ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

ডিবি হেফাজতে সাংবাদিক

ভয়ের সংস্কৃতির অবসান হউক

ভয়ের সংস্কৃতির অবসান হউক
×

সম্পাদকীয়

প্রকাশ: ২২ নভেম্বর ২০২৫ | ০৬:১৯ | আপডেট: ২২ নভেম্বর ২০২৫ | ১২:২১

| প্রিন্ট সংস্করণ

রাজধানীতে মঙ্গলবার মধ্যরাতে সংঘটিত গোয়েন্দা পুলিশ পরিচয়ে এক মোবাইল ফোন ব্যবসায়ী ও এক সাংবাদিককে তুলিয়া লইবার ঘটনা যথেষ্ট উদ্বেগজনক। ভুক্তভোগী সাংবাদিকের সামাজিক মাধ্যমে দেওয়া এ-সংক্রান্ত এক পোস্টের সূত্র ধরিয়া সমকালসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে বুধবার প্রকাশিত খবরে বলা হইয়াছে, পুলিশের ডিটেকটিভ ব্রাঞ্চ-ডিবি কার্যালয়ের গারদে প্রায় ১০ ঘণ্টা হেনস্তার পর সকালে তাঁহাকে বাসায় পৌঁছাইয়া দেওয়া হয়। যদিও ডিবিপ্রধান শফিকুল ইসলাম দাবি করিয়াছেন, ‘তথ্যগত ভুল’-এর কারণে এই ঘটনা ঘটিয়াছে; যাহা বাস্তবতা– সাংবাদিককে তুলিয়া লইবার পরপরই খবরটি সামাজিক মাধ্যমে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। অর্থাৎ ঘটনাকে ডিবিপ্রধান লঘু করিতে সচেষ্ট হইলেও বাস্তবে উহা একটি গুরুতর ঘটনা। শুক্রবার এই বিষয়ে সমকালসহ বিভিন্ন সংবাদামাধ্যমে প্রকাশিত দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা টিআইবির বিবৃতি পাঠ করিলেও তাহা উপলব্ধিযোগ্য। এই ঘটনাকে টিআইবি ‘আইনের শাসন ও মানবাধিকার সুরক্ষার অঙ্গীকার পদদলিত করিবার পদক্ষেপ’ বলিয়া মনে করে। এমনকি ইহাকে ‘নজরদারি ও ভয়ের সংস্কৃতি অব্যাহত রাখিবার দৃষ্টান্ত’রূপেও উল্লেখ করিয়াছে টিআইবি। আমরা জানি, পরোয়ানা ব্যতীত গ্রেপ্তারের ক্ষমতা ফৌজদারি কার্যবিধিতে আছে। বিশেষত কগনিজেব্‌ল কেস অর্থাৎ ধর্তব্য অপরাধের ক্ষেত্রে পুলিশ সন্দেহভাজন যে কোনো ব্যক্তিকে পরোয়ানা ব্যতীত গ্রেপ্তার করিতে পারে। কিন্তু ইহাও আমরা জানি, ২০১৬ সালে এক রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে উচ্চ আদালত এই সকল ক্ষেত্রে সন্দেহের কারণ স্পষ্ট ও লিখিতভাবে উল্লেখ করা সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর জন্য বাধ্যতামূলক বলিয়া ঘোষণা করিয়াছেন। উপরন্তু সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ব্যতীত কোনো নাগরিকের বাসস্থানে মধ্যরাতে পুলিশের অভিযানও গ্রহণযোগ্য নহে। 

প্রসঙ্গত, সম্প্রতি ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার-এনইআইআর চালুর ঘোষণা দিয়াছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন-বিটিআরসি। অন্যদিকে উহার মাধ্যমে মাত্র ৯ জন ব্যবসায়ীকে সুবিধা দিতে সারাদেশে ২৫ সহস্র মোবাইল ফোন ব্যবসায়ীকে পথে বসাইবার চক্রান্ত চলিতেছে বলিয়া অভিযোগ মোবাইল ফোন বিক্রেতাদের একটি সংগঠনের, যাহার নেতা মঙ্গলবার ডিবির হস্তে আটক ব্যবসায়ী। আর উক্ত সাংবাদিক সংগঠনটির পরামর্শক হিসেবে কাজ করেন। মূলত ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে সংগঠনটির বুধবারের সংবাদ সম্মেলন পণ্ড করিতেই ডিবি উক্ত সাংবাদিক ও ব্যবসায়ীকে তুলিয়া লইয়া যায় বলিয়া অভিযোগ রহিয়াছে। এই ক্ষেত্রে নেপথ্যে কলকাঠি নাড়াইবার অভিযোগ উঠিয়াছে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার সংশ্লিষ্ট বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত বিশেষ সহকারীর নামে, যদিও তিনি এ অভিযোগ অস্বীকার করিয়াছেন। তবে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে এহেন স্বজনতোষণ ও উহার সমালোচককে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দ্বারা বা অন্যভাবে হেনস্তার অভিযোগ অতীতে বহুবার উঠিয়াছে। সরকারবিরোধী রাজনৈতিক নেতাকর্মী এবং সচেতন নাগরিকদের বিরুদ্ধেও তখন এহেন অস্বচ্ছ ও জবাবদিহিহীন অভিযান পরিচালিত হইত, যাহা হইতে ভিন্নচিন্তার মানুষ এবং সাংবাদিকরাও নিষ্কৃতি পাইতেন না। ইহার মাধ্যমে সমগ্র সমাজে ভয়ংকর এক নজরদারি ও ভীতির সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করা হইয়াছিল, যাহার অবসান গত বৎসরের ৫ আগস্ট সংঘটিত গণঅভ্যুত্থানেরও অন্যতম লক্ষ্য ছিল। এই কারণেই গোয়েন্দা সংস্থার আলোচ্য স্বেচ্ছাচারমূলক অভিযানটি অন্তর্বর্তী সরকারের ঘোষিত আইনের শাসন ও মানবাধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র সংস্কার প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলিয়া বর্ণনা করিবার অবকাশ থাকিয়া যায়। 

অধিকতর হতাশাজনক, উক্ত ঘটনার রেশ না কাটিতেই শুক্রবার ডিবি হেফাজতে একজনের মৃত্যুর সংবাদ আসিয়াছে। গত ১০ অক্টোবর রাতে ডিবি রাজধানীর বনশ্রী হইতে আরেক সাংবাদিককে তুলিয়া লইয়া গিয়াছিল। বিবিধ প্রকার তকমা লাগাইয়া বিভিন্ন বিরোধী রাজনৈতিক নেতাকর্মীকে তুলিয়া লইবার ঘটনাও ইতোমধ্যে অনেক ঘটিয়াছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এমন অভিযান নাগরিকদের নিরাপত্তা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও আইনি সুরক্ষাকে গুরুতর হুমকির মুখে ফেলিতেছে বলিয়া আমরা মনে করি। এই ঘটনার সহিত সংশ্লিষ্ট সকল সরকারি সংস্থা ও ব্যক্তিকে দ্রুত জবাবদিহির আওতায় আনা প্রয়োজন বলিয়া আমরা মনে করি। তৎসহিত ডিবিসহ দেশের সকল গোয়েন্দা ও নজরদারি সংস্থার আমূল সংস্কারও জরুরি হইয়া পড়িয়াছে।

আরও পড়ুন

×