ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

তারুণ্য

জাতীয় যুব উন্নয়নে বিএনসিসি যে ভূমিকা রাখতে পারে

জাতীয় যুব উন্নয়নে বিএনসিসি যে ভূমিকা রাখতে পারে
×

আবু সাঈদ আল মসউদ

প্রকাশ: ১২ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৬:৫০

| প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশ এমন একটা সময় অতিক্রম করছে, যখন দেশের উন্নয়নধারাকে শক্তিশালী করতে সক্ষম, সুশিক্ষিত ও দক্ষ তরুণ শক্তি অপরিহার্য। দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২৮ শতাংশ তরুণ, যাদের বয়স ১৫ থেকে ২৯ বছর। সংখ্যায় এটি প্রায় ৪৯ মিলিয়ন বা চার কোটি ৯ লাখ। এটি এক বিরল জনমিতিক শক্তি, যা অনেক উন্নত দেশও আজ পায় না। বাস্তবতা হলো, এই বিপুল সংখ্যক তরুণ সম্ভাবনার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ যথাযথ কর্মদক্ষতার অভাবে বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল স্রোতের বাইরে থেকে যাচ্ছে।

২০২৩ সালের শ্রমশক্তি জরিপমতে, দেশের প্রায় ১৮.৯ শতাংশ তরুণ (প্রায় ৯.২ মিলিয়ন) কোনো শিক্ষা, কর্মসংস্থান, প্রশিক্ষণ; কিছুতেই নেই। আরও উদ্বেগজনক, প্রতিবছর প্রায় ৭ লাখ শিক্ষার্থী এসএসসি ও এইচএসসির মাঝপথে ঝরে পড়ে। 

এমন প্রেক্ষাপটে গত ১১ নভেম্বর ২০২৫ তারিখ রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্যাডেট কোরের (বিএনসিসি) মহাপরিচালক ‘বিএনসিসির মাধ্যমে যুবসমাজের জাতীয় রূপান্তর’ শীর্ষক একটি উপস্থাপনা হাজির করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে পরে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস দেশের তরুণ প্রজন্মকে নেতৃত্ব, শৃঙ্খলা ও জাতীয় উন্নয়নে সম্পৃক্ত করার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বিএনসিসির কার্যক্রমের গুণগত মান ও অন্তর্ভুক্তি বাড়ানোর আহ্বান জানান। গত ২১ নভেম্বর ঢাকা সেনানিবাসে অনুষ্ঠিত সশস্ত্র বাহিনী দিবসের অনুষ্ঠানেও প্রধান উপদেষ্টা অনুরূপ বক্তব্য দেন। এ প্রেক্ষিতে বিএনসিসির নেতৃত্বে একটি সমন্বিত জাতীয় যুব কর্মশক্তি উন্নয়ন কর্মসূচি এখন সময়ের দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রসঙ্গত, বিএনসিসির বর্তমান সাংগঠনিক সক্ষমতা, বিস্তৃত নেটওয়ার্ক এবং চার মাত্রিক প্রশিক্ষণ কাঠামো এমন উদ্যোগ বাস্তবায়নের জন্য যথেষ্ট উপযোগী।
বিএনসিসির প্রাতিষ্ঠানিক আয়োজন শুরু হয় ২৩ মার্চ ১৯৭৯ সালে; তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নির্দেশক্রমে একটি সাংবিধানিক আদেশের মাধ্যমে। ১৯৮৯ সালে এটি রাজস্ব খাতে স্থানান্তরিত হয়। সময়ের পরিক্রমায় ২০১৬ সালে বিএনসিসি আইন-২০১৬ কার্যকর হয়। 

বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্যাডেট কোরের দায়িত্ব ও কর্তব্য: ১) দেশের ক্রান্তিকালীন অধিদপ্তরের নির্দেশনা অনুসারে নির্ধারিত বিভিন্ন প্রশিক্ষণ গ্রহণের মাধ্যমে দেশ ও জাতির ক্রান্তিকালে সেবা প্রদানের নিমিত্তে প্রস্তুত থাকা, ২) প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট যে কোনো দুর্যোগে বিপন্ন জনগণকে সেবা প্রদান করা, ৩) দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সশস্ত্র বাহিনীর সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করা এবং ৪) সরকার কর্তৃক অর্পিত অন্য যে কোনো দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করা। বিএনসিসি কেবল সামরিক অনুশীলনভিত্তিক ছাত্র সংগঠন নয়; এটি রাষ্ট্রের উন্নয়ন, নিরাপত্তা এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় এক অমূল্য সক্ষমতা।
প্রস্তাবিত যুবশক্তি উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়িত হলে বিএনসিসির নেতৃত্বে ২০৩০ সালের মধ্যে প্রায় ৪০ লাখ তরুণকে একুশ শতকের প্রয়োজনীয় দক্ষতায় প্রশিক্ষিত করা হবে, যাদের মধ্যে থাকবে সমাজের সুবিধাবঞ্চিত কিন্তু শারীরিকভাবে সক্ষম তরুণ-তরুণী এবং এইচএসসি সমপর্যায়ের নিয়মিত শিক্ষার্থী। প্রতিটি বিএনসিসি ক্যাডেটকে দুই ধাপে দুই বৎসর মেয়াদি প্রশিক্ষণ প্রদান করা হবে: প্রথম ছয় মাস নিয়মিত প্রশিক্ষণ এবং পরবর্তী ১৮ মাস রিফ্রেশার ও পেশাগত/কারিগরি প্রশিক্ষণ। সমাজের সুবিধাবঞ্চিত তরুণ-তরুণীদের জন্য প্রশিক্ষণের দিন জনপ্রতি দৈনিক ৫০০ টাকা প্রশিক্ষণ ভাতা দেওয়া হবে। আর নিয়মিত শিক্ষার্থীদের জন্য একাডেমিক ক্রেডিট (জিপিএ) যুক্ত হবে। শুরুতে প্রতিবছর ২.৭ লাখ তরুণ-তরুণীকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হলেও অষ্টম বছরে এ সংখ্যা দাঁড়াবে প্রায় ২১ লাখে।

এ উদ্যোগ সফল করতে বিএনসিসির বিদ্যমান কাঠামো শক্তিশালী করা প্রয়োজন। যেমন– পর্যায়ক্রমে বিদ্যমান পাঁচটি রেজিমেন্ট সংখ্যা বৃদ্ধি করে প্রতি বিভাগে একটি রেজিমেন্ট করা; প্রতি জেলায় একটি ব্যাটালিয়ন স্থাপন; দক্ষ প্রশিক্ষক বৃদ্ধি; সর্বোপরি আধুনিক প্রশিক্ষণ সুবিধা সংযোজন করা। কিন্তু এই বিশাল উচ্চাভিলাষী কর্মসূচির জন্য সরকারকে তেমন একটা বাড়তি আর্থিক চাপ বহন করতে হবে না। বরং যুব উন্নয়ন, দুর্যোগ ব্যাবস্থাপনা ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের আন্তঃমন্ত্রণালয় বাজেট সমন্বয়ের মাধ্যমেই এর বাজেট সংকুলান করা সম্ভব।
বিশ্বের উন্নয়নশীল ও উন্নত অনেক দেশেই জাতীয় ক্যাডেট বা ইউনিফর্মড ইয়ুথ প্রোগ্রাম গ্রহণ করা হয় রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকারের অংশ হিসেবে। যেমন ভারত তাদের এনসিসি ক্যাডেট সংখ্যা ১.৭ মিলিয়ন থেকে ২.৭ মিলিয়ন ক্যাডেটে সম্প্রসারণ করছে; নেপাল তার দেশের সকল জেলায় এনসিসি সম্প্রসারণ করছে; শ্রীলঙ্কা তাদের প্রতিটি স্কুলে এনসিসি স্থাপনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে; সিঙ্গাপুরে ইউনিফর্মড ক্যাডেট হিসেবে স্কুলে সব শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণ বাধ্যতামূলক।

আজকের তরুণই আগামী বাংলাদেশের চালিকাশক্তি। তাদের দক্ষতা উন্নয়ন, শৃঙ্খলা ও নৈতিক চেতনা জাগিয়ে তুলতে এখনই প্রাতিষ্ঠানিক পদক্ষেপ নিতে হবে। এ উদ্যোগ কেবল তরুণদের ভবিষ্যৎ বদলাবে না; বরং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎকে আরও শক্তিশালী, নিরাপদ ও গতিশীল করবে।

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবু সাঈদ আল মসউদ 

আরও পড়ুন

×