ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

আন্তর্জাতিক

ভারত-তালেবানের সম্পর্ক: ভাবিয়া করিও কাজ

ভারত-তালেবানের সম্পর্ক: ভাবিয়া করিও কাজ
×

শশী থারুর। ছবি: সংগৃহীত

শশী থারুর

প্রকাশ: ০২ নভেম্বর ২০২৫ | ০৬:২০ | আপডেট: ০২ নভেম্বর ২০২৫ | ১১:১৪

| প্রিন্ট সংস্করণ

পররাষ্ট্রনীতি অভ্যাসগতভাবে নৈতিক বিশ্বাস এবং কঠোর হিসাব-নিকাশের মধ্যকার অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে থাকে। রাষ্ট্রগুলো একদিকে সর্বজনীন মূল্যবোধের কথা বলে; অন্যদিকে যখন সুবিধা প্রধান হয়ে ওঠে, তখন তা পুনর্বিন্যাস করে। আফগানিস্তানের তালেবান নেতৃত্বাধীন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ভারতের সাম্প্রতিক যোগাযোগ সেই টানাপোড়েনের একটি দারুণ কেসস্টাডি হতে পারে। তা সবচেয়ে বেশি স্পষ্ট হয়েছে গত মাসে আফগান পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ভারত সফরের মধ্য দিয়ে। নয়াদিল্লির বৈঠক, যৌথ বিবৃতি এবং মানবিক ও উন্নয়ন সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি, একটি কৌশলগত যুক্তি তুলে ধরে। অন্যদিকে নারী সাংবাদিকদের বাদ দেওয়ার বিষয়ে প্রেস-রুম বিতর্ক বাস্তব রাজনীতির সঙ্গে জড়িত নীতিগত আপসগুলো অদ্ভুতভাবে উপস্থাপন করে।

তালেবানের সঙ্গে যোগাযোগের পক্ষে ভারতের অন্তত তিনটি যুক্তি রয়েছে এবং স্পষ্টতই তা বাস্তবসম্মত। প্রথমত, কাবুল নয়াদিল্লির নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। একটি স্থিতিশীল আফগানিস্তান ভারতবিরোধী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে আশ্রয় দেবে না, লেলিয়ে দেওয়া দূরের কথা। বিশেষ করে সীমান্তে সন্ত্রাসবাদ অব্যাহত রাখা এবং পাকিস্তানের সঙ্গে দেশটির ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক নৈকট্যের কারণে এটি কৌশলগত দিক থেকে অপরিহার্য। দ্বিতীয়ত, আফগানিস্তানের সঙ্গে ভারতের দীর্ঘস্থায়ী উন্নয়নমূলক উদ্যোগ এবং জনগণের সঙ্গে জনগণের সম্পর্ক রয়েছে। এই যোগাযোগের ভিত্তিতেই বছরের পর বছর আমাদের উন্নয়ন সহায়তার (২.৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার); যা বৃহত্তম প্রাপক ছিল। সহায়তা, অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও কনস্যুলার চ্যানেলগুলো খোলা রাখা সেই বিনিয়োগ ও প্রভাবকে সুরক্ষা দেয়। তৃতীয়ত, ভারতের সম্পৃক্ততা এ অঞ্চলে ঝুঁকি কমানোর কৌশল, যেখানে ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা তীব্রতর হচ্ছে। কাবুলের সঙ্গে চ্যানেলগুলো খোলা রাখতে ব্যর্থ হলে কেবল পাকিস্তান, চীন ও অন্যদের সম্পর্ক গভীর হবে। তাতে ভারতের স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং তাদের সুবিধাগুলো অন্যদিকে প্রবাহিত হবে।

এই বিবেচনাগুলো বলে দেয়, কেন নয়াদিল্লি আমির খান মুত্তাকিকে আতিথেয়তায় বরণ করেছিল, তাঁকে আফগান দূতাবাস ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছিল। আর উন্নত কনস্যুলার সুবিধার জন্য রসদ সরবরাহের বিষয়ে আলোচনার পাশাপাশি মানবিক প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছিল। বৈঠকের পর এক যৌথ বিবৃতিতে পদক্ষেপগুলো প্রকাশ্যে ঘোষণা দেওয়া হয়। আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি অনুসরণ করা হয়নি, তবে কাবুলে আমাদের ‘প্রযুক্তিগত মিশন’-কে ‘দূতাবাসে’ উন্নীত করা হয়েছে। পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ; এটি সম্পৃক্ততা ও সতর্কতা উভয়েরই ইঙ্গিতবহ।

আফগানদের কূটনৈতিক ভুলের কারণে এই সফরের দৃশ্যপট জটিল হয়ে পড়েছিল। নয়াদিল্লিতে তালেবান আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে নারী সাংবাদিকদের বাদ দেওয়া হয়। ফলে অভ্যন্তরীণভাবে তীব্র সমালোচনা দেখা দেয় এবং সরকার এই ঘটনা থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে নিয়েছিল। এ ঘটনায় ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ও বিরোধী রাজনীতিবিদরা তীব্র প্রতিবাদ জানান, যাকে তারা ভারতীয় মাটিতে নারী-বিদ্বেষের অগ্রহণযোগ্য আমদানি বলে চিহ্নিত করেছিলেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জোর দিয়ে বলেছিল, এই নির্দিষ্ট কয়েকটি সংবাদমাধ্যম আয়োজিত অনুষ্ঠানে তাদের কোনো ভূমিকা ছিল না, যদিও পরে হট্টগোলের পর অন্য একটি সংবাদ সম্মেলনে তালেবান নেতা নারী সাংবাদিকদের আলাদাভাবে ব্রিফ করেছিলেন। সংবাদ সম্মেলন বিতর্ক ভারতীয়দের মুখে তিক্ত স্বাদ এনে দেয় এবং তালেবান শাসনের সঙ্গে নয়াদিল্লির সম্পর্কের বিষয়ে নতুন করে নৈতিক সন্দেহের উদ্রেক ঘটে।

আফগানিস্তানের সঙ্গে ভারতের বর্তমান সম্পর্কোন্নতির চেষ্টা অতীতের ভয়াবহতা স্মরণ না করে বোঝা সম্ভব নয়। প্রথম তালেবান শাসনামলে ভারতের প্রতি পাকিস্তানি বৈরীপূর্ণ কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার ঘটনাগুলো গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করে। বিশেষত ১৯৯৯ সালের ডিসেম্বরে কান্দাহারগামী ইন্ডিয়ান এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট আইসি ৮১৪ ছিনতাই করা; আলোচনার ফলস্বরূপ কারাবন্দি পাকিস্তানি সন্ত্রাসীদের মুক্তি দেওয়া হয় এবং পরবর্তী সময়ে বিমানটির ভয়াবহ পরিণতি উল্লেখযোগ্য। সেই পর্বটি বছরের পর বছর নয়াদিল্লির মনোভাবকে কঠিন করে রাখে এবং পরবর্তী পনেরো বছর তালেবানের স্পষ্টভাবে স্বীকৃতি না দেওয়া এবং তাদের সঙ্গে অসহযোগিতা করাকে উস্কে দেয়।

তারপর থেকে যা পরিবর্তিত হয়েছে, তা হলো ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, তালেবানের কূটনৈতিক সম্পর্কের কিছুটা স্বাভাবিক পরিস্থিতি গড়ে তোলার প্রচেষ্টা, পাকিস্তানে তাদের আগের সমর্থক ও পৃষ্ঠপোষকদের থেকে ক্রমবর্ধমান বিচ্ছিন্নতা, দুই দেশের মধ্যে সীমান্ত সংঘর্ষ এবং ভারতের নিজস্ব কৌশলগত বাধ্যবাধকতা। ২০২১ সালে মার্কিন বাহিনী প্রত্যাহার, আঞ্চলিক জোটগুলোর পুনর্গঠন এবং বহিরাগত সাহায্যের ওপর আফগানিস্তানের নির্ভরতা চ্যানেলগুলো পুনরায় খোলার জন্য উৎসাহের কারণ ঘটায়। নয়াদিল্লি মনে করে নীরব কূটনীতি, মানবিক সম্পৃক্ততা, সুনির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে সন্ত্রাসবাদ দমন ও সংযোগ বিচ্ছিন্নতার চেয়ে ভারতীয় স্বার্থকে আরও ভালোভাবে সুরক্ষিত করতে পারে।

এই দ্বিবিধ সংকটে চিন্তাশীল ভারতীয়দের কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখানো উচিত? নাগরিক অস্বস্তি স্পষ্ট, বৈধ ও দরকারি। এ বিষয়ে সম্পৃক্ত থাকার জন্য নৈতিকতাকে ঝেড়ে ফেলার প্রয়োজন নেই। তবে তাকে জনসাধারণের জবাবিদিহির আওতায় রাখতে হবে এবং এ বিষয়ে স্পষ্ট সীমারেখা টানতে হবে। চিন্তাশীল ভারতীয় গণতন্ত্রীদের একই সঙ্গে তিনটি দাবির ওপর জোর দেওয়া উচিত। প্রথমত, মানবিক ও উন্নয়ন সহায়তা এমনভাবে পরিচালিত করা উচিত, যা নারীদের চাহিদাকে অগ্রাধিকার দেয় এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে তাদের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করে। দ্বিতীয়ত, কূটনৈতিক যোগাযোগ শর্তসাপেক্ষ, সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত ও প্রত্যাহারযোগ্য, যা কোনোভাবে স্বয়ংক্রিয় স্বীকৃতি এবং কোনো লজ্জাজনক নৈতিক আপসের মধ্যে ঘটে না। তৃতীয়ত, অভ্যন্তরীণ আচার-রীতি পালনের ভার বিদেশিদের হাতে তুলে দেওয়া উচিত নয়; বিশেষত যারা লিঙ্গ সমতার ওপর ভারতের সাংবিধানিক মূল্যবোধকে অবমাননা করে।

ভারতের কূটনৈতিক অবস্থান বাস্তবসম্মত ও নৈতিক উভয়ই হতে পারে। যদি এটি জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থায় যুক্ত হয়, যা স্বচ্ছতার সঙ্গে তহবিল পর্যবেক্ষণ, অধিকার পুনরুদ্ধারে সুনির্দিষ্ট মানদণ্ড বজায় রাখা এবং নিরাপত্তা নিশ্চয়তার ওপর জনসাধারণের প্রতিবেদন অন্তর্ভুক্ত করে। সুশীল সমাজ, গণমাধ্যম ও বিরোধী রাজনীতির এই শর্তগুলো অভ্যন্তরীণভাবে চেপে না রেখে স্পষ্ট করার জন্য সরকারকে চাপ দেওয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা রয়েছে।

তালেবান পর্বটি সমসাময়িক কূটনীতিতে দ্বন্দ্ব কীভাবে কাজ করে তার একটি অধ্যয়ন, যা বহুত্ববাদী গণতন্ত্রের নৈতিক মান ও প্রত্যাশার সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত দৃশ্যমান জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষিত করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে। ইতিহাসের স্মারকগুলো আমাদের মনে রাখতে হবে। তবে এগুলোর ভিত্তিতে যেমন আমাদের বর্তমান প্রয়োজনগুলো নির্ধারিত হবে না, তেমনি শেষোক্ত বিষয় প্রথমোক্তকে মুছেও দেবে না। নৈতিক রক্ষাকবচ বাদ দিয়ে কেবল সম্পৃক্ততায় দমনমূলক কর্মকাণ্ডকে স্বাভাবিক করে তোলার ঝুঁকি রয়েছে। বাস্তবসম্মত সম্পৃক্ততা ব্যতিরেকে বিচ্ছিন্নতায় কৌশলগত বিপর্যয়ের ঝুঁকি থাকে।

কঠিন হলেও নয়াদিল্লির দায়িত্ব হলো নীতি ও বাস্তববাদের মধ্যে সমন্বয় সাধন করা; যাতে একই সঙ্গে জাতীয় নিরাপত্তা এবং আমাদের সরকার যে অধিকারসচেতন, নাগরিকদের প্রতিনিধিত্ব করে তাদের মর্যাদা রক্ষা করা যায়। মহাত্মা গান্ধী আমাদের শিখিয়েছিলেন, মহৎ উদ্দেশ্য কখনও হীন উপায়কে হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণ করে না। তাঁর দেশ হিসেবে ভারতকে অবশ্যই নিজের প্রতি সৎ থাকতে হবে। আর আমরা জনসাধারণ, আমাদের নামে কী বলা হচ্ছে এবং করা হচ্ছে, সে সম্পর্কে সতর্কতা অবলম্বন থেকে বিরত থাকব না।

শশী থারুর: ভারতের সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ও বর্তমানে দেশটির লোকসভার কংগ্রেসদলীয় এমপি; দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস থেকে ভাষান্তর ইফতেখারুল ইসলাম

আরও পড়ুন

×