেও সাম্প্রতিক ঘূর্ণিঝড়গুলোতে মৃত্যুর সংখ্যা অনেক কম। পাশাপাশি গ্রাম পর্যায়ে প্রশিক্ষণ, মহড়া, নারী ও তরুণদের সম্পৃক্ততা দুর্যোগ মোকাবিলায় সহায়ক ভূমিকা রেখেছে।

সিডিএমপি স্বেচ্ছাসেবকের অবদান
সিডিএমপির স্বেচ্ছাসেবকরা কমিউনিটি পর্যায়ের ফ্রন্টলাইন ওয়ার্কার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছে। তারা দুর্যোগ পূর্বাভাস পৌঁছে দিত, মানুষকে আশ্রয়কেন্দ্রে স্থানান্তর করত এবং ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের উদ্ধার করত। প্রাথমিক চিকিৎসা ও ত্রাণ সহায়তা, নারী-শিশু-বয়স্কদের সুরক্ষা এবং দুর্যোগ-পরবর্তী পুনর্বাসনেও নেতৃত্ব প্রদানের কাজ তাদের দায়িত্বের মধ্যে ছিল। এ স্বেচ্ছাসেবকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল। ঝুঁকিভিত্তিক পরিকল্পনা তৈরি এবং স্থানীয় কমিটি গঠন করা হয়েছিল। কিন্তু প্রকল্প শেষের পর বড় অংশের স্বেচ্ছাসেবক সক্রিয় নেই। ডেটাবেজ হালনাগাদ, প্রশিক্ষণ ও অনুপ্রেরণার অভাবে এই গুরুত্বপূর্ণ মানবসম্পদ এখন আশানুরূপ ব্যবহারযোগ্য নয়। 

চ্যালেঞ্জ ও সীমাবদ্ধতা
নগর এলাকায় অগ্নিকাণ্ড, ভবন ধস, ভূমিকম্প ঝুঁকি এবং শিল্প দুর্ঘটনা বড় চ্যালেঞ্জ। গ্রামীণ এলাকার সাফল্যের তুলনায় শহরে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা দুর্বল। ঝুঁকি-সংবেদনশীল অবকাঠামো, অর্থায়ন ঘাটতি, প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতা, সচেতনতার অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে। দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধমূলক উদ্যোগে ঘাটতি রয়ে গেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, নদীভাঙন এবং অস্বাভাবিক বৃষ্টি ঝুঁকি বাড়িয়েছে। একই সঙ্গে সরকারি-বেসরকারি সংস্থা এবং স্থানীয় কমিটির কার্যকর সমন্বয় সবসময় নেই, যা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় সীমাবদ্ধতা তৈরি করছে।

পুনরুজ্জীবনের প্রয়োজনীয়তা 
দুর্যোগের ঘনত্ব ও তীব্রতা বেড়েছে। জনসংখ্যার ঘনত্ব বেশি হওয়ায় ক্ষতির মাত্রাও বেড়েছে। স্বেচ্ছাসেবক না থাকলে স্থানীয় জনগণ প্রয়োজনীয় সতর্কবার্তা ও সহায়তা থেকে বঞ্চিত হয়। কমিউনিটি নেতৃত্বের অভাবও স্পষ্ট; যেখানে স্বেচ্ছাসেবক সক্রিয় থাকত, সেখানে মানুষ প্রস্তুত থাকত। বর্তমান সময়ে সিডিএমপি স্বেচ্ছাসেবক নেটওয়ার্ক পুনরুজ্জীবিত করা জরুরি। 

সুপারিশ
ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে পুরোনো কাঠামো হালনাগাদ করে স্বেচ্ছাসেবক নিবন্ধন ও প্রশিক্ষণ দেওয়া। প্রণোদনা ও স্বীকৃতি ব্যবস্থা চালু– বীমা, সম্মানী বা অন্যান্য প্রণোদনা। প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য ডিজিটাল অ্যাপ, জিপিএস ও ড্রোন ব্যবহার। যুব ও নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানো। সরকারি-বেসরকারি সংস্থা, এনজিও এবং স্থানীয়দের মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধিসহ বছরে অন্তত দুবার মহড়া ও প্রস্তুতি পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করা।

ভবিষ্যতের পথ
সিডিএমপি স্বেচ্ছাসেবকদের পুনরায় সক্রিয় করে স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। উপজেলা ও সিটি পর্যায়ে কমিটি, ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচি (সিপিপি) ও ফায়ার সার্ভিস-সিভিল ডিফেন্সের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় গড়ে তোলা জরুরি। প্রশিক্ষণ, পুনর্গঠন এবং প্রণোদনা নিশ্চিত করতে হবে। নগরভিত্তিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় বিনিয়োগ বাড়ানো এবং আন্তর্জাতিক তহবিল ও প্রযুক্তি সহায়তা সঠিকভাবে কাজে লাগানো যেতে পারে।

শেষ কথা
জলবায়ু পরিবর্তন ও জনসংখ্যার চাপ নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। শুধু অবকাঠামো বা সরকারি কর্মসূচি দিয়ে ঝুঁকি হ্রাস সম্ভব নয়; প্রয়োজন শক্তিশালী ও প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী। সিডিএমপি স্বেচ্ছাসেবক নেটওয়ার্ককে পুনরুজ্জীবিত করে আধুনিক প্রযুক্তি ও প্রণোদনা ব্যবস্থার মাধ্যমে মাঠে সক্রিয় করা গেলে দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাসে বাংলাদেশ আরও শক্ত অবস্থানে পৌঁছাবে।

সাখাওয়াত স্বপন: প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান
সেফটি ম্যানেজমেন্ট ফাউন্ডেশন
[email protected]

আরও পড়ুন

×