নিউক্লিয়ার দিবস
পারমাণবিক জ্বালানির শান্তিপূর্ণ ব্যবহার
পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র
রুশো তাহের
প্রকাশ: ৩০ নভেম্বর ২০২৫ | ১৫:৩১
আজ ৩০ নভেম্বর নিউক্লিয়ার ডে বা নিউক্লিয়ার দিবস। দিনটি ২০১৮ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত পালন করেছে নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড (এনপিসিবিএল)। এ বছর এনপিসিবিএল ছাড়াও নিউক্লিয়ার এনার্জির শান্তিপূর্ণ ব্যবহার-সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোও বাংলাদেশ নিউক্লিয়ার ডে বা নিউক্লিয়ার দিবস পালন করছে। ৩০ নভেম্বর জাতীয় নিউক্লিয়ার দিবস বা ন্যাশনাল নিউক্লিয়ার ডে হিসেবে পালনের বিষয়টিও বিবেচনাধীন।
রূপপুর নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্ট বা রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম কংক্রিট ঢালাই দেওয়া হয় ২০১৭ সালের ৩০ নভেম্বর। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ বিশ্ব অভিজাত নিউক্লিয়ার ক্লাবে অন্তর্ভুক্ত হয়। বস্তুত কোনো দেশ বিশ্ব অভিজাত নিউক্লিয়ার ক্লাবে পদার্পণের ভিত্তি হলো ‘এফসিডি’। এফসিডি বলতে সাধারণত প্রথম কংক্রিট ঢালাইয়ের তারিখকে বোঝায়, যা পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের আনুষ্ঠানিক সূচনা হিসেবে বিবেচিত।
প্রসঙ্গত, এনপিসিবিএল ২০১৫ সালের ১৮ আগস্ট কোম্পানি আইন ১৯৯৪-এর অধীনে একটি পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়, যেটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র আইন ২০১৫-এর সঙ্গে সংগতিপূর্ণভাবে কাজ করে। আইনটি এনপিসিবিএল-কে বাংলাদেশের পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনা এবং ডিকমিশনিংয়ের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব অর্পণ করে– যা রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের (আরএনপিপি) প্রধান অংশ।
এটি বাংলাদেশে এ ধরনের প্রথম প্রকল্প। রাশিয়ান জেনারেল কন্ট্রাক্টর জেএসসি অ্যাটমস্ট্রয় এক্সপোর্টের সহযোগিতায় তা বাস্তবায়িত হচ্ছে, যা পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র (এনপিপি) নির্মাণ সংক্রান্ত আন্তঃসরকারি সহযোগিতা চুক্তি-আইজিএ, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার এবং রাশিয়ান ফেডারেশন সরকারের মধ্যে আন্তঃসরকারি ঋণ চুক্তি বা আইজিসিএর অধীনে প্রণীত সাধারণ চুক্তির আওতাধীন। ইন্টারন্যাশনাল অ্যাটমিক এনার্জি এজেন্সি-আইএইএ বাংলাদেশ ও রুশ ফেডারেশনের যৌথ ওই কর্মযজ্ঞের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত।
২০১৭ সালের ৩০ আগস্ট আরএনপিপির স্পেন্ট নিউক্লিয়ার ফুয়েল বা নিউক্লিয়ার বর্জ্য ফেরত নেওয়ার বিষয়ে রাশান ফেডারেশন এবং বাংলাদেশ সরকারের মধ্যে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তঃরাষ্ট্রীয় চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এর ফলে নিউক্লিয়ার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত আমাদের যে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা, তা দূর হয়ে গিয়েছে। রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের ক্ষেত্রে পারমাণবিক নিরাপত্তার বিষয়ে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, যা ইতোমধ্যে নানা মাধ্যমে সাধারণ মানুষও জানেন। এ প্রকল্প দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক সব বাধ্যবাধকতা মেনে এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে বাস্তবায়িত হয়েছে।
মানবসম্পদ উন্নয়ন থেকে শুরু করে রিঅ্যাক্টরের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, পরিবেশের ভারসাম্য সংরক্ষণ এবং আনুষঙ্গিক বিষয়ে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। এ জন্য ১০০ বছরের বন্যার ইতিহাস পর্যালোচনা করে রিঅ্যাক্টরের স্থান নির্বাচন করা হয়েছে। রূপপুর নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্ট ৮ থেকে ৯ মাত্রার ভূমিকম্প সহনশীল। সুনামিজনিত জাপানের ফুকুশিমা দাইচি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র দুর্ঘটনার পর উঠে আসা প্রতিকার ও প্রতিরোধের বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে রূপপুরের নিউক্লিয়ার রিঅ্যাক্টর ডিজাইন করা হয়েছে। এর প্রমাণ হলো বিদ্যুৎকেন্দ্রে সর্বাধুনিক প্রযুক্তির ভিভিইআর-১২০০ শ্রেণির জেনারেশন ৩+ রিঅ্যাক্টর স্থাপন। এ রিঅ্যাক্টরে পাঁচ স্তরের নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান, যাতে কোনোক্রমেই তেজস্ক্রিয়তা বাইরে ছড়িয়ে পড়বে না। উপরন্তু কোনো বিমান হামলায় যাতে রি-অ্যাক্টরের ক্ষতি না হয়, তার ব্যবস্থাও যুক্ত করা হয়েছে এ বিদ্যুৎকেন্দ্রে।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র একটি বেইজলোড সাশ্রয়ী মূল্যের বিদ্যুৎকেন্দ্র, যা ২৪ ঘণ্টা চলবে। বিদ্যুৎকেন্দ্রটি কমিশনিং বা চালু হলে দেশের ক্রমবর্ধমান বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ২০ হাজার লোকের কর্মসংস্থানের সুযোগ হবে। বিদ্যুৎকেন্দ্রটি পরিবেশবান্ধব হওয়ায় জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব বিশেষত কার্বন নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণেও কার্যকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে নিয়োজিত জনবলের আবাসন ব্যবস্থায় গণপূর্ত অধিদপ্তরের মাধ্যমে গ্রিন সিটি নির্মিত হয়েছে।
এনপিসিবিএলের মেধাবী কর্মীরা তাদের কারিগরি দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য ব্যাপক পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে গেছেন। তারা পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণ, সরঞ্জাম ইনস্টলেশন এবং কমিশনিং কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করছেন, যা তাদেরকে প্লান্ট পরিচালনার ব্যবহারিক জ্ঞান অর্জনে সহায়তা করেছে। এর ফলে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সুচারু পরিচালনায় তারা দক্ষ হয়ে উঠেছেন। পরিশেষে বলা যায়, গত কয়েক বছরের নিউক্লিয়ার ডে উদযাপন এবং নিউক্লিয়ার ডে-কে ন্যাশনাল নিউক্লিয়ার ডে হিসেবে পালনের প্রস্তাব বাংলাদেশকে নিউক্লিয়ার এনার্জির শান্তিপূর্ণ ব্যবহারের সংস্কৃতিতে যুক্ত করার ক্ষেত্রে অনন্য ভূমিকা রাখতে পারে। ৩০ নভেম্বর নিউক্লিয়ার ডে উদযাপন আমাদের জাতীয় জীবনে উন্নয়ন ও অগ্রগতির বার্তা নিয়ে আসবে– এটিই প্রত্যাশা।
রুশো তাহের: বিজ্ঞানবিষয়ক লেখক ও নির্মাতা
- বিষয় :
- পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র
