ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

সাদা কালো

এনসিপির নতুন জোটের সম্ভাবনা কতটুকু

এনসিপির নতুন জোটের সম্ভাবনা কতটুকু
×

সাইফুর রহমান তপন

সাইফুর রহমান তপন

প্রকাশ: ২৭ নভেম্বর ২০২৫ | ০৬:৩৬ | আপডেট: ২৭ নভেম্বর ২০২৫ | ১০:০৬

| প্রিন্ট সংস্করণ

জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ‘আগামী কয়েকদিনের মধ্যে’ নতুন রাজনৈতিক জোটের ঘোষণা দিতে যাচ্ছে জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপি; বুধবার সমকালের এক প্রতিবেদনে এমনই লেখা হয়েছে। এনসিপির সঙ্গে এ জোটে থাকছে আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টি, রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন ও ইউনাইটেড পিপলস (আপ) বাংলাদেশ। নুরুল হক নুরের গণঅধিকার পরিষদও থাকতে পারে। প্রশ্ন উঠেছে, জাতীয় নির্বাচনের মাত্র আড়াই মাস আগে এই রাজনৈতিক জোট গঠনের ঘোষণা ভোটের মাঠে কতটা প্রভাব ফেলবে?

জুলাই অভ্যুত্থানের পরে গঠিত এনসিপি রাজনীতির মাঠে নিজের অবস্থান শক্ত করতে আগেও নানা কৌশল ও পদক্ষেপ নিয়েছে। প্রথমদিকে বিএনপির দিকে এনসিপি নেতাদের একের পর এক তোপ দাগতে দেখে অনেকেই ধারণা করেছিলেন, পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নিজের অবস্থান পোক্ত করতে জামায়াতে ইসলামীই এসবের পেছনে। তখন এনসিপির বিভিন্ন কর্মসূচিতে বিশেষত জনসমাগম ঘটাতে জামায়াত ও তার ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবিরের উদ্যোগ ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। জামায়াত ছাড়াও হেফাজতে ইসলাম ও ইসলামী আন্দোলনের কেন্দ্রীয় কর্মসূচিতে এনসিপি নেতাদের বক্তব্যও তখন জনপরিসরে আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। এপ্রিলে লন্ডনে প্রধান উপদেষ্টা ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের মধ্যে বৈঠকে জাতীয় নির্বাচনের সময় আগামী ফেব্রুয়ারিতে নির্ধারিত হওয়ার পর এনসিপি-জামায়াত-ইসলামী আন্দোলনের একাট্টা বিরোধিতাও ছিল লক্ষণীয়।

কিছুদিনের মধ্যে সরকার ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধেই নির্বাচন অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত ঘোষণা করলে, একই সঙ্গে জুলাই সনদ নিয়ে ঐকমত্যের আলোচনাও বেশ গতি পেলে এনসিপি নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। তখন সংবাদমাধ্যমে বিএনপির কাছে জামায়াত ও এনসিপি– কে কয়টি আসন চেয়েছে, এর পরিপ্রেক্ষিতে বিএনপি কী উত্তর দিয়েছে, সে আলোচনাও স্থান পায়। এমনও তথ্য তখন সংবাদমাধ্যমে এসেছিল, বিশেষত রাজনীতির মাঠ থেকে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগের নির্বাসন স্থায়ী করতে বিএনপি তার প্রস্তাবিত নির্বাচন-পরবর্তী জাতীয় সরকারে জামায়াত ও এনসিপিকে চায়। তাই দলগুলোর মধ্যে ওই সম্ভাব্য জাতীয় সরকারের মন্ত্রী পদের ভাগাভাগি নিয়েও আলোচনা চলে।

এ আলোচনার মধ্যেই মাস দুয়েক আগে শোনা গেল, এনসিপি ও গণঅধিকার পরিষদ নিজেরা একীভূতকরণের চূড়ান্ত পর্যায়ে আছে। এ খবর গুরুত্ব পেল এ কারণে যে, এনসিপির শীর্ষ নেতাদের অনেকেই একসময় বিশেষত ২০১৮ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলনে নুরের ‘শিষ্য’ ছিলেন। কিন্তু সে উদ্যোগ সফল হয়নি। গণঅধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খান তখন বলেছিলেন, একীভূত দলের নেতা হতে হবে নুরুল হক নুরকে; এনসিপির নাহিদ ইসলাম নয়। সম্ভবত নেতৃত্ব নিয়ে এ বিবাদেই ওই একীভূতকরণ আলোচনা ভেস্তে যায়।

প্রসঙ্গত, গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক এনসিপির সঙ্গে জোট নিয়ে আশাবাদী হলেও রাশেদ খান আগের মতোই এ নিয়ে সংশয়গ্রস্ত। গত সোমবার প্রকাশিত বিবিসির এক প্রতিবেদন বলছে, নুরুল হক নুর জোট গঠনের এই আলোচনায় নিজের দলের ইতিবাচক অবস্থানের কথা জানিয়ে তাদের বলেছেন, ‘গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপট যদি দেখেন কোনো প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বে তা হয়নি। একেবারেই বিচ্ছিন্নভাবে কিছু তরুণ, যারা সংগ্রাম করেছে বিভিন্ন ক্যাম্পাসে বা জেলা শহরে, তাদের ডাকেই একটা ম্যাস মুভমেন্ট হয়েছে। গণঅভ্যুত্থানের একটা পরিষ্কার ঘোষণা ছিল যে, আমরা একটা নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত গঠনের মাধ্যমেই আগামীর বাংলাদেশ গড়তে চাই।’ 

অন্যদিকে রাশেদ খান সমকালকে (২৬ নভেম্বর) বলেছেন, ‘এনসিপির সঙ্গে একীভূতকরণের আলোচনা আগেই ভেস্তে গেছে। জোট হবেই, তা বলা যাচ্ছে না। গণঅধিকার ২০২২ সাল থেকে বিএনপির সঙ্গে আছে। আর এনসিপির নেতৃত্বে জোট হবে না। যৌথ নেতৃত্বে কিছু করা যায় কিনা, আলোচনা চলছে।’ 
সমকালের ওই প্রতিবেদনেই বলা হয়েছে, আসন্ন নির্বাচনে বিএনপির কাছে অন্তত চারটি আসন চেয়েছে নুরের দল। তবে বিএনপি এখন পর্যন্ত দুটি নিশ্চিত করেছে। একটি নুরের পটুয়াখালী-৩ আসন, যেখানে বিএনপি নেতা হাসান মামুনও প্রার্থী হতে চান। এ নিয়ে তাঁর সমর্থকদের হাতে আক্রান্ত হয়েছেন নুরের সমর্থকরা। অন্যটি রাশেদ খানের ঝিনাইদহ-২ আসন, যেখানে বিদ্রোহী প্রার্থী নেই। এ কারণে রাশেদ খান বিএনপির জোট ছাড়তে রাজি নন। 

এখানে বিএনপির সঙ্গে ৩১ দফাভিত্তিক যুগপৎ আন্দোলনে থাকা গণতন্ত্র মঞ্চের অন্যতম শরিক রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের কথাও বলা যায়। গত রোববার দলটি গণতন্ত্র মঞ্চ ছেড়েছে। বিবিসির ভাষ্য অনুসারে, নভেম্বর মাসের শুরুতেই রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের আহ্বানে তাদের কার্যালয়ে কয়েকটি রাজনৈতিক দল এক বৈঠক করে। দলটির এ জোট পরিবর্তনেরও পেছনে নাকি আসন নিয়ে বিএনপির সঙ্গে মন কষাকষি।

এ প্রেক্ষাপটে বলা যায়, নতুন জোট গঠনের পেছনে এনসিপি, গণঅধিকার পরিষদ ও রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের উদ্দেশ্য নির্বাচনী লড়াইয়ে প্রাসঙ্গিক থাকার চেষ্টা। সমকালের প্রতিবেদনও বলছে, সম্ভাব্য শরিক দলগুলো জানিয়েছে, নতুন জোটটি হবে নির্বাচনী; আদর্শিক নয়। উপরন্তু এ জোট বিএনপি বা জামায়াতের সঙ্গে নির্বাচনী সমঝোতা করতে পারে। এ ছাড়া তাদের উপায়ও নেই। কারণ হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সেই বিখ্যাত শূন্য তত্ত্ব অনুসারে বিশেষ করে ভোটের মাঠে এখানে কেবল চার বা পাঁচ শূন্যই যোগ হবে।

প্রস্তাবিত এ জোট যে আদর্শিক নয়; তা সাদা চোখেও বলা যায়। এনসিপি নিজেকে মধ্যপন্থি দল দাবি করলেও তার নেতাদের কেউ বিএনপিপন্থি বা জামায়াতপন্থি বলে পরিচিত। রোববার সমকালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এনসিপির প্রকৃত নীতিনির্ধারক বলে পরিচিত ছাত্র উপদেষ্টারা চান দলটি আগামী নির্বাচন সামনে রেখে বিএনপির সঙ্গে জোট করুক। তবে এনসিপির শীর্ষ নেতৃত্বসহ অধিকাংশ নেতা অন্তত ২০টি আসন এবং নির্বাচনের মাঠে সাংগঠনিক সহায়তার পাশাপাশি বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী না থাকার নিশ্চয়তা না পেলে এ ঐক্যে রাজি নন। বিকল্প হিসেবে তারা জামায়াতের সঙ্গে বিএনপিবিরোধী বৃহত্তর নির্বাচনী সমঝোতায় যেতে চান। ইতোমধ্যে মব সহিংসতাসহ উগ্রপন্থিদের নানা কর্মকাণ্ডে এনসিপি ন্যূনতম ক্ষোভও প্রকাশ করেনি। এতেও তাদের ঝোঁক যে ডানপন্থার দিকে, সেটা বোঝা যায়। প্রস্তাবিত জোটের সম্ভাব্য দুই শরিক জামায়াত ও শিবিরের সাবেক নেতাদের সমন্বয়ে গঠিত এবি পার্টি এবং আপ বাংলাদেশ ডানপন্থি হিসেবেই পরিচিতি পেয়েছে। অন্যদিকে, শীর্ষ নেতাসহ রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের অনেক নেতাকর্মী এসেছেন বামপন্থা থেকে। এ অবস্থায় আদর্শিক জোট করতে চাইলেও দলগুলো তাতে সফল হবে না।

এমনকি এ ধরনের পরস্পরবিরোধী চিন্তা এবং নিজেদের মধ্যে দুর্বল বোঝাপড়া দিয়ে তাদের ভাষায়, জুলাইয়ের স্পিরিট এবং গণঅভ্যুত্থানের পেছনে রাষ্ট্র সংস্কারের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে একটা প্রেশার গ্রুপ হয়ে ওঠাও তাদের জন্য দুরূহ হতে পারে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে এনসিপি একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হওয়ার পরও তা বলা যায়।

রাজনীতিতে ন্যারেটিভ বা বয়ান খুব গুরুত্বপূর্ণ। গণঅভ্যুত্থানের এত বড় ধাক্কা খাওয়ার পরও আওয়ামী লীগ যে রাজনীতিতে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যায়নি, তার কারণ তাদের মুক্তিযুদ্ধপন্থি বয়ান। আবার কাছাকাছি বয়ানের কারণে বিএনপির দীর্ঘদিনের ভোট ব্যাংকে ভাগ বসাচ্ছে জামায়াত। এ দলগুলোর বাইরে নতুন কোনো বয়ান এনসিপি বা তার সম্ভাব্য জোটসঙ্গীরা তৈরি করতে না পারায় ভোটের ময়দানে তো বটেই, আন্দোলনেও তাদের সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়েই থাকছে।

সাইফুর রহমান তপন: সহকারী সম্পাদক, সমকাল

আরও পড়ুন

×