শ্রদ্ধাঞ্জলি
নীতিনিষ্ঠ মার্ক্সবাদী দাউদ হোসেন
আবুল খায়ের
আবুল খায়ের
প্রকাশ: ২৯ নভেম্বর ২০২৫ | ০৬:৩১
| প্রিন্ট সংস্করণ
সশস্ত্র যুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা ও স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের কর্মসূচি বাস্তবায়নে আত্মনিবেদিত কমরেড দাউদ হোসেন ২১ নভেম্বর বেলা ১১টায় চিরবিদায় নিয়েছেন। তাঁর অমর স্মৃতির প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।
১৯৪৪ সালের ২ মার্চ যশোর জেলার ঝিকরগাছা উপজেলার বায়সা গ্রামে এক কৃষক পরিবারে তাঁর জন্ম। ’৬২তে যশোরের মাইকেল মধুসূদন কলেজে উচ্চ মাধ্যমিকে অধ্যয়নকালে ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতিতে হাতেখড়ি। এ বছরেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ্যা (অনার্স) বিভাগে ভর্তি। এ সময়েই স্বাধীন পূর্ব বাংলা প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখার শুরু। ১৯৬৩-৬৪তে রবীন্দ্রচর্চা নিষিদ্ধের প্রতিবাদে গড়ে ওঠা আন্দোলন ও সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী সংগ্রামে সক্রিয় অংশগ্রহণ। ’৬৫তে পাকিস্তানের নাগপাশ থেকে পরিপূর্ণ স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে সমমনাদের নিয়ে পূর্ববাংলা জাতীয় মুক্তি সংস্থা (জামুস) গঠন। এ কারণে ডিফেন্স রুলস অব পাকিস্তান তথা পাকিস্তান দেশরক্ষা আইনানুযায়ী মাথার ওপর সামরিক সরকারের হুলিয়া থাকায় পড়ালেখায় ব্যাঘাত ঘটে। ১৯৬৭তে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থবিদ্যায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।
মুক্তিযুদ্ধের ড্রেস রিহার্সাল খ্যাত ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানে জামুস সদস্যরা দাউদ হোসেনের নেতৃত্বে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন এবং ছয় দফা ও এগারো দফার সমর্থনে কৃষক সমিতির মাধ্যমে নিজ নিজ এলাকায় জনমত গঠন করেন। ’৭০-এ মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানীর ‘ভোটের আগে ভাত চাই’ দাবির তীব্র বিরোধিতা করেন এবং জাতীয় মুক্তির ম্যান্ডেট প্রশ্নে ’৭০-এর নির্বাচনের ঐতিহাসিক গুরুত্ব তুলে ধরে আসন্ন নির্বাচনে অংশগ্রহণে নিজ অবস্থান তুলে ধরেন। তিনি ছয় দফা ও ১১ দফার পক্ষে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীককে বিজয়ী করার লক্ষ্যে নিজ এলাকায় অনন্য ভূমিকা পালন করেন।
’৭১-এ মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে কলকাতায় বাংলাদেশ জাতীয় মুক্তিসংগ্রাম সমন্বয় কমিটি গড়ে তুলতে অন্যতম সংগঠকের ভূমিকা পালন করেন। ’৭২-এ ‘বাংলাদেশ কমিউনিস্ট কর্মী সংঘ’ আত্মপ্রকাশ করে। সংঘের প্রয়োজনে তিনি নিজ গ্রামে বসবাস শুরু করেন এবং পেশা হিসেবে অবলম্বন করেন কৃষিকাজকে, যাতে নিয়োজিত থাকেন দীর্ঘ ১৪ বছর। এ সময় শিক্ষা বিস্তারের লক্ষ্যে নিজ গ্রামে প্রতিষ্ঠা করেন একটি হাই স্কুল।
’৮৪তে কমিউনিস্ট আন্দোলনে ক্রিয়াশীল পার্টিগুলোর তাত্ত্বিক দেউলিয়াত্ব তুলে ধরতে মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদে গভীরভাবে আস্থাশীল থেকে সূচনা করেন লাগাতার ধারাবাহিক মতাদর্শিক সংগ্রাম। এ সংগ্রামকে কার্যকরের লক্ষ্যে পৌঁছে দিতে ঢাকায় চলে আসেন। ১৯৮৬-৮৮তে লেনিনের ইতোপূর্বে মস্কো, কলকাতা বা এ দেশ থেকে বঙ্গানুবাদ হয়নি, এমন বইগুলো অনুবাদ ও প্রকাশ শুরু করেন।
বিভিন্ন কমিউনিস্ট দল-উপদল থেকে বেরিয়ে আসা স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় রাজনৈতিক কর্মীরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রে নিয়মিত পাঠচক্র করে। এসব পাঠচক্রের মধ্যে ছিল ‘মার্ক্সবাদ চর্চাকেন্দ্র’, ‘মার্ক্সবাদ অনুশীলন সমিতি’ ও ‘পর্যালোচনা পরিষদ’। দাউদ হোসেন অনূদিত ও প্রকাশিত লেনিনের গ্রন্থগুলো পাঠ করে নিয়মিত পাঠচক্রে অংশগ্রহণকারী কর্মীরা উদ্বুদ্ধ হয়ে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করে কমিউনিস্ট কর্মী সংঘের অংশগ্রহণে পাঠচক্রগুলোর সমন্বয়ে গড়ে তোলে যৌথ পাঠচক্র। এর ধারাবাহিকতায় ওই পাঠচক্রগুলো ’৮৯-এর ১ ডিসেম্বর যৌথ ঘোষণা প্রকাশ করে বাংলাদেশ কমিউনিস্ট কর্মী সংঘে যোগদান করে।
১৯৯০-৯১ পর্বে সোভিয়েত ইউনিয়নসহ বিশ্বজুড়ে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার সংকটকালে কমিউনিস্ট কর্মী সংঘের কার্যকলাপ সীমিত গণ্ডিতে আবদ্ধ হয়ে পড়লে দাউদ হোসেন ‘সাপ্তাহিক রোববার’ পত্রিকায় সিনিয়র সহসম্পাদকের দায়িত্ব নিয়ে লেখালেখির কাজ অব্যাহত রাখেন।
১৯৯২-’৯৬তে সাপ্তাহিক রোববার পত্রিকায় বিশ্ব অর্থনীতির গতিপ্রবাহের দ্বান্দ্বিকতা নিয়ে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয় তাঁর অনন্যসাধারণ প্রবন্ধগুলো। তার মধ্যে ‘বিশ্বজোড়া এক জাতির স্বপ্ন’, ‘যে যুদ্ধের শেষ নেই’, ‘গণমানুষের জয়যাত্রা’, ‘হংকং: শেষ তুরুপের তাস’, ‘মার্কিন-চীন সম্পর্কের দ্বান্দ্বিকতা’, ‘মহাচীনের মহাউত্থান’, ‘এশিয়া আগামী বিশ্বের নাভিকেন্দ্র’, ‘মহাকাশে মহাবাণিজ্য’ উল্লেখযোগ্য। তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় আন্দ্রেই আনিকিন রচিত মস্কোর প্রগতি প্রকাশন থেকে প্রকাশিত ‘অর্থশাস্ত্র বিকাশের ধারা’ গ্রন্থটি। এরপর তিনি প্রকাশ করেন মহামতি কৌটিল্য রচিত ‘কৌটিলীয় অর্থশাস্ত্র’ মহাগ্রন্থটি। কার্ল মার্ক্স রচিত ‘ডাস ক্যাপিটাল’ মহাগ্রন্থের ইংরেজি তিন খণ্ডের বঙ্গানুবাদ তাঁর হাতেই সম্পাদিত হয়ে ইতোমধ্যে প্রকাশিত হয়েছে পাঁচটি পৃথক খণ্ডে।
অফুরন্ত প্রাণশক্তির অধিকারী আজীবন সংগ্রামী কমরেড দাউদ হোসেন তত্ত্বগত সংগ্রামের গুরুত্ব উপলব্ধি করে পেশা হিসেবে লেখনী ও প্রকাশনাকে বেছে নিয়েছিলেন। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সেই মহতী কর্মে নিয়োজিত ছিলেন।
বর্ণাঢ্য, কর্মময় জীবনে তাঁর লক্ষ্য ও স্বপ্ন থেকে তিনি এক চুল বিচ্যুত হননি। মানবমুক্তি সম্পর্কিত সেই স্বপ্ন হচ্ছে কমিউনিজম প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে দেশে একটি তুলনামূলক সঠিক মার্ক্সবাদী-লেনিনবাদী কমিউনিস্ট পার্টি গঠন।
জীবদ্দশায় সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব অর্জিত না হলেও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যাতে আরাধ্য লক্ষ্য পূরণে সক্ষম হয়, সে উদ্দেশ্য সামনে রেখেই তাঁর যাবতীয় কর্মপ্রয়াস নিবেদিত ছিল। কমরেড দাউদ হোসেন তাঁর সৃজনশীল কর্মের মধ্যেই বেঁচে থাকবেন।
আবুল খায়ের: কমিউনিস্ট কর্মী সংঘের সদস্য
- বিষয় :
- শ্রদ্ধাঞ্জলি
