ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

আমদানিকৃত যন্ত্রপাতি তালাবদ্ধ

ভূমিকম্প মোকাবিলার ‘প্রস্তুতি’ বটে

ভূমিকম্প মোকাবিলার ‘প্রস্তুতি’ বটে
×

সম্পাদকীয়

প্রকাশ: ০২ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৬:২৫ | আপডেট: ০২ ডিসেম্বর ২০২৫ | ১০:৫০

| প্রিন্ট সংস্করণ

ভূমিকম্পজিনত ক্ষয়ক্ষতি হ্রাসের লক্ষ্যে ‘আরবান রিজিলিয়েন্স’ প্রকল্পের অধীনে ক্রয়কৃত ৬০ কোটি টাকার যন্ত্রপাতি তালাবদ্ধ আছে বলিয়া শুক্রবার সমকাল যেই সংবাদ দিয়াছে, উহা দুর্ভাগ্যজনক। ২০১৭ সালে গৃহীত রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) এই প্রকল্পের অধীনে সুইজারল্যান্ড, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও জাপান হইতে ক্রয় করা হয় বহু মূল্যবান যন্ত্রপাতির সহিত কম্পিউটার, প্রিন্টার, এসি, চেয়ার-টেবিল এবং প্রয়োজনীয় বিভিন্ন সামগ্রী। সকলই অব্যবহৃত। এমনকি কোনো কোনো যন্ত্রপাতির মোড়কও উন্মোচিত হয় নাই। অধিকাংশ যন্ত্রপাতির মোড়ক না খোলায় সেইগুলির কার্যকারিতা হ্রাস পাইতেছে।
অথচ এই সকল যন্ত্রপাতি পরিচালনার জন্য কারিগরি ও প্রশাসনিক দক্ষতাসম্পন্ন ৮২ জনকে পাঁচ দেশের বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে প্রশিক্ষণও দেওয়া হইয়াছে। শুধু উহাই নহে; প্রকল্পের জন্য যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, তুরস্ক ও ইরানের পরামর্শক নিয়োগ, তৎসহিত ১২৫ কোটি টাকা ব্যয়ে মহাখালীতে ১০ তলা ভবন নির্মাণ করা হইয়াছে, যাহা দীর্ঘদিন তালাবদ্ধ থাকিয়া ধূলাবালি সংগ্রহ করিতেছে। আশপাশে গজাইয়াছে আগাছা। এইদিকে বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় ৫৬৮ কোটি টাকার এই প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হইবার পর গত বৎসরের জুনে প্রকল্প পরিচালক আব্দুল লতিফ হেলালী সবকিছু রাজউককে বুঝাইয়া দিয়া চাকরি হইতে অবসরে গিয়াছেন। তখন হইতে প্রকল্পটির কার্যত অপমৃত্যু ঘটিয়াছে। অথচ এই প্রকল্পের অধীনে ক্রয়কৃত যন্ত্রপাতির মধ্যে রাজধানীর ভবনগুলির ভূমিকম্প প্রতিরোধ ক্ষমতা শনাক্তের জন্য ২৫ ধরনের ১৫০টি অত্যাধুনিক মেশিন ছিল। এইগুলির মাধ্যমে ভবনের কলামের ভিতরে থাকা রডের মান এবং কী পরিমাণ রড আছে তাহা শনাক্ত করা যায়। মাটির গুণাগুণ পরীক্ষা, ভবনের কলামসহ যেই কোনো কংক্রিটের মান যাচাই করা যায়। বর্তমানে এই কাজগুলি অত্যন্ত জরুরি হইয়া পড়িয়াছে।

প্রতিবেদনমতে, প্রকল্পের অধীনে আরবান সেফটি অ্যান্ড রিজিলিয়েন্স ইনস্টিটিউট নামে একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান গড়িবারও পরিকল্পনা ছিল, যাহার কাজ হইবার কথা ছিল রাজধানী ঢাকা ও সিলেটের ভবনগুলির ভূমিকম্প সক্ষমতার মান যাচাই করিয়া প্রতিবেদন দেওয়া, ঝুঁকিপূর্ণ ভবন শনাক্ত করিয়া তালিকা দেওয়া, যাহাতে সরকার সেইগুলির বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করিতে পারে। তৎসহিত দেশের অন্য ভবন মালিকরাও যেন এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তাহাদের ভবনের সক্ষমতা যাচাই করিয়া লইতে পারেন। যদিও রাজউক চেয়ারম্যান এই বিষয়ে তাহাদের ইতিবাচক 
মনোভাবের কথা সমকালকে জানাইয়াছেন, বাস্তবে এই প্রতিষ্ঠান স্থাপনও অনিশ্চিত হইয়া পড়িয়াছে।

হতাশাজনক খবরটি এমন সময়ে আসিল যখন ঢাকাসহ সন্নিহিত এলাকা সম্প্রতি একাধিক ভূমিকম্পে কাঁপিয়া উঠিয়াছে। ১০ জনের অধিক মৃত্যুসহ অনেক ক্ষয়ক্ষতিও হইয়াছে। উপরন্তু কিছুদিন যাবৎ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ভূমিকম্পের কারণে জনমনে ভীতির সঞ্চার হইয়াছে। অন্যদিকে রাজধানীসহ দেশের অনেক অঞ্চল ভূমিকম্পের উচ্চ ঝুঁকিতে রহিয়াছে বলিয়া বিশেষজ্ঞগণ মনে করেন। অর্থাৎ হস্ত-পদ সংকুচিত করিয়া থাকিবার অবকাশ নাই। ইহাও স্মরণযোগ্য, ইমারত নীতিমালা ও ভূমির ধরন সম্পর্কে সচেতন না থাকিয়া অনেকেই ঢাকা শহরে বহুতল ভবন নির্মাণ করিয়াছেন। তদুপরি সম্প্রসারিত ঢাকা শহরের বহু ভবন নির্মাণ করা হইয়াছে বালু ও মাটি দিয়া জলাভূমি পূর্ণ করিয়া। ফলে ভূমিকম্পের মাত্রা ৬ বা তদূর্ধ্ব হইলেই বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটিবার আশঙ্কা সৃষ্টি হইয়াছে। আর ভূমিকম্পবিষয়ক দুর্যোগ মোকাবিলায় সরকারের সুস্পষ্ট কর্মপরিকল্পনা থাকা অত্যন্ত জরুরি। তাহা যদ্রূপ ভূমিকম্প-পূর্ব প্রস্তুতি সংক্রান্ত হইবে, তদ্রূপ ভূমিকম্প-পরবর্তী উদ্ধার, ত্রাণ ও পুনর্গঠন কর্মসূচি বিষয়েও হইতে হইবে। 

আলোচ্য প্রকল্পের ব্যর্থতার জন্য বিগত সরকারকে আমরা দায়ী করিতেই পারি। কিন্তু তাহাতে ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি এতটুকু হ্রাস পাইবে না। ফলে অন্তর্বর্তী সরকারকেই বিশেষজ্ঞদের সহিত পরামর্শপূর্বক যথাযথ পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন শুরু করিতে হইবে। এমনকি আগামী নির্বাচিত সরকারের জন্যও এই কাজ ফেলিয়া রাখা যাইবে না। 

 

আরও পড়ুন

×