ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

রাজনীতি

নির্বাচনী প্রতীকের ইতিহাস ও ইজ্জত

নির্বাচনী প্রতীকের ইতিহাস ও ইজ্জত
×

আ ক ম সাইফুল ইসলাম চৌধুরী

আ ক ম সাইফুল ইসলাম চৌধুরী

প্রকাশ: ১৯ অক্টোবর ২০২৫ | ০৬:৩৯ | আপডেট: ১৯ অক্টোবর ২০২৫ | ১২:১৪

| প্রিন্ট সংস্করণ

প্রতীক নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে নবগঠিত ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি-এনসিপির নির্বাচনী প্রতীক শাপলা চাওয়া নিয়ে। এনসিপির নেতারা জুলাই বিপ্লবের প্রধান কারিগর। তাদের নির্বাচন কমিশন শাপলা বরাদ্দ দেয়নি এই অজুহাতে যে, নির্বাচন কমিশনের বিধিমালায় প্রকাশিত প্রতীক তালিকায় শাপলা নেই। আবার নানাপক্ষ থেকে দাবি তোলা হচ্ছে, শাপলা জাতীয় ফুল, জাতীয় প্রতীকের প্রধান অংশ, তাই শাপলা কারও বা কোনো দলের নির্বাচনী প্রতীক হতে পারে না। সংবিধান অনুযায়ী বাংলাদেশের জাতীয় প্রতীক হচ্ছে ‘উভয় পার্শ্বে ধান্যশীর্ষবেষ্টিত, পানিতে ভাসমান জাতীয় পুষ্প শাপলা, তাহার শীর্ষদেশে পাটগাছের তিনটি পরস্পর-সংযুক্ত পত্র, তাহার উভয় পার্শ্বে দুইটি করিয়া তারকা’। এনসিপি দাবি করেছে তাদের নির্বাচনী প্রতীক হয় শাপলা দিতে হবে নয়তো নির্বাচনী প্রতীকের তালিকা থেকে ধানের শীষ, সোনালি আঁশ বাদ দিতে হবে। তারা শাপলা প্রতীকের সাত রকম নমুনাও দিয়েছে, যা জাতীয় প্রতীকের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালের ৪ মার্চ প্রথমবারের মতো এক টাকা ও ১০০ টাকার নোট বাজারে আসে। এক টাকার নোটে ছিল বাংলাদেশের মানচিত্র। স্বাধীন দেশের প্রথম নোট হওয়ায় আবেগ থাকলেও ডিজাইনটি নজরকাড়া ছিল না। ১৯৭৩ সালের ২ মার্চ সম্মুখভাগে মুঠিবদ্ধ ধানের শীষ পেছনের পাতায় জাতীয় প্রতীক শাপলা নিয়ে নতুন এক টাকার নোট চালু হয়। সংবিধানে শাপলাকে জাতীয় প্রতীক হিসেবে গ্রহণ করায় সংবিধান প্রণয়নের আগের নোটে শাপলা ঠাঁই পায়নি। ২ মার্চ নোট আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হলেও অভিযোগ ওঠায় বাজারে ছাড়া হয়নি। কারণ হিসেবে মওলানা ভাসানী অভিযোগ তোলেন তাঁর দল ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (ভাসানী) নির্বাচনী প্রতীক ধানের শীষ বলেই নোটটি ভোটের আগে বাজারে আসেনি। ’৭০-এর নির্বাচনেও ন্যাপ ভাসানীর একই প্রতীক ছিল। দেশের প্রথম জাতীয় সংসদের নির্বাচন হয়েছিল ১৯৭৩ সালের ৭ মার্চ। 

১৯৭৫ সালের পট পরিবর্তনের পর ধানের শীষ ন্যাপ ভাসানীকে ছেড়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল–বিএনপির প্রতীক হয়ে যায়। ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে ১৯৭৮ সালের ৩ জুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ও ১৯৭৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেয় বিএনপি। বিএনপি তখন তুমুল জনপ্রিয় দল। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরে ১৯৭৯ সালে ৩ সেপ্টেম্বর নতুন এক টাকার নোট থেকে অপসৃত হয়ে যায় ধানের শীষ। হয়তোবা দলীয় প্রতীকের সঙ্গে নোটের মূল ছবির সামঞ্জস্য দূর করে নিরপেক্ষতার নজির স্থাপন করতে চেয়েছিলেন তৎকালীন সরকারের কর্তা ব্যক্তিরা। 

বিবেচনা করা হয় প্রতীক হচ্ছে দলের পরিপূরক। যদিও এখন দেশে শিক্ষিতের হার বেড়েছে কিন্তু ৫০-৬০ বছর আগে এ হার ছিল খুবই নগণ্য। এখনকার তুলনায় তখন প্রতীক শুধু দল-ই নয়, ব্যক্তিরও পরিচায়ক হয়ে উঠত। ১৯৭৯ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে উত্তরবঙ্গের এক বিপুল জনপ্রিয় নেতা হেরে যান তাঁর শিষ্যের কাছে। দুজনই তখন ব্রাকেটবন্দি আওয়ামী লীগের প্রার্থী। ‘মিঠা বাবাজি’খ্যাত বড় নেতা নতুন প্রতীকে প্রার্থী। নির্বাচনে হেরে গেলে ভোটারদের কথা– হামরা তো তোকেই ভোট দিছিনো, তুই যে মার্কা বদলায় ফেলাইছি, হামরা কি করমো?

দেশের শতভাগ ভোটার শিক্ষিত হয়ে গেলে প্রতীকের হয়তো কোনো বালাই থাকত না। তাই-বা বলি কী করে! এখনও মার্কিন মুলুকে ভোট হয় হাতি আর গাধার মধ্যে; না না সরাসরি হাতি আর গাধার লড়াই না, ও দুটো দুই প্রধান দলের নির্বাচনী প্রতীক। মার্কিনিরা চার বছর পরপর বেছে নেয় হয় গাধা, নয় হাতি। 

একবার ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে সদস্য পদপ্রার্থীদের প্রতীক তালিকায় ছিল চেয়ার। এক চেয়ারম্যান পদপ্রার্থীর আঁতে লাগল প্রতীকের এই অসামঞ্জস্য। ফলে প্রার্থিতাই প্রত্যাহার করে নিলেন। এবারে জাতীয় সংসদের দলীয় ও স্বতন্ত্র কোনো তালিকাতেই ঠাঁই হয়নি হুঁকার। যদিও ১৯৩৭ সালে হুঁকা মার্কা নিয়ে নির্বাচনে বাজিমাত করেছিলেন শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক। এককালে দেশের সকল বাড়িতেই যে হুঁকা ছিল সাড়ম্বর উপস্থিতি, এখন তা নির্বাচনী প্রতীক হলে মানুষকে চেনানোর জন্য যথেষ্ট বেগ পেতে হতে পারে। 

ভারতে প্রথম জাতীয় নির্বাচনের আগে ১৯৫১ সালে প্রতীক বরাদ্দের বৈঠকে কংগ্রেসসহ বেশ কয়েকটি দল প্রতীক হিসেবে দাবি করে লাঙল। ভারতের ৯৯ শতাংশ মানুষের পেশা তখন চাষাবাদ। চারদিকে লাঙলের ছড়াছড়ি, সবারই কাজের জিনিস। তাই প্রতিটি দলেরই দাবি লাঙল। প্রধান নির্বাচন কমিশনার সমস্যার সমাধান বের করলেন, কোনো দলকেই লাঙল প্রতীক দেওয়া হয়নি। ভারতের পরিস্থিতি এখন এতই পাল্টে গেছে যে জমি চাষে ট্রাক্টরের দাপটে লাঙল উধাও, এখন লাঙল প্রতীক কাউকে জোর করে দিলেও নেবে কিনা সন্দেহ।

এক সময় আমাদের নির্বাচন কমিশন জাতীয় ফল কাঁঠালকে রাজনৈতিক দলের প্রতীক হিসেবে বরাদ্দ দিয়েছে। আমাদের জাতীয় প্রতীকে খোদিত ধানের শীষ আর বিএনপির দলীয় প্রতীক ধানের শীষের ধরন এক নয়। জাতীয় প্রতীকে একটি করে একক ধানের শীষ শাপলাকে ঘিরে রেখেছে। কিন্তু নির্বাচনী প্রতীকরূপে ধানের শীষ মূলত গুচ্ছ ধানের শীষ। এমনকি জাতীয় প্রতীকের পাটের তিন পাতা আর তৃণমূল বিএনপির প্রতীক সোনালি আঁশ একই রকম নয়। অন্যদিকে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডির প্রতীক ‘তারা’র ধরন জাতীয় প্রতীকে থাকা তারার ধরনেরই অনুরূপ। 

অতীতে পুলিশের প্রতীকে থাকা নৌকা আওয়ামী লীগের প্রতীকের সঙ্গে মিলে যাওয়ায় পুলিশের প্রতীক থেকে নৌকা সরে গিয়েছিল। আওয়ামী লীগের আমলে পুলিশের প্রতীকে নৌকা আবার ভাসলেও জুলাই বিপ্লবের তোড়ে তা ডুবে গেছে। বিতর্ক আছে ন্যায়বিচারের প্রতীক দাঁড়িপাল্লা জামায়াতে ইসলামীর দলীয় প্রতীক হওয়া নিয়েও। তাই শাপলা প্রতীক নিয়ে ওঠা বিতর্ক নির্বাচন কমিশন কীভাবে সুরাহা করবে তা দেখার অপেক্ষায় সকলেই।

আ ক ম সাইফুল ইসলাম চৌধুরী: কলাম লেখক; অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব

আরও পড়ুন

×