অগ্রিম ও উৎসে কর
সুষ্ঠু কর কাঠামো জরুরি
সম্পাদকীয়
প্রকাশ: ০৬ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৬:৫৪ | আপডেট: ০৬ ডিসেম্বর ২০২৫ | ১২:২০
| প্রিন্ট সংস্করণ
বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) আয়োজিত বিনিয়োগ সংলাপে বিদ্যমান কর ব্যবস্থার সমালোচনা করিয়া অ্যাপেক্স ফুটওয়্যারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর যে বক্তব্য রাখিয়াছেন, তাহা গুরুত্বপূর্ণ বলিয়া আমরা মনে করি। শুক্রবার প্রকাশিত সমকালের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ব্যবসায়ীদের উপর আরোপিত অগ্রিম আয়কর ও উৎসে করের চাপকে ‘কর সন্ত্রাস’ আখ্যা দিয়া তিনি উহা বন্ধের আহ্বান জানাইয়াছেন। তিনি অভিযোগ করিয়াছেন, বিদ্যমান ব্যবস্থায় ব্যবসায়ীরা লাভ করিলে তো বটেই লোকসান করিলেও উক্ত কর দিতে হইতেছে। তাঁহার মতে, এমনও ঘটনা ঘটিয়াছে, যেখানে লোকসান অধিক, আবার করও অধিক দিতে হইয়াছে। উৎসে কর ও অগ্রিম আয়কর সংক্রান্ত বিষয়গুলি ব্যাখ্যা করিলে নাসিম মঞ্জুরের ক্ষোভের কারণটি উপলব্ধি করা সহজ হইতে পারে। উৎসে কর হইল এমন একটি কর ব্যবস্থা, যেখানে আয়ের উৎসেই নির্দিষ্ট পরিমাণ কর কর্তন করা হইয়া থাকে। অগ্রিম আয়করও একই। আপাতদৃষ্টিতে এ দুই করকে স্বাভাবিক মনে হইলেও এইগুলি ক্ষেত্রবিশেষে সংশ্লিষ্ট করদাতার উপর জবরদস্তি হইতে পারে। যেমন কোনো ব্যবসায়ী বিদেশ হইতে কোনো পণ্য আনিলে উহার উপর আরোপিত আমদানি কর, ভ্যাট ইত্যাদি, তৎসহিত উৎসে কর ও অগ্রিম করও বন্দরে আদায় করা হয় এই যুক্তিতে, উক্ত পণ্য বিক্রয় করিয়া সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী লাভবান হইবেন; যাহার ভাগ সরকার দাবি করিতে পারে। কিন্তু এই লাভ-লোকসানের বিষয়টি নির্ভরশীল আরও একাধিক বিষয়ের উপর, যেইগুলি কখনও কখনও ব্যবসায়ীর অনুকূল নাও থাকিতে পারে। অর্থাৎ আমদানি করা পণ্যটি বিক্রয় করিয়া সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী যে লাভ করিবেন, তাহা নিশ্চিত করিয়া বলা যায় না। অথচ তাহাকে ঐ কথিত লাভের অংশ সরকারের ভান্ডারে পূর্বেই উৎসে কর ও অগ্রিম কর বাবদ দিতে হইয়াছে। এই সকল কর আদায় ন্যায্য হইত যদি বার্ষিক আয়কর রিটার্নে সংশ্লিষ্ট খাতে লোকসানের প্রমাণ দেখাইয়া উক্ত দুই কর বাবদ প্রদত্ত অর্থ সমন্বয়ের সুযোগ থাকিত। কিন্তু রহস্যজনকভাবে, এই বিষয়ে অতীতের সরকারগুলির ন্যায় বর্তমান সরকারও নীরব।
আমরা জানি, আর্থিক স্বনির্ভরতা ব্যতীত একটা রাষ্ট্রের স্বাধীন সত্তার সুরক্ষা দুরূহ। টেকসই উন্নয়নেরও পূর্বশর্ত অভ্যন্তরীণ উচ্চ রাজস্ব আয়। এই কারণেই বাংলাদেশের কর-জিডিপির নিম্ন অনুপাত সংশ্লিষ্ট সকলেরই উদ্বেগের অন্যতম কারণ। অন্যদিকে বাংলাদেশে প্রত্যক্ষ কর মোট করের মাত্র ৩০ শতাংশ; বাকি ৭০ শতাংশ পরোক্ষ করের চাপ সর্বাধিক পড়ে সাধারণ মানুষের উপর। এই কারণে বিগত কয়েক দশক যাবৎ রাজস্ব বিভাগ আয়কর সংগ্রহ বৃদ্ধির উপায় খুঁজিতেছে। উৎসে কর ও অগ্রিম আয়কর সম্ভবত সেই অনুসন্ধানেরই ফসল। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ঘোষণা অনুসারে, বর্তমানে আয়কর বিভাগ আহরিত রাজস্বের সিংহভাগ অর্থই এই দুই কর কর্তন হইতে আহরিত হয়। এই প্রসঙ্গে ইহাও বলা প্রয়োজন, দেশে কর ফাঁকি দেওয়ার প্রবণতা অন্য বহু দেশের তুলনায় অধিক এবং এই ক্ষেত্রে অভিযোগের তীর প্রধানত কর প্রদানে সামর্থ্যবানদেরই দিকে। অভিযোগ আছে, রিটার্ন দেয় না নিবন্ধিত ৯১ শতাংশ কোম্পানি। সম্ভবত এই অনাকাঙ্ক্ষিত বাস্তবতা পরিহার করিতে গিয়াই সরকার রাজস্ব বৃদ্ধির উক্ত সহজ পদ্ধতি গ্রহণ করিয়াছে।
কিন্তু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কর ফাঁকির যত অভিযোগ আছে, এইগুলির দায় তো প্রথমত রাজস্ব বিভাগের। কর কাঠামোর বিবিধ জটিলতার কারণেই যে এহেন রাজস্ব ফাঁকির অবকাশ সৃষ্টি হইয়াছে, তাহা অস্বীকারের কোনো অবকাশ নাই। সর্বোপরি, ফাঁকিবাজ ব্যবসায়ীদের দায় তো নিয়ম মানা ব্যবসায়ীদের উপর চাপানো যায় না। এই দেশে রাজস্ব সংগ্রহ বৃদ্ধির তাগিদের সহিত পাল্লা দিয়া নিয়মিত করদাতাদের উপর অতিরিক্ত করের বোঝা চাপানো হইতেছে– এই অভিযোগ তো বিনা কারণে উঠে নাই। বৈধ ব্যবসায়ে ব্যয় বৃদ্ধিতে সকলেরই ক্ষতি। অতএব ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ আমলে লইয়া দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করিতে একটি সুষ্ঠু কর কাঠামো প্রণয়ন জরুরি হইয়া পড়িয়াছে।
