ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

সংস্কৃতি

ক্যাট কালচার এবং ক্ষুধার্ত মানুষের সকরুণ চাহনি

ক্যাট কালচার এবং ক্ষুধার্ত মানুষের সকরুণ চাহনি
×

রানা ভিক্ষু

প্রকাশ: ১৩ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৬:৪৩ | আপডেট: ১৩ ডিসেম্বর ২০২৫ | ১৩:১৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশের শহুরে জীবনে এখন এক নতুন সংস্কৃতি গড়ে উঠছে, যাকে বলা যায় ‘ক্যাট কালচার’। সামাজিক মাধ্যমে এখন ‘ক্যাট ইনফ্লুয়েন্সার’ একটি জনপ্রিয় ধারা। লাখো ফলোয়ার, স্পন্সরশিপ, বিজ্ঞাপন– সবকিছুই ঘুরছে বিড়ালের চারপাশে। মানুষ নিজের পোষা প্রাণীর মাধ্যমে খুঁজে পাচ্ছেন জনপ্রিয়তা ও আত্মতৃপ্তি। কিন্তু পরিহাস হলো, একটি ভিডিওতে বিড়ালের হাঁচি লাখো লাইক পেলেও রাস্তায় পড়ে থাকা ক্ষুধার্ত মানুষের সকরুণ চাহনি নেটিজেনের দৃষ্টিগোচর হয় না। 

সম্প্রতি লাখ টাকা ব্যয় করেও পাসপোর্টধারী মুন্সীগঞ্জের ‘ক্যান্ডি’ (বিড়াল) পরিবারের লোকজনের সঙ্গে ইতালি যেতে পারেনি–  এটা নিঃসন্দেহে পীড়াদায়ক। তার থেকেও কষ্টের বিষয় হলো, পরিবারের লোকজন তাকে ছেড়ে চলে যাওয়ার পর থেকে ‘ক্যান্ডি’ খাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে! অন্যদিকে বিড়ালবিলাসী এ দেশেরই ফুট ওভারব্রিজের কোণে, বাসস্ট্যান্ডে, হাসপাতালের বারান্দায়, গ্রামের কুঁড়েঘরে অনেক শিশু, বৃদ্ধ, প্রতিবন্ধী হাত পেতে দাঁড়াচ্ছে। আমরা একদিকে পশুর প্রতি অতিরিক্ত ভালোবাসায় আপ্লুত, অন্যদিকে অসহায় মানুষের প্রতি ভ্রুক্ষেপহীন। এই বৈপরীত্য প্রশ্ন জাগায়– আমাদের বিড়ালপ্রীতি কতটা অকৃত্রিম?
নৃতত্ত্ববিদ, সমাজচিন্তক ও অরাজনৈতিক তত্ত্ব গবেষক ডেভিড গ্রেবার তাঁর ‘দি ইউটোপিয়া অব রুলস’ গ্রন্থে দেখিয়েছেন– ভালোবাসা, যত্ন ও মানবিক সম্পর্ক কীভাবে ক্রমশ ‘প্রাতিষ্ঠানিক’ ও ‘বাজারনির্ভর’ হয়ে উঠছে। তাঁর গবেষণার সারমর্ম হলো, ‘প্রাণী পোষার সংস্কৃতি’ এক ধরনের প্রতীকী ভোগ। মানুষকে এড়িয়ে প্রাণী পালন শুধু ভালোবাসা বা সঙ্গের বিষয় নয়; বরং এটি সামাজিক অবস্থান, পরিচয় ও আবেগ প্রদর্শনে মানুষের এক বিকৃত মানসিক রূপ। পিয়ের বুরদিয়ুর বক্তব্য– পোষা প্রাণীর যত্ন, ব্যয়বহুল খাবার, চিকিৎসা, এসব হলো বিত্তশালীদের বিত্ত প্রদর্শনের বাহানা। সমাজে বিত্তহীনদের অসামর্থ্যকে ফুটিয়ে তোলার জন্য বিত্তশালীরা এমন হীন প্রদর্শনের প্রতিযোগিতা করে।

শেলি ভল্‌শে, মিরিয়াম মোহন এবং মাধবী রঙ্গস্বামী প্রমুখ গবেষক কভিডের সময় কুকুর সম্পর্কে কলেজ ছাত্রছাত্রীদের মনোভাব নিয়ে বেঙ্গালুরুতে একটি গবেষণা করেন। উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত ও বিত্তহীন তরুণদের মধ্যে দৈনন্দিন জীবনে পশুর সঙ্গে সামাজিক আচার-ব্যবহারের ব্যাখ্যায় মতামতের কোনো মিলই খুঁজে পাননি গবেষকত্রয়। গবেষণায় তথ্যদাতা তরুণদের একাংশ মনে করে, দৈনন্দিন জীবনে মানুষের চেয়ে পশুদের সঙ্গে বসবাস এমনকি ‘সহবাস’ করা নিরাপদ। আরেক অংশের দাবি, পোষ্য ছাড়াও অন্যান্য প্রাণীর প্রতি মানুষের যত্নশীল হওয়া নৈতিক দায়বদ্ধতা, আর মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসা প্রাকৃতিক। পোষ্য প্রাণীর প্রতি ভালোবাসা মানুষের প্রতি ভালোবাসার সমকক্ষ নয়।

বাংলাদেশে এ বিষয়ে নিয়মসিদ্ধ গবেষণা খুব একটা খুঁজে পাওয়া যায় না। তবে ঢাকার উত্তরা, গুলশান, বনানী, বারিধারা, ধানমন্ডি, মিরপুর, মোহাম্মদপুর, বনশ্রী, বসুন্ধরা এবং লালবাগ এলাকায় সিস্টেমেটিক স্যাম্পলিং (একটি পরিসংখ্যানগত নমুনায়ন পদ্ধতি, যেখানে একটি সুবিন্যস্ত তালিকা থেকে একটি নির্দিষ্ট ও নিয়মিত ব্যবধানে নমুনা নির্বাচন করা হয়) পদ্ধতি অনুসরণ করে ৩৩০টি আবাসিক ভবন, ৩০টি বাজার ও শপিংমল, ২০টি গণপরিবহন স্টেশন এবং পাঁচটি বস্তি থেকে গবেষক দল তথ্য সংগ্রহ করে দেখেছেন, ৩৯ শতাংশ অ্যাপার্টমেন্টে বিড়াল লালন-পালন করা হয়, যার ৮৭ শতাংশই বিদেশি প্রজাতির। গবেষণার তথ্য দেখাচ্ছে, বিড়াল পালনকারী পরিবারগুলোর শূন্য দশমিক ৯ শতাংশ পরিবারের প্রবীণ সদস্যকে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠিয়ে ‘দায়মুক্তি’ লাভ করেছেন। সম্প্রতি রাতের অন্ধকারে অসুস্থ বৃদ্ধ-বৃদ্ধাকে রাস্তায় ফেলে আসার কিছু ঘটনা ঘটেছে, যেখানে পরিবারগুলো ছিল দরিদ্র। কিন্তু গবেষণাভুক্ত পাঁচটি বস্তির ৮ দশমিক ৯ শতাংশ পরিবারে বিড়াল পালনের দৃশ্য প্রমাণ করে– অসুস্থ বৃদ্ধ-বৃদ্ধাকে রাতের অন্ধকারে রাস্তায় না ফেলে ভাঙা ঘরেই যত্নে রাখা সম্ভব। 

এদিকে অভিজাত এলাকায় বিড়ালের জন্য গড়ে ওঠা পেট শপ, ক্যাট হোটেল, গ্রুমিং স্যালনগুলোর মাসিক আয়-ব্যয়ের গণনা থেকে তাদের গড় আয় দাঁড়ায় দেড় থেকে দুই লাখ টাকা। আর একই এলাকায় মধ্যবিত্তদের জন্য গ্রোসারি শপ, খাবার হোটেল ও স্যালনের দোকানগুলোর মাসিক গড় আয় ৫০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা।

ঢাকা শহরে আশ্রয়হীন মানুষের প্রকৃত সংখ্যা কত, সে বিষয়ে সরকারি কোনো পরিসংখ্যান নেই। তবে ১৯৯৭ সালে বৈদেশিক সহায়তাপুষ্ট একটি সমীক্ষায় ঢাকায় ১৪ হাজার ৯৯৯ ব্যক্তিকে ‘হোমলেস’ বা ঠিকানাবিহীন হিসেবে গণ্য করা হয়েছিল। সেই প্রতিষ্ঠানের ২০১৬ সালের সমীক্ষায় উল্লেখ করা হয়েছে, ঢাকায় দুই লাখ ৮০ হাজারেরও বেশি ঠিকানাবিহীন মানুষ অবস্থান করছে। সংখ্যা বৃদ্ধির প্রবণতা পরিমাপের ফর্মুলায় গণনা করলে ঢাকায় বর্তমান ঠিকানাবিহীন মানুষের সংখ্যা পাঁচ লাখ ছাড়িয়ে যায়।

ঢাকা শহরের উচ্চ ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিড়াল পালন একটি তাৎপর্যপূর্ণ অর্থনৈতিক খাত ‘পেট ইকোনমি’ তৈরি করছে, যা মানবিক কাজে আর্থিক অংশগ্রহণকে ক্রমশ সীমিত করছে। পেট ইকোনমির মাত্র ২৫ শতাংশ অর্থ ব্যয় করে প্রতিবছর ২০-২৫ হাজার গরিব মানুষের তিনটি মৌলিক চাহিদা (খাদ্য, ওষুধ ও পোশাক) নিশ্চিত করা সম্ভব। অতিরিক্ত আরও ১০ শতাংশ অর্থ দিয়ে ঠিকানাবিহীন মানুষদের অন্য দুটি মৌলিক চাহিদাও (শিক্ষা ও বাসস্থান) পূরণ করা সম্ভব।

গবেষণায় অংশগ্রহণকারী অভিভাবকরা ঢাকার তরুণ-তরুণীদের মধ্যে তিনটি আসক্তিকে গুরুতর হিসেবে চিহ্নিত করেছেন– (১) ডিজিটাল ডিভাইসের অতিরিক্ত ব্যবহার, (২) বিড়াল পালন এবং (৩) মাদকদ্রব্য সেবন। তাদের মতে, এসব আসক্তির মূল কারণ পরিবারে বন্ধনহীনতা। প্রতিনিয়ত প্রবীণ ও তরুণ প্রজন্মের মধ্যে মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব বাড়ছে। বয়স্করা জড়িয়ে পড়ছেন অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতায়, আর তরুণরা আত্মমগ্ন হয়ে পড়ছে সোশ্যাল মিডিয়ার ভার্চুয়াল জগতে। সেই ভার্চুয়াল বাস্তবতাই আজ অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করছে তাদের আবেগ-অনুভূতি। অন্যদিকে একাংশ তরুণ মাদকের ফাঁদে আটকে পড়ছে। ফলে ক্ষতিকর আসক্তির সম্ভাব্য পরিণতি বিবেচনায় পরিবারের পক্ষ থেকেও তুলনামূলক নিরাপদ আসক্তি হিসেবে বিড়াল পালনের প্রবণতাকে কিছুটা পৃষ্ঠপোষকতা করা হচ্ছে। 

বিড়ালের প্রতি মমতা নিঃসন্দেহে মানবিক। কিন্তু যদি সেই মমতা মানুষ থেকে মানুষে না পৌঁছায়, তবে সেটি কেবলই আত্মতৃপ্তির অলংকার। নিজের ঘরের বিড়ালের যত্নের আগে রাস্তায় কাঁদতে থাকা শিশুটির মুখে একটু হাসি ফোটানোর উদ্যোগ নেওয়া আমাদেরই কর্তব্য।

গতের সকল প্রাণী সুখী হোক; তারও আগে সব ধরনের দুঃখ-কষ্ট থেকে মুক্ত হোক সকল মানুষ।

রানা ভিক্ষু: লেখক, গবেষক ও নীতি বিশ্লেষক 

আরও পড়ুন

×