ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

ইসলাম ও সমাজ

প্রাকৃতিক বিপর্যয় থেকে শিক্ষণীয়

প্রাকৃতিক বিপর্যয় থেকে শিক্ষণীয়
×

মো. শাহজাহান কবীর

প্রকাশ: ০৫ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৬:৩৪

| প্রিন্ট সংস্করণ

প্রাকৃতিক বিপর্যয় যেমন– ভূমিকম্প, বন্যা, খরা, ঘূর্ণিঝড়, অনাবৃষ্টি বা মহামারি মানব জাতির জন্য গভীর শিক্ষার এক বিশেষ মাধ্যম। ইসলাম এ ধরনের বিপর্যয়কে কেবল একটি আকস্মিক বা বিজ্ঞাননির্ভর ঘটনা হিসেবে দেখে না, বরং এগুলো আল্লাহর পরীক্ষার অংশ। তাঁর মহান কুদরতের পরিচয় এবং মানবসমাজকে সংশোধনের দিকে আহ্বান হিসেবে ব্যাখ্যা করে।

প্রাকৃতিক বিপর্যয় মানব জাতির পরীক্ষাস্বরূপ। আল্লাহতায়ালা সুরা বাকারার ১৫৫ আয়াতে এরশাদ করেন– ‘আর অবশ্যই আমি তোমাদের পরীক্ষা করব কিছু ভয়, ক্ষুধা, সম্পদ ও জীবনের ক্ষতি দ্বারা।’
ইসলামের দৃষ্টিতে দুনিয়া হলো পরীক্ষা ও কষ্টের ময়দান। আল্লাহতায়ালা বান্দাকে বিভিন্ন প্রকার অবস্থার মধ্য দিয়ে পরীক্ষা করেন– কখনও সুখ, কখনও দুঃখ দিয়ে। প্রাকৃতিক বিপর্যয়ও সেই পরীক্ষার একটি রূপ, যা মানুষের ইমান, ধৈর্য ও আল্লাহর প্রতি নির্ভরতার মান যাচাই করে।
মানুষকে সতর্ক করা ও পাপ থেকে ফেরাও দুর্যোগের শিক্ষা। আল্লাহতায়ালা সুরা রুমের ৪১ আয়াতে এরশাদ করেন– ‘মানুষের হাতের কাজের কারণে স্থলে ও সমুদ্রে বিপর্যয় দেখা দেয়। যাতে আল্লাহ তাদেরকে তাদের কাজের কিছু স্বাদ আস্বাদন করান, সম্ভবত তারা ফিরে আসবে।’ এ আয়াত স্পষ্ট করে– মানুষের অন্যায়-অবিচার, জুলুম, অপব্যবহার, পরিবেশ নষ্ট করা– এসব কারণে আল্লাহ কষ্ট ও বিপর্যয় পাঠান, যাতে মানুষ সৎপথে ফিরে আসে। অর্থাৎ বিপর্যয় কেবল শাস্তি নয়; এটি সতর্কবার্তা ও আল্লাহর রহমতেরও অংশ।

প্রকৃতিতে সংঘটিত প্রতিটি বড় ঘটনা ভূমিকম্প, ঝড়, বজ্রপাত মানুষকে মনে করিয়ে দেয়– সে অসহায় এবং প্রকৃত নিয়ন্ত্রণকারী কেবল আল্লাহ। মানবজ্ঞান, প্রযুক্তি বা বিজ্ঞান সর্বশক্তিমান নয়; আল্লাহর ইচ্ছা ছাড়া কিছুই ঘটে না। এ উপলব্ধি মানুষের অহংকার ভেঙে দেয় এবং তাকে বিনয়ী করে তোলে।
পরিবেশ নষ্ট করার ফল প্রাকৃতিক বিপর্যয়। ইসলাম আমাদের শেখায়– মানুষকে পৃথিবীর ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে। আজ বন ধ্বংস, নদীদূষণ, বায়ুদূষণ, জলবায়ু পরিবর্তন– এসব মানুষেরই অপকর্ম। পরিবেশদূষণের কারণে অনেক প্রাকৃতিক দুর্যোগ মানবসৃষ্ট হয়ে দাঁড়ায়। ইসলাম এমন অপচয়, ধ্বংস, অবহেলা কঠোরভাবে নিষেধ করে।

ইসলামিক দৃষ্টিতে বাঁচার উপায় দুটি স্তরে ব্যাখ্যা করা হয়– আধ্যাত্মিক ও ব্যবহারিক উপায়। তওবা ইস্তিগফার ও পাপ পরিহার। প্রাকৃতিক বিপর্যয় থেকে রক্ষা পাওয়ার প্রথম ও প্রধান উপায় আল্লাহর দিকে ফিরে আসা।
রাসুলে কারিম (সা.) বলেন– ‘যে ব্যক্তি বেশি বেশি ইস্তিগফার করে, আল্লাহ তার জন্য সংকট থেকে উত্তরণের পথ করে দেন।’ ইস্তিগফার মানুষের হৃদয় পরিষ্কার, আল্লাহর গজব দূর এবং রহমতকে ডেকে আনে। প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সময় দোয়ার অন্যতম সুন্নত–
আল্লাহুম্মা ইন্নি আউজুবিকা মিন জাওয়ালি নিমাতিকা।

সমাজে সত্য, ন্যায় ও সৎকর্ম প্রতিষ্ঠা করা। কারণ, প্রাকৃতিক বিপর্যয় অনেক সময় সমাজের সামগ্রিক অবিচার ও অন্যায়ের ফল। তাই দুর্নীতি পরিত্যাগ, জুলুম বন্ধ, গরিবের হক আদায়, জাকাত দেওয়া, সদাচার ও নৈতিকতা প্রতিষ্ঠা। এসব কাজ আল্লাহর রহমতকে আকর্ষণ এবং গজব দূর করে।
ইসলাম পরিবেশ রক্ষাকে ইবাদতের মতো গুরুত্বপূর্ণ মনে করে। তাই ইসলামে পানির অপচয়, বিনা প্রয়োজনে গাছ কাটা, পরিবেশ নষ্ট করা নিষেধ। রাসুল (সা.) বলেন– ‘যে ব্যক্তি একটি গাছ রোপণ করে, তা তার জন্য সদকায়ে জারিয়া।’
প্রাকৃতিক দুর্যোগের আগে পরিকল্পনা গ্রহণ ও বৈজ্ঞানিক প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি। কেননা, ইসলাম বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও সতর্কতা গ্রহণকে সমর্থন করে। প্রাকৃতিক বিপর্যয় থেকে রক্ষা পেতে শক্তিশালী ভবন নির্মাণ, পূর্বাভাসের প্রতি সতর্ক থাকা, আশ্রয়কেন্দ্র তৈরি, জরুরি খাদ্য-পানি প্রস্তুত রাখা। সুন্নাহ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সতর্কতা গ্রহণ করা আমাদের দায়িত্ব। 

ড. মো. শাহজাহান কবীর: চেয়ারম্যান, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, ফারইস্ট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি

আরও পড়ুন

×