ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

ভূমিকম্প ঝুঁকি

প্রয়োজন ক্ষয়ক্ষতি হ্রাসের প্রস্তুতি

প্রয়োজন ক্ষয়ক্ষতি হ্রাসের প্রস্তুতি
×

সম্পাদকীয়

প্রকাশ: ২৩ নভেম্বর ২০২৫ | ০৬:২৫ | আপডেট: ২৩ নভেম্বর ২০২৫ | ১২:২৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

শুক্রবার সকাল এবং শনিবার সকাল ও বৈকালে যেই তিনটি ভূমিকম্প বাংলাদেশকে কম্পিত করিয়াছে, সেইগুলি ঢাকা ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলসমূহের জন্য আসন্ন বিপদের সতর্কবার্তা হিসাবে না লইবার কোনও কারণ নাই। ইউএসজিএস তথা মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার তথ্যমতে, যথাক্রমে ৫ দশমিক ৭, ৩ দশমিক ৩ ও ৪ দশমিক ৩ মাত্রাই এই ভূমিকম্পত্রয়ীরই উৎপত্তিস্থল নরসিংদী ও গাজীপুর জিলার সীমান্তরেখা সৃষ্টিকারী শীতলক্ষ্যা নদীখাত। অবশ্য বাংলাদেশের আবহাওয়া অধিদপ্তর জানাইয়াছে, শনিবার সন্ধ্যায় একটি নহে, সেকেন্ডের ব্যবধানে দুইটি ভূমিকম্প ঘটিয়াছে যথাক্রমে ৩ দশমিক ৭ ও ৪ দশমিক ৩ মাত্রার; উভয়টির উৎপত্তিস্থল রাজধানীর বাড্ডা এলাকা। 

উৎপত্তিস্থল, মাত্রা ও সংখ্যা লইয়া দেশীয় ও বৈদেশিক সংস্থা দুইটির তথ্যে পার্থক্য থাকিলেও এই বিষয়ে সন্দেহ নাই যে, এইগুলি ঘটিয়াছে ঘনবসতিপূর্ণ রাজধানীর উপকণ্ঠে। শনিবারের দুইটি কিংবা তিনটি ভূমিকম্পের প্রভাব নগণ্য হইলেও শুক্রবার সকালের ভূমিকম্পটি বৃহত্তর ঢাকা অঞ্চলে নিকট অতীতে অভূতপূর্ব ক্ষয়ক্ষতি করিয়াছে। সমকালসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনমতে ভবনগুলি তীব্র কম্পনে ভবন যেইভাবে দুলিতেছিল, উহা বাসিন্দাদের গভীর আতঙ্কিত করিয়া তুলিয়াছিল। অনেক ভবনে আংশিক ক্ষতি ও ফাটল দৃশ্যমান হইবার পাশাপাশি ঢাকা, নরসিংদী ও নারায়ণগঞ্জে ১০ জন প্রাণ হারাইয়াছেন; তাঁহাদের ৮ জনের মৃত্যু ঘটিয়াছে ঝুলবারান্দা ও প্রাচীর ধসিয়া। ভূমিকম্পের কারণে আহত হইয়াছেন কয়েকশত মানুষ; যাহাদের অনেকেই অপ্রশস্ত সড়কে আতঙ্কিত মানুষের পদপিষ্ট হইয়াছিলেন। 

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভূমিকম্পের মাত্রা ৬ হইলেই প্রাণহানিসহ ক্ষয়ক্ষতির মাত্রাও অধিকতর হইত। অধিকতর শঙ্কার বিষয় হইল, এই কম্পনেই বিপদ শেষ হইয়া যায় নাই। বিশেষজ্ঞরা অদূরভবিষ্যতে আরও বৃহৎ ভূমিকম্পের আশঙ্কা করিতেছেন। শুক্রবারের ভূমিকম্পের কেন্দ্র ছিল নরসিংদীতে; সেইখানে বিদ্যমান ভূতাত্ত্বিক চ্যুতির সক্রিয়তার কারণে। বিশেষজ্ঞরা ইহাও বলিতেছেন, আলোচ্য কম্পন প্রমাণ করে উক্ত সংযোগস্থলে বিপুল শক্তি জমিয়া আছে, যাহা যেই কোনো সময় মুক্ত হইবার পরিস্থিতি সৃষ্টি হইতে পারে। তাহারা মনে করেন, সাধারণত দুই বৃহৎ ভূমিকম্পের মধ্যে সময়ের ব্যবধান থাকে ১০০ বা ১৫০ বৎসর এবং সেই অনুসারে প্রলয়ঙ্করী এক ভূমিকম্প প্রায় নিয়তি হইয়া আছে; কারণ এইখানে সর্বশেষ বিধ্বংসী ভূমিকম্প হইয়াছিল ১৯৩০ সালে। প্রসঙ্গত, সিলেটের সীমান্তঘেঁষা ডাউকি অঞ্চলেও অনুরূপ দুই টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থল বা চ্যুতি রহিয়াছে, ইতোপূর্বে উহাও সক্রিয় বলিয়া প্রমাণিত হইয়াছে। এই দুই স্থল ব্যতীত ভারত ও মিয়ানমারে আরও একাধিক চ্যুতি রহিয়াছে, যেইগুলির সক্রিয়তা ঢাকাসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলকে প্রবল ঝাঁকুনি দিতে পারে। 

ইহা বুঝিতে অবশ্য বিশেষজ্ঞ হইবার প্রয়োজন নাই যে, দেশের অভ্যন্তরে বা পার্শ্ববর্তী এলাকায় বৃহৎ মাত্রার ভূমিকম্পে সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্ত হইবে ঢাকা, অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে। নগরবিদরা বলিতেছেন, এইখানকার ৯৫ শতাংশ অবকাঠামো অপরিকল্পিত; এমনকি সরকারি ভবনও ইমারত নির্মাণ বিধিমালা অনুসরণ করে নাই। এই নগরীতে পর্যাপ্ত উন্মুক্ত স্থান বা খেলার মাঠও নাই। এই পরিস্থিতিতে ভূমিকম্পের সময় যেই সড়ক নিরাপদ আশ্রয় হইতে পারিত, সেইগুলিরও অধিকাংশই অপরিসর এবং উভয়পার্শ্বে বহুতল ভবনবেষ্টিত। গ্যাস, বিদ্যুৎসহ বিভিন্ন পরিষেবার লাইনগুলিও এমনভাবে স্থাপিত, সেইগুলিকে ‘সুপ্ত বোমা’ আখ্যা দিলে অত্যুক্তি হইবে না। অন্যদিকে বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ের ন্যায় দুর্যোগ মোকাবিলায় বাংলাদেশ যতখানি আগাইয়া রহিয়াছে, ভূমিকম্পের ন্যায় দুর্যোগ মোকাবিলায় ততখানিই রহিয়াছে পিছাইয়া। যেই কারণে সম্ভাব্য দুর্যোগকালে উদ্ধার প্রক্রিয়া কীরূপ দাঁড়াইবে, সহজেই অনুমেয়।

আমরা মনে করি, স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করা প্রয়োজন দ্রুত। এখনই সময় বিশেষজ্ঞদের বহুল উচ্চারিত পরামর্শমতো ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি হ্রাসে সর্বোচ্চ প্রস্তুতি গ্রহণ করিতে হইবে। জনসচেতনতা গড়িয়া তুলিতে ভূমিকম্পকালে করণীয় লইয়া নিয়মিত মহড়াও জরুরি হইয়া পড়িয়াছে। আর প্রয়োজন কর্তৃপক্ষের নিদ্রাভঙ্গ। বিপদ আসন্ন জানিয়াও নির্বিকার থাকিবার ন্যায় আত্মঘাতী প্রবণতা আর কিছু হইতে পারে না। ভূমিকম্প আমরা ঠেকাইতে পারিব না; কিন্তু ক্ষয়ক্ষতি হ্রাসের প্রস্তুতি প্রয়োজন।

আরও পড়ুন

×