ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

ক্রীড়া

ক্রিকেটের উন্নয়নে নতুন বিনিয়োগ

ক্রিকেটের উন্নয়নে নতুন বিনিয়োগ
×

সাঈদ ইব্রাহিম আহমেদ

প্রকাশ: ০২ নভেম্বর ২০২৫ | ০৬:১৬ | আপডেট: ০২ নভেম্বর ২০২৫ | ১১:৪৬

| প্রিন্ট সংস্করণ

অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড কিংবা তাদের মতো অন্যান্য ক্রিকেট খেলায় সফল দেশ কাকতালীয়ভাবে ক্রিকেট পরাশক্তিতে পরিণত হয়নি। তাদের এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে ঘরোয়া ক্রিকেটে পরিকল্পিত বিনিয়োগ, খেলোয়াড়দের মানোন্নয়ন ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের লক্ষ্যে দশকের পর দশক ধরে করা দীর্ঘ বিনিয়োগ। 
প্রতিটি বড় মাপের খেলোয়াড়ের জন্য তারা একটি পুরো সিস্টেম দাঁড় করিয়েছে। তরুণ প্রতিভাদের অ্যাকাডেমি প্রতিষ্ঠা করা, বিশেষজ্ঞ কোচ নিয়োগ দেওয়া এবং প্রতিটি প্রতিভাকে দক্ষ খেলোয়াড়ে রূপান্তর করার জন্য যে পথ পরিক্রমার মধ্য দিয়ে যেতে হয়, তার জন্য প্রধান ভূমিকা পালন করেছে আর্থিক বিনিয়োগ। বাংলাদেশেও ঘরোয়া ক্রিকেটে অনেক প্রতিভা রয়েছে। কিন্তু এসব প্রতিভাকে বিশ্বমঞ্চে সফল হতে হলে শক্তিশালী আর্থিক প্রণোদনার ভিত্তি থাকা আবশ্যক।    

এ ক্ষেত্রে, প্রথম পদক্ষেপ হতে পারে করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে দেশের ক্রীড়াজগতের সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে ভাবা এবং তাদের সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারিত্ব তৈরি করা। বিগত বছরগুলোতে দেশের টেলিযোগাযোগ খাত, ব্যাংকিং ও এফএমসিজি (ভোগ্যপণ্য খাত) খাতের অনেক প্রতিষ্ঠান ক্রিকেট খেলায় স্পন্সর করেছে বা করতে চেয়েছে; তবে, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এগুলো ছিল স্বল্পমেয়াদি ও টুর্নামেন্টকেন্দ্রিক। 

তাছাড়া, দেশের ক্রিকেটে নতুন বিনিয়োগ ও বৃহত্তর পুঁজি আনতে হলে আমাদের ফ্র্যাঞ্চাইজিভিত্তিক লিগগুলো সংস্কার করার কোনো বিকল্প নেই। বাংলাদেশের ক্রিকেটপ্রেমীদের মাঝে অনেক আশা-উদ্দীপনার জন্ম দিয়েছিল আইপিএলের আদলে শুরু হওয়া বিপিএল। যাত্রা শুরুর পরে বিপিএল টুর্নামেন্ট ঘিরে বড় বাজারও তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিল, ফলে অর্থনৈতিকভাবে সফল হওয়ার কথা ছিল এই লিগের। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, সামগ্রিক দিক দিয়ে আর্থিকভাবে সম্ভাবনাময় সব সূচক পূরণ করেও বিপিএল প্রত্যাশিত সাফল্য অর্জন করতে পারেনি। এর অন্যতম বড় কারণ, প্রতিযোগিতার কাঠামো ও সুশাসনের অনুপস্থিতি। 
একই সঙ্গে মালিকানা পেতে যথাযথ মাননিয়ন্ত্রণ করা আবশ্যক, যাতে লিগে সুশাসন নিশ্চিত হয় এবং বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জনেও সক্ষম হয়। সরকারের পক্ষ থেকে সবসময় আর্থিক সহায়তাই আসতে হবে, এমন নয়। বরং এমন কিছু নীতিমালা প্রণয়ন করা যেতে পারে, যা বেসরকারি বিনিয়োগকে আকর্ষণীয় করে তুলবে। 

এ ছাড়া সফল বিদেশি ক্রিকেট বোর্ডগুলোর সঙ্গে আমাদের খেলোয়াড়দের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের সুযোগ তৈরি করে দেওয়া উচিত। তাদের মধ্যে আনুষ্ঠানিক সহযোগিতার পরিসর গড়ে তুললে প্রশিক্ষণ ক্যাম্প, এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রাম ও আবাসিক কোচিংয়ের সুযোগ তৈরি হবে। বাংলাদেশের তরুণ খেলোয়াড়রা বিদেশে পেশাদার পরিবেশে কয়েক মাস কাটিয়ে এলে অনেক অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের সুযোগ পাবেন। 

নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও গত কয়েক বছরে দেশের নারী ক্রিকেট অসাধারণ অগ্রগতি সাধন করেছে। তাই, নারী ক্রিকেট এখন বিশেষ মনোযোগ পাওয়ার দাবিদার। অবকাঠামো ও অর্থায়নের দিক থেকে তারা এখনও অনেক পিছিয়ে। এই সমস্যা উত্তরণে নারী ক্রিকেটের জন্য বিশেষ লিগ, প্রশিক্ষণ স্কুল এবং স্পন্সরশিপ প্রোগ্রাম গড়ে তোলা গেলে দেশের ক্রিকেট শক্তি দ্বিগুণ হবে এবং নতুন বাজার তৈরি হবে। ঢাকা ও চট্টগ্রামে সব টুর্নামেন্ট না করে, তৃণমূল পর্যায়ে টুর্নামেন্ট আয়োজন ও দর্শক অংশগ্রহণ বাড়ানো এখন সময়ের দাবি। 

তবে, এসব  উদ্যোগ বাস্তবায়নের জন্য সবচেয়ে প্রয়োজন সঠিক নেতৃত্ব। পরিকল্পনা করা থেকে শুরু করে তা বাস্তবায়ন, ব্যবসায়িক চুক্তি এবং অংশীদারিত্ব গড়ে তোলার কাজটি নেতৃত্ব স্থানীয় ব্যক্তিবর্গই করবেন। এর জন্য বড় প্রকল্প পরিচালনা করা ও উপযুক্ত খাতে বিনিয়োগের দায়িত্বও তাদেরকেই নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে, যাদের প্রশাসনিক কাজে দক্ষতা রয়েছে পাশাপাশি পূর্বে খেলাধুলার সঙ্গে সম্পৃক্ততা রয়েছে, তারা এ দুটির সমন্বয় ঘটাতে পারেন। 

ঢাকার ক্রিকেট ক্লাবের কাউন্সিলর হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতা থাকায় এবং বর্তমানে দ্বিতীয় বিভাগে কাজের দায়িত্ব পালন করায় আমি দেখেছি যে, মাঠপর্যায়ে বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিবন্ধকতা উন্নয়নকে কতভাবে বাধাগ্রস্ত করে। টরন্টো, কেন্ট ও লন্ডনের বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ক্রিকেট খেলার সময় আমি উপলব্ধি করেছি, যেসব উন্নত দেশে ক্রিকেটকে বিকাশমান বা প্রতিযোগিতামূলক একটি সম্ভাবনা হিসেবে দেখা হয়।

অন্যদিকে, শুধু পারিবারিক বা দলীয় সম্পর্কের কারণে যোগ্য ব্যক্তিদের উপেক্ষা করে অযোগ্যদের বেছে নেওয়ার ঘটনা আমাদের দেশে বিরল নয়। খেলোয়াড় কিংবা খেলার সঙ্গে জড়িত মানবসম্পদ নির্বাচন সব সময় পেশাদারিত্ব ও যোগ্যতার ভিত্তিতে হওয়া উচিত। 
একই সঙ্গে খেলোয়াড়দের প্রতিভা বিকাশ ও সুশাসনের জন্য নির্দিষ্ট ছক এঁকে ফেললে তা বাস্তবায়ন তুলনামূলক সহজ হয়ে যাবে। এতে করে দায়িত্বশীলতার সঙ্গে ক্রিকেটকে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে। তবে, এ ধরনের পরিকল্পনাকে অবশ্যই টেকসই হতে হবে, তাৎক্ষণিক কিছু বিজয়ে চূড়ান্ত সফলতা আসবে না।  

সাঈদ ইব্রাহিম আহমেদ: সহকারী অধ্যাপক, আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি-বাংলাদেশ
[email protected]

আরও পড়ুন

×