ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

পরিবহন

ব্যাটারিচালিত রিকশা: ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় নতুন বিপত্তি

ব্যাটারিচালিত রিকশা: ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় নতুন বিপত্তি
×

রানা ভিক্ষু

প্রকাশ: ০৪ নভেম্বর ২০২৫ | ০৬:১৭ | আপডেট: ০৪ নভেম্বর ২০২৫ | ১১:০৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশে ব্যাটারিচালিত রিকশা এখন গুরুত্বপূর্ণ গণপরিবহন। এটি স্বল্প দূরত্বের যাতায়াতে সাশ্রয়ী বিকল্প এবং লাখো মানুষের জীবিকার উৎস। তবে এই যানবাহনের অস্বাভাবিক সংখ্যা বৃদ্ধি ঢাকাসহ সারাদেশের ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় নতুন সংকটের জন্ম দিয়েছে। এক বছর আগেও ঢাকার পাড়া-মহল্লায় যেসব গলিপথ যানজটমুক্ত ছিল, সেগুলো আজ প্রধান সড়কের মতোই ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে স্থবির। দেশের অন্যান্য শহরের চিত্র প্রায় একই।

বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ব্যাটারিচালিত রিকশার সংখ্যা বেড়েছে ৫০০ শতাংশ। ঢাকায় বর্তমানে ব্যাটারিচালিত রিকশার অনুমিত সংখ্যা প্রায় ১২ লাখ। সংখ্যা বৃদ্ধির এই হার যদি অব্যাহত থাকে, তাহলে আগামী তিন বছরে ঢাকায় ব্যাটারিচালিত রিকশার সংখ্যা ৫০ লাখ ছাড়িয়ে যাবে।

সম্প্রতি বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিভিক ফাউন্ডেশন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের আওতাধীন ৩৫টি থানায় ‘ঢাকা শহরের ব্যাটারিচালিত রিকশার বর্তমান অবস্থা, সমস্যা ও করণীয়’ শীর্ষক সমীক্ষা পরিচালনা করে। এতে সরেজমিন পর্যবেক্ষণ ছাড়াও চালক, যাত্রী, গ্যারেজ, শোরুম মালিকসহ ৬২৭ অংশীজনের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করা হয়। পাশাপাশি বুয়েট, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন, ট্রাফিক পুলিশ, বিআরটিএ, পরিবেশ অধিদপ্তর ও নাগরিক সংগঠনের বিশেষজ্ঞদের মতামত নেওয়া হয়।

সমীক্ষায় দেখা যায়, প্রায় ৪০ শতাংশ ব্যাটারিচালিত রিকশা টুসিটার, ম্যানুয়াল ব্রেকনির্ভর ও ব্যাকগিয়ারবিহীন। পূর্ববর্তী বিভিন্ন সমীক্ষায় ঢাকা শহরের রিকশাচালকদের বেশির ভাগ উত্তরবঙ্গের হিসেবে চিহ্নিত হলেও বর্তমান সমীক্ষার তথ্যানুযায়ী ৬৫ শতাংশ চালক ঢাকার পার্শ্ববর্তী জেলা থেকে আগত (তবে পা-চালিত রিকশা চালনায় উত্তরবঙ্গের চালকরা এখনও সংখ্যায় বেশি)। ব্যাটারিচালিত রিকশার চালকদের ৩৫ শতাংশের বেশি এইচএসসি পাস এবং এক বছরের মধ্যে তারা ঢাকায় এসেছেন।
অল্পসংখ্যক (০.০২ শতাংশ) নারী ব্যাটারিচালিত রিকশা চালাচ্ছেন। তবে রিকশার গ্যারেজকেন্দ্রিক আনুষঙ্গিক কাজে (যেমন: চা-পান বিক্রি, চালকদের মেসে খাবার রান্না ইত্যাদি) ৮৩ শতাংশ নারী নিয়োজিত। অর্থাৎ এই খাত ক্রমেই নারীর কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছে। 

অন্যদিকে, ব্যাটারিচালিত রিকশার অপরিকল্পিত চলাচল নাগরিক জীবনকে নাজেহাল করতে শুরু করেছে। প্রায় ৭৩ শতাংশ গ্যারেজ সরকারি জমিতে গড়ে উঠেছে। এনজিও ও সমবায় সমিতি থেকে ঋণ নিয়ে কেনা হয়েছে ২৭ শতাংশ ব্যাটারিচালিত রিকশা। চালকদের গড় দৈনিক আয় ১,০০০-১,৫০০ টাকা হলেও রিকশা ভাড়া, মেস ভাড়া, খাওয়া ও অন্যান্য খরচ বাদে প্রায় ৪০ শতাংশ চালকের নিট আয় ৫০০ টাকার নিচে। এক-চতুর্থাংশ চালক ঋণগ্রস্ত এবং ১১ শতাংশ  ঋণ শোধে অক্ষম।

আবাসিক মিটার থেকে বিদ্যুৎ সংযোগ নিয়ে ৬৭ শতাংশ  গ্যারেজে ব্যাটারি চার্জ করা হয় এবং ১৬ শতাংশ গ্যারেজ ঝুঁকিপূর্ণভাবে পার্শ্ববর্তী বিদ্যুৎ সংযোগ ব্যবহার করে, যা বিদ্যুৎ খাতের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করেছে।

রিকশায় প্রধানত দুই ধরনের ব্যাটারি ব্যবহৃত হচ্ছে– লেড এসিড (৭৭ শতাংশ) এবং লিথিয়াম-আয়ন (২৩ শতাংশ)। লেড এসিড ব্যাটারির আয়ুষ্কাল ৬-১২ মাস হলেও পাঁচ মাস পরে কার্যকারিতা কমতে শুরু করে। নষ্ট ব্যাটারির প্রায় ২৩ শতাংশ যত্রতত্র ফেলা হয়, যা পরিবেশ ও মানবস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি সৃষ্টি করছে। এ ছাড়া অন্যান্য যানবাহনের থেকে ব্যাটারিচালিত রিকশায় দুর্ঘটনার ঝুঁকি  অনেক বেশি।

শুরুর দিকে অটোরিকশা আমদানিনির্ভর থাকলেও এখন দেশেই অনেক যন্ত্রাংশ তৈরি হচ্ছে। ঢাকায় চলমান ব্যাটারিচালিত রিকশাগুলোর ৩২ শতাংশ স্থানীয়ভাবে নির্মিত, ১৬ শতাংশ সম্পূর্ণ আমদানিকৃত এবং ৫১ শতাংশ হাইব্রিড (স্থানীয় ও আমদানীকৃত যন্ত্রাংশের মিশ্রণ)। এ খাতের সিংহভাগ শ্রমিকই অদক্ষ ও শিশু। 
সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী হওয়ায় ব্যাটারিচালিত রিকশা ঢাকার মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের সমর্থন পাচ্ছে। সমীক্ষায় ৮১ শতাংশ যাত্রী বলেছেন, ভাড়া ও সহজপ্রাপ্যতার কারণে তারা এই যানটি বেছে নেন। 

ব্যাটারিচালিত রিকশার ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত নীতি প্রণয়ন জরুরি। স্বল্পসংখ্যক বৈধ ও নিরাপদ ব্যাটারিচালিত রিকশা চালু রেখে অতিরিক্ত সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এ জন্য প্রথমে চালকদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে। অটোরিকশা ক্রয়ে ঋণ প্রদানকারী এনজিও ও সমবায় সমিতি এতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

দেশব্যাপী ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা, বিভাগ ও রাজধানী পর্যায়ে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার সর্বোচ্চ সংখ্যা নির্ধারণ করতে হবে। সহজ নিবন্ধন ও লাইসেন্সিং ব্যবস্থার পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভর উন্নত ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে হবে। যেমন নির্দিষ্ট এলাকার বাইরে গেলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ব্যাটারি বন্ধ হয়ে যাওয়া, নির্ধারিত মাত্রার অধিক গতিতে চালাতে গেলে ব্যাটারি বন্ধ হয়ে যাওয়া ইত্যাদি। এ ছাড়া বিকল্প লেন চালু করা যেতে পারে। 

গ্যারেজ ব্যবস্থাপনাতেও সংস্কার দরকার। সরকারি জমিতে গড়ে ওঠা অবৈধ গ্যারেজগুলো অপসারণ করে পরিকল্পিত এলাকায় স্থানান্তর করা যেতে পারে। একইভাবে বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা আনতে হবে। নির্দিষ্ট চার্জিং স্টেশন স্থাপন, অবৈধ সংযোগ বন্ধ এবং বিদ্যুৎ ব্যবহারের সময়সূচি নির্ধারণ করে অপচয় রোধ করা সম্ভব।

পরিবেশ সুরক্ষার স্বার্থে নষ্ট ব্যাটারির নিরাপদ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত এবং এ বিষয়ে ব্যাপক সচেতনমূলক কর্মসূচি চালাতে হবে। চালকদের জন্য চিকিৎসা পরীক্ষা, বীমা, প্রশিক্ষণ ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা দরকার, যাতে তারা পেশাগতভাবে সুরক্ষিত ও দায়িত্বশীল হন। একই সঙ্গে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়ে জিপিএস, মোবাইল পেমেন্ট ও ফ্লিট ম্যানেজমেন্ট ব্যবস্থা চালু করা গেলে এই খাতের স্বচ্ছতা ও দক্ষতা উভয়ই বৃদ্ধি পাবে।

এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা খাতকে একটি নিরাপদ, টেকসই ও দায়িত্বশীল নগর পরিবহন ব্যবস্থায় রূপান্তর করা সম্ভব হবে। অন্যথায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার সংখ্যা অনিয়ন্ত্রিতভাবে বৃদ্ধি পেলে তা অচিরেই রাজধানী ঢাকাসহ দেশের অন্যান্য শহরের ট্রাফিক ব্যবস্থার ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলবে এবং যানজট ও দুর্ঘটনার ঝুঁকির কারণে নাগরিকদের জীবন বিপর্যস্ত করবে।

রানা ভিক্ষু: লেখক, গবেষক ও নীতি বিশ্লেষক
[email protected]

 

আরও পড়ুন

×