আন্তর্জাতিক
মেক্সিকোর ‘জেন-জি’ আন্দোলন সফল হবে?
মঞ্জুরে খোদা
প্রকাশ: ২৪ নভেম্বর ২০২৫ | ০৯:২৮
কার্লোস মানজো রদ্রিগেজ ছিলেন মেক্সিকো মিচোয়াকান রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ শহর উরুপনের জনপ্রিয় মেয়র। তিনি স্থানীয় পর্যায়ে সংঘবদ্ধ মাদক চক্রের বিরুদ্ধে সাহসিকতার সঙ্গে তাদের তৎপরতা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চালান। মাদকের বিরুদ্ধে তাঁর এই দৃঢ় অবস্থানের কারণে সংঘবদ্ধ মাদক চক্রের সদস্যরা ১ নভেম্বর তাঁকে প্রকাশ্যে একটি স্থানীয় অনুষ্ঠানে গুলি করে হত্যা করে। এই সন্ত্রাসী তৎপরতায় দেশব্যাপী অসন্তোষ তৈরি হয় ও জননিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
নভেম্বরে নিহত মেয়রের ইস্যুকে ব্যবহার করে বিক্ষোভের সূত্রপাত। জেন-জিদের অংশগ্রহণে অহিংস এ আন্দোলন শুরু হলেও দুই সপ্তাহের মাথায় তা আর নিরীহ চেহারায় থাকেনি। বিক্ষোভকারীরা পাথর ছুড়ে, আতশবাজির মাধ্যমে, লাঠি, শিকল দিয়ে পুলিশের ঢালসহ অন্যান্য সরঞ্জাম কেড়ে নিয়ে তাদের ওপর আক্রমণ করে। প্রেসিডেন্ট ভবনে হামলা করে ১২০ জনকে আহত করে, যার অধিকাংশই পুলিশ।
জেন-জি কী চায়? তাদের দাবি কী?
(১) তারা মেয়র কার্লোস হত্যার বিচার ও অপরাধ দমনে সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ দেখতে চায়। (২) দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার বন্ধ চায়। (৩) অপরাধীদের শাস্তি না হওয়ার জন্য বিচার ব্যবস্থার সংস্কার চায়। প্রেসিডেন্ট শেইনবাউম মেক্সিকোর জেন-জি বিক্ষোভে মার্কিনের ট্রাম্প প্রশাসনের ইন্ধন ও উস্কানিকেও দায়ী করেছেন। তিনি মনে করিয়ে দেন, ট্রাম্প প্রশাসন এর আগেও একাধিকবার মেক্সিকোতে মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপের কথা বলেছেন।
মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লাউদিয়া শেইনবাউম ‘জাতীয় পুনর্জাগরণ আন্দোলন’-এর প্রধান নেতা। এই দল মেক্সিকোর একটি শক্তিশালী বামপন্থি রাজনৈতিক দল। ২০২৪ সালে শেইনবাউম দেশটির প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়ী হয়ে নেতৃত্বে চলে আসেন। জনমুখী রাজনীতি ও জনপ্রিয়তার মাধ্যমে ২০১৮ থেকে এ দলটি দেশ পরিচালনা করছে।
জাতীয় পুনর্জাগরণ আন্দোলনের মূলনীতি হচ্ছে সমাজতন্ত্র, মেক্সিকান জাতীয়তাবাদী, সামাজিক ন্যায়বিচার ও কল্যাণনীতি। যাদের কর্মসূচি হচ্ছে রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ভূমিকা বৃদ্ধি, দারিদ্র্য হ্রাস, সামাজিক পেনশন, জ্বালানি খাতে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ, দুর্নীতিবিরোধী সংস্কার। বর্তমান প্রেসিডেন্ট শেইনবাউম তাঁর পূর্বসূরি আন্দ্রে ম্যানুয়েলকে অনুসরণ করে দেশটির দারিদ্র্য বিমোচনের যে গতি-বাস্তবতা তৈরি করেছেন, তা কেবল চীন বা ভিয়েতনামের সঙ্গে তুলনীয় বলে উন্নয়ন গবেষকরা মনে করেন।
২০১৮ সাল থেকে টানা ৬ বছরের শাসনকালে তাদের কার্যক্রমের একটি তালিকা দিলে বোঝা যাবে, তারা দেশটিতে কী ধরনের অর্থনৈতিক, সামাজিক উন্নয়ন ও রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটিয়েছে।
(১) গত ছয় বছরে শ্রমিকের ন্যূনতম মজুরি তিন গুণ করে দৈনিক পাঁচ ডলার থেকে ১৫ ডলার করেছেন। বর্তমান প্রেসিডেন্ট শেইনবাউম তার পরিমাণ বাড়িয়ে আবারও তা দ্বিগুণ করার কথা বলছেন।
(২) ১০ লাখ বাড়ি নির্মাণ ও স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য বিনা সুদে গৃহঋণ দেওয়ার পরিকল্পনা করছেন।
(৩) তেল, বিদ্যুৎ ও রেলওয়েকে পুনরায় সরকারি নিয়ন্ত্রণে এনেছেন। এসব খাতকে পুরোপুরি জাতীয়করণ না করলেও সরকার এসব প্রতিষ্ঠানের অধিক শেয়ারের অধিকারী।
(৪) মেক্সিকোর ৫০ শীর্ষ ধনীর কাছ থেকে বকেয়া কর আদায়ে উদ্যোগী হয়েছেন।
(৫) নাগরিকদের কর্মঘণ্টা ৪৮ ঘণ্টা থেকে কমিয়ে ৪০ ঘণ্টা করার চেষ্টা করছেন।
(৬) প্রেসিডেন্ট শেইনবাউম ট্রিকল-আপ অর্থনীতিতে বিশ্বাসী। ট্রিকল-আপ ইকোনমিক্স হলো এমন এক অর্থনৈতিক দর্শন যেখানে উন্নয়ন নিচের দিক (গরিব, শ্রমজীবী, নিম্ন-মধ্যবিত্ত) থেকে ওপরের দিকে ছড়িয়ে পড়ে। সরকার ও নীতিনির্ধারকরা নিম্ন আয়ের মানুষদের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ান। এতে চাহিদা, উৎপাদন, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও অর্থনীতি সামগ্রিকভাবে প্রসারিত হয়।
মেক্সিকোর এই আর্থসামাজিক পরিবর্তন ও মাত্রাতিরিক্ত বামঘেঁষা নীতি পুঁজিবাদ ও উদারনীতির সমর্থক-রক্ষক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের মতাদর্শের অনুসারী সে দেশীয় রাজনীতিক, ব্যবসায়ীদের খুশি করতে পারেনি। সে কারণে তারা নির্বাচিত জনপ্রিয় বাম সরকারকে বৈধভাবে ক্ষমতা থেকে সরাতে না পেরে অগণতান্ত্রিক পথের সন্ধান করছেন।
পশ্চিমা প্রচার মাধ্যম এমনভাবে প্রচার করছে, যেন মেক্সিকোতে এক জনবিরোধী, দুর্নীতিবাজ সরকার ক্ষমতায়। স্নায়ুযুদ্ধকালে লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশে মেক্সিকোর মতো এমন প্রগতিশীল অর্থনৈতিক ধারা চালু করার কারণে অনেক নেতাকে যুক্তরাষ্ট্র ক্ষমতা থেকে উৎখাত করে তাদের পছন্দের শাসক বসিয়েছে। জেন-জির নামে চলা মেক্সিকোর সরকারবিরোধী বিক্ষোভ আমেরিকার সেসব অতীত স্মৃতির কথাই মনে করিয়ে দেয়। কিন্তু মার্কিন গোয়েন্দপ্রধান তুলসী গ্যাবার্ড যে বললেন, ট্রাম্প প্রশাসন দশকের পর দশক ধরে চলা দেশে দেশে রেজিম চেঞ্জের ধারা থেকে তারা বেরিয়ে এসেছে– সেটা কি তাহলে কথার কথা?
মঞ্জুরে খোদা: লেখক-গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
- বিষয় :
- আন্তর্জাতিক
- মেক্সিকো
- বিক্ষোভ
