ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

রাজনীতি

দলবদলের পুরোনো খেলা

দলবদলের পুরোনো খেলা
×

মোশতাক আহমেদ

মোশতাক আহমেদ

প্রকাশ: ২৩ নভেম্বর ২০২৫ | ০৬:৩০ | আপডেট: ২৩ নভেম্বর ২০২৫ | ১১:৪৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

যদিও এখনও কোনো সুনির্দিষ্ট তারিখ ঘোষিত হয়নি, তবুও ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন ঘিরে প্রায় সর্বত্রই বিভিন্ন দলের তৎপরতা শুরু হয়ে গেছে। সেই সঙ্গে বিভিন্ন স্থানে দলবদলেরও ঘটনা ঘটছে। গত ১৫ অক্টোবর সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায় স্থানীয় জামায়াত নেতা মো. আনোয়ার হোসেনের নেতৃত্বে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর অন্তত ৩০ নেতাকর্মী বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন (বাংলা নিউজ২৪, ১৫ নভেম্বর)। এর আগে ১৩ নভেম্বর ভোলার বোরহানউদ্দিন উপজেলায় একই দলের ৩০ নেতাকর্মী ভোলা-২ আসনে বিএনপি মনোনীত সংসদ সদস্য প্রার্থী হাফিজ ইব্রাহীমের হাতে ফুল দিয়ে বিএনপিতে যোগদান করেছেন (কালের কণ্ঠ, ১৩ নভেম্বর)। 

ঠিক উল্টোটা ঘটেছে মৌলভীবাজার আর নেত্রকোনায়। ৭ নভেম্বর মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার বর্ণি ইউনিয়নে বিএনপির ৩০ নেতাকর্মী জামায়াতে ইসলামীতে যোগ দিয়েছেন (দেশ রূপান্তর, ৮ নভেম্বর)। ২০ সেপ্টেম্বর নেত্রকোনার আমতলা ইউনিয়নে জেলা ছাত্রদলের সাবেক সদস্য সাইদুর রহমানের নেতৃত্বে বিএনপির অর্ধশত নেতাকর্মীও আনুষ্ঠানিকভাবে জামায়াতে ইসলামীতে যোগ দেন। এ সময় তাদের ফুল দিয়ে বরণ করে নেন জামায়াতে ইসলামীর নেত্রকোনা-২ আসনের প্রার্থী মাওলানা এনামুল হক (আজকের পত্রিকা, ২০ সেপ্টেম্বর)।

উল্লিখিত আনুষ্ঠানিক দলবদলের বাইরেও যে অনানুষ্ঠানিকভাবে দল বদল হচ্ছে, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। ঘটনার ঘনঘটায় সব খবর সংবাদমাধ্যমে জায়গাও পায় না।  

বহুদলীয় গণতন্ত্রে দলবদল অস্বাভাবিক কিছু নয়। তবে বাংলাদেশে নির্বাচন এলেই যেভাবে দলবদলের হিড়িক পড়ে, তা স্বাভাবিক নয়। অতীতে, বিশেষ করে স্বাধীনতার আগে, দল থেকে নতুন দলের জন্ম হয়েছে, দলবদলের ঘটনাও ঘটেছে, তবে হিড়িক পড়েনি। পাকিস্তান আমলের গোড়ার দিকে ‘মুসলিম লীগ থেকে বেরিয়ে গিয়ে আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠন করেছিলেন মওলানা ভাসানী ও তাঁর অনুসারীরা। সেই আওয়ামী লীগ যখন কেন্দ্রে ও পূর্ব বাংলায় ক্ষমতায়, তখন আওয়ামী লীগ ত্যাগ করে ভাসানী ও বামপন্থিরা গঠন করেন ১৯৫৭-তে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ)। শেখ মুজিব ভাসানীকে কতভাবে অনুরোধ করেছেন দল ছেড়ে না যেতে। মওলানা বলেছেন, ‘দ্যাখো, এটা আদর্শগত ব্যাপার। তোমরা তোমাদের মতো থাকো, আমরা আমাদের মতো রাজনীতি করি’ (সৈয়দ আবুল মকসুদ, প্রথম আলো, ১৪ জুলাই, ২০১৫)।

সে সময়ে যারা রাজনীতি করতেন, তাদের বেশির ভাগ মানুষের জন্যই রাজনীতি করতেন। রাজনীতি তখন জীবিকার বিষয় ছিল না। বর্তমানে অধিকাংশের কাছেই রাজনীতি হয়ে গেছে অর্থ উপার্জনের উপায়। ফলে বেশি বেতনের জন্য মানুষ যেমন পছন্দের প্রতিষ্ঠান ছেড়ে যায়, এমনকি প্রিয় পেশাও বদল করে; তেমনি ওই রাজনীতিকেরাও অবলীলায় দল ছেড়ে যান, যোগ দেন এমনকি বিপরীত আদর্শেরও দলে। এদের বলা যায় রাজনীতিজীবী। প্রত্যন্ত গ্রামের একজন সাধারণ কর্মী থেকে কেন্দ্রের ডাকসাইটে নেতা, সবারই কাছে এখন রাজনীতি জীবিকা বা ব্যবসা। যে দল মুনাফার নিশ্চয়তা দেবে তারা সেই দলেই যান।
বাংলাদেশে রাজনীতি ব্যবসা বা উপার্জনের মাধ্যম হয়ে ওঠার ইতিহাস বেশি দিনের নয়। মূলত সামরিক শাসনামলেই রাজনীতির এ অধঃপতন গতি পায়। দুই দফার সামরিক শাসনেই সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্রের ছত্রছায়ায় চলে রাজনীতিবিদদের কেনাবেচা আর দলবদলের খেলা। তখন টেলিভিশনে প্রায় প্রতিদিনই অন্য দলের নেতাদের ক্ষমতাসীন দলে যোগদানের সংবাদ ফলাও করে প্রচার করা হতো।

প্রসঙ্গক্রমে এখানে কয়েকজনের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন ছিলেন একসময় আওয়ামী লীগের ডাকসাইটে নেতা। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট-পরবর্তী খন্দকার মোশতাক সরকারের মন্ত্রী হয়েছিলেন, ছিলেন মোশতাকের দল ডেমোক্রেটিক লীগের নেতা। লাঙ্গলের হাল ধরে সামরিক শাসক এরশাদের মন্ত্রী হয়েছিলেন। শেষ জীবনে বিএনপিতে থিতু হন। সারাজীবন বাম রাজনীতি করা ক্যাপ্টেন (অব.) আব্দুল হালিম ন্যাপ, ইউনাইটেড পিপলস পার্টি হয়ে জিয়াউর রহমান ও আবদুস সাত্তারের মন্ত্রী হন। এরশাদের মন্ত্রী থাকাকালেই মৃত্যুবরণ করেন। মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সমন্বয়ক ও স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের উপস্থাপক ও স্বাক্ষরকারী প্রফেসর ইউসুফ আলী আওয়ামী লীগ সরকারের মন্ত্রী হয়েছেন। বিশ্বস্ত এ আওয়ামী লীগারও দলবদলের চরকায় চড়ে খন্দকার মোশতাক, জিয়াউর রহমান, আবদুস সাত্তার এবং সব শেষে এরশাদের মন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। এমন আরও অনেকেই আছেন। তালিকা লম্বা করে পাঠকের বিরক্তি উৎপাদন করতে চাই না।

দুর্ভাগ্যজনক হলো, সামরিক শাসনামলের সেই রাজনীতিকদের কেনাবেচা পরবর্তী গণতান্ত্রিক আমলেও থামেনি। এরশাদ-পরবর্তী ৩৪ বছরে বিএনপি, আওয়ামী লীগ পালাক্রমে দেশ শাসন করেছে। এই দুই আমলে দলবদলের খেলা আরও বেশি পোক্ত হয়েছে। ২০১৫ সালের ১১ জুলাই দৈনিক প্রথম আলোয় প্রকাশিত এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর ২০১৫-এর জুন পর্যন্ত বিএনপি-জামায়াতের ১৯ হাজারের বেশি নেতাকর্মী আওয়ামী লীগে যোগদান করেছিলেন। এই সময়ে দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় এ ধরনের যোগদানের ঘটনা ঘটেছে অন্তত ৬২টি। স্থানীয় পর্যায়ে নির্বাচিত হওয়া বা টিকে থাকা, মামলা থেকে রক্ষা পাওয়া, টেন্ডার বাণিজ্য, ঠিকাদারি,  বাসস্ট্যান্ড,  টেম্পো স্ট্যান্ডের দখল, নির্বিঘ্নে ব্যবসা-বাণিজ্য চালিয়ে যাওয়া, পুলিশের ধাওয়া থেকে সুরক্ষা, আত্মীয়স্বজনের চাকরির সুযোগ–এসবের মোহেই মূলত দলবদলের খেলা চলে। সাড়ে তিন দশক ধরে এমনটিই চলে আসছে। উল্লেখ্য, এই সময়কালে এ দেশের রাজনীতি আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি–এ দুটো বৃত্তেই ঘুরপাক খেয়েছে। সে কারণেই নির্বাচন এলে রাজনীতিকদের কেউ আওয়ামী লীগে, কেউ বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জিতবে, না বিএনপি–স্থানীয়ভাবে হিসাবনিকাশ করেই তারা দল বেছে নিতেন।

এখন মাঠে আওয়ামী লীগ নেই। এসেছে নতুন শক্তি জামায়াত। এখনকার হিসাবটা তাই বিএনপি-জামায়াতকে ঘিরেই আবর্তিত হচ্ছে। তাই তো দলবদলের খেলায় এই দুটি দলই প্রথম বিবেচনায়। ভবিষ্যতে নতুন কোনো শক্তির উত্থান ঘটলে তারাও হয়তো বিবেচনায় আসবে। তবে যতদিন রাজনীতিকে রাজনীতিজীবীদের হাত থেকে মুক্ত করা না যাবে ততদিনই এই দলবদলের খেলা চলবে। সেই সময় কবে আসবে কিংবা আদৌ আসবে কিনা, তা বলা যায় না; যদিও সাম্প্রতিক গণঅভ্যুত্থানের প্রতিশ্রুতি ছিল ওই খেলা বন্ধের।

মোশতাক আহমেদ: সাবেক জাতিসংঘ কর্মকর্তা ও কলাম লেখক

আরও পড়ুন

×