ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

স্বাস্থ্য খাত

অ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ ব্যবহার জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি

অ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ ব্যবহার জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি
×

ডা. মুশতাক হোসেন

মুশতাক হোসেন

প্রকাশ: ০১ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৯:১৭ | আপডেট: ০১ ডিসেম্বর ২০২৫ | ১২:৪৯

অ্যান্টিবায়োটিকের প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাচ্ছে– বিষয়টি নানা গবেষণার মাধ্যমেই প্রমাণিত। সংবাদ মাধ্যমে প্রায়ই এ ধরনের গবেষণার খবর প্রকাশ হয়। সম্প্রতি রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) এক জরিপেও উঠে এসেছে, দেশের আইসিইউতে ভর্তি ৪১ শতাংশ রোগীর শরীরে কোনো অ্যান্টিবায়োটিকই কার্যকর হচ্ছে না। সংগত কারণেই এ অবস্থা জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি।  

অ্যান্টিবায়োটিকের কার্যকারিতা কমে যাওয়ার পেছনে প্রধান কারণ হলো, এর অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার। দরকার না থাকলেও আমরা চিকিৎসার নামে এ ওষুধ খাচ্ছি। চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে, কেউ কেউ প্রয়োজন না থাকলেও ওষুধ কোম্পানির আগ্রাসী মার্কেটিংয়ের শিকার হয়ে অ্যান্টিবায়োটিক লিখে থাকেন। আবার গ্রামাঞ্চলে যেসব ফার্মেসি আছে, তারা রোগীকে অপ্রয়োজনীয় হলেও অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে থাকে। 

আরেকটি বিষয় হলো, চিকিৎসক অ্যান্টিবায়োটিকের যে ডোজ দিয়ে থাকেন, অর্থাৎ যতদিন বা যতবারের জন্য ওষুধ দেওয়া হয়, রোগী তা মানেন না। অনেক সময় পুরোটা না খেয়ে বন্ধ করে দেন। এ কারণেও অ্যান্টিবায়োটিক অকার্যকর হতে পারে। তা ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক যেমন মানুষের ওপর প্রয়োগ করা হয়, তেমনি পশুকেও এ ওষুধ দেওয়া হয়। মুরগির খামারে এটি ব্যবহার করা হয়। গরু ও অন্যান্য গবাদি পশুতে এটি ব্যবহার করা হয়। বিশেষ করে গরুর খামারে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার আমরা দেখি মোটাতাজা করার জন্য। এসব প্রাণীর মাংস খাওয়ার মাধ্যমে মানবদেহেও অপ্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিক প্রবেশ করে। 

কৃষিতেও অনেক সময় অ্যান্টিবায়েটিকের গুঁড়া ব্যবহার করা হয়। শাকসবজি ও অন্যান্য কৃষিপণ্যে এগুলো ব্যবহার করার ফলে খাদ্য শৃঙ্খলের মাধ্যমে যেগুলো রান্না করলেও নষ্ট হয় না, এমন অ্যান্টিবায়োটিক আমাদের শরীরে প্রবেশ করে। আপনি সরাসরি না খেয়েও পরোক্ষভাবে এটি গ্রহণ করছেন। এর মাধ্যমেও শরীরে অ্যান্টিবায়োটিকের প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়। 

আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের স্বাস্থ্য সচেতনতার সঙ্গে অ্যান্টিবায়োটিকের একটা সংযোগ আছে। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, সাবান দিয়ে হাত ধোয়া ইত্যাদির মাধ্যমে আমরা অনেক ঝুঁকি কমাতে পারি। মনে রাখতে হবে, অ্যান্টিবায়োটিক হলো এমন ওষুধ, যা ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়, কিন্তু অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধক জীবাণুর কারণে অনেক অ্যান্টিবায়োটিক এখন অকার্যকর হয়ে উঠছে।

এই জীবাণু নানাভাবে আমাদের সাহচর্যে আসতে পারে। সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার মাধ্যমে এ জীবাণু চলে যায়। রান্নায় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার মাধ্যমেও এ জীবাণু এড়ানো সম্ভব। এ জন্যই হোটেল-রেস্টুরেন্টে খাওয়া অনেক সময় বিপদের কারণ হতে পারে। সেখানকার গ্লাস, প্লেট, বাটি ইত্যাদি সাবান বা ডিটারজেন্ট দিয়ে না ধুলে জীবাণু লেগে থাকা অস্বাভাবিক নয়। কেবল পানি জীবাণু ধ্বংসের জন্য যথেষ্ট নয়। 

অ্যান্টিবায়োটিকের প্রতিরোধ ক্ষমতা অক্ষত রাখতে রোগীর সচেতনতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অসুস্থ হলে নিজ থেকে কোনোভাবেই এ ওষুধ খাওয়া যাবে না। অ্যান্টিবায়োটিক লাগবে কিনা, তা ঠিক করবেন একজন চিকিৎসক। চিকিৎসককেও চিন্তাভাবনা করে অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ লিখতে হবে। চিকিৎসককে অনুধাবন করতে হবে, রোগীর অসুখ ব্যাকটেরিয়াজাত কিনা। সেভাবে বুঝেই তিনি প্রেসক্রাইব করবেন। এ ওষুধ কম করা যাবে না, আবার বেশিও খাওয়া যাবে না। বেশি ওষুধ থেকে গেলেও একই রোগের জন্য পরিবারের অন্য সদস্যকে অবশিষ্টাংশ খাওয়ানো যাবে না। 

অ্যান্টিবায়োটিকের প্রয়োগ যাতে না করতে হয়, সে জন্য প্রতিরোধমূলক কিছু ব্যবস্থা নেওয়া যায়। বাচ্চাদের কিছু ভ্যাকসিন আছে, যেগুলো দেওয়ার মাধ্যমে ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণের আশঙ্কা কমে যায়। বড়দের জন্যও কিছু ভ্যাকসিন আছে। যেমন আমরা কভিড ভ্যাকসিন দিয়েছি। বাচ্চাদের টাইফয়েডের ভ্যাকসিন আছে। টিটেনাসের টিকা আমাদের সবারই নেওয়া উচিত। 

আইসিইউর জরিপ নিয়ে কিছু বলা দরকার, যেখানে দেখানো হয়েছে– ভর্তি ৪১ শতাংশ রোগীর শরীরে কোনো অ্যান্টিবায়োটিকই কার্যকর হচ্ছে না। এখানে একদিকে অ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ ব্যবহার যেমন দায়ী, তেমনি আইসিইউ তথা হাসপাতালে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের পরিবেশের বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। হাসপাতালের আইসিইউ নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা দরকার। রোগীর অক্সিজেনের নলসহ যত সরঞ্জাম আছে, তা যেন অন্য রোগীর সংস্পর্শে না আসে। মাঝে মাঝে পুরো আইসিইউ খালি করে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে জীবাণুমুক্ত করা দরকার। আইসিইউ ব্যবস্থাপনা এমন যে, এখানে রোগীকে উচ্চ মাত্রার অ্যান্টিবায়োটিক দিতে হয়। 

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী, অ্যান্টিবায়োটিক তিন ধরনের– অ্যাকসেস, ওয়াচ ও রিজার্ভ। অ্যাকসেস হলো ‘কমনলি ইউজড’ বা বহুল ব্যবহৃত অ্যান্টিবায়োটিক, যা সাধারণত সাধারণ সংক্রমণের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়। যেমন পেনিসিলিন এবং এর মতো কিছু সেফালোস্পোরিন। ওয়াচ অ্যান্টিবায়োটিকগুলো কেবল তখনই ব্যবহার করা উচিত, যখন অ্যাকসেস শ্রেণির ওষুধ কাজ করে না। আর রিজার্ভ হলো অত্যন্ত শক্তিশালী, যা শুধু তখনই ব্যবহার করা হয়, যখন অন্য কোনো অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করে না এবং সাধারণত গুরুতর সংক্রমণের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়। অথচ হাসপাতালের আইসিইউতে দেখা যাচ্ছে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে রিজার্ভ ধরনের অ্যান্টিবায়েটিকও ঠিকভাবে কাজ করছে না। সেই অর্থে, আইসিইউতে ব্যবহারের অ্যান্টিবায়োটিকও কমে যাচ্ছে। এটাও বড় উদ্বেগের বিষয়।

দেশের ওষুধ কোম্পানিগুলো মানসম্পন্ন ওষুধ উৎপাদন করছে, এটা সত্য। সে কারণেই বিদেশে ওষুধ রপ্তানি হচ্ছে বেশ ভালো পরিমাণে। তার পরও ওষুধের মান ও কার্যকারিতার বিষয়টি ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরকে নিয়মিত মনিটর করতে হবে। বিদেশে যেসব ওষুধপত্র যায় সেগুলো যেভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়, দেশের ওষুধও অনুরূপ পরীক্ষা করতে হবে।

অ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ ব্যবহার বন্ধে দেশের ফার্মেসিগুলো যারা চালাচ্ছেন, তাদেরও দায়িত্ব আছে। এখানে কর্মরতরা প্রশিক্ষিত হোন বা না হোন, তাদের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা দরকার। তাদের মাঝে মাঝে প্রশিক্ষণ দেওয়া প্রয়োজন। কারণ গ্রামের দরিদ্র মানুষ অসুখ হলে প্রথমে ফার্মেসিতেই যায়। তাকে প্রশিক্ষণ দিলে মানুষ সেবা পাবে। চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন ছাড়া মানুষ চাইলেও তারা অ্যান্টিবায়েটিক বিক্রি না করে বরং তার ক্ষতিকর দিক বোঝাতে পারবে। এর মাধ্যমে দেশের তৃণমূলের মানুষও যথাযথ নির্দেশনা পাবে।

ডা. মুশতাক হোসেন: রোগতত্ত্ববিদ; সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও  গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর) 

আরও পড়ুন

×