সমাজ
নতুন রাজনীতি হোক সৃষ্টির জন্য
আনুশেহ আনাদিল
আনুশেহ আনাদিল
প্রকাশ: ১৪ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৬:৪২
| প্রিন্ট সংস্করণ
প্রতিটি দেশে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যখন সাধারণ মানুষকে উঠে দাঁড়াতে হয়–রাগ নয়, সহিংসতা নয়; বরং স্বচ্ছতার সঙ্গে। বাংলাদেশ আজ এমন এক মুহূর্তে দাঁড়িয়ে আছে। এমন এক সময়, যখন শব্দের গুরুত্ব আমাদের পদক্ষেপের মতোই গভীর। যখন আমরা কীভাবে এক হই, সেটাই ভবিষ্যৎকে বদলে দিতে পারে।
অনেক দিন ধরে আমরা শুনে এসেছি–রাজনীতি নাকি ক্ষমতাবানদের, ধনীদের, প্রভাবশালীদের বিষয়। বহু বছর ধরে রাজনীতিকে সংকুচিত করা হয়েছে সংঘর্ষে, দুর্নীতিতে, ক্ষমতার খেলায়। এই পুরোনো রাজনীতি আমাদের গভীরভাবে আঘাত করেছে। এটি আমাদের পরস্পরের প্রতি সন্দেহশীল করেছে, যদিও আমাদের সংগ্রাম একই। আমাদের বিশ্বাস করানো হয়েছে যে কথা বলা মানেই বিভাজন, কাজ করা মানেই ঝুঁকি, আর নীরবতাই নাকি নিরাপদ।
কিন্তু রাজনীতি–খাঁটি রাজনীতি–কখনোই এমন ছিল না। সত্যিকারের রাজনীতি মানে মানুষ তাদের যৌথ জীবনকে গড়ে তোলা। এটি নাগরিক, মানবিক, সম্মিলিত দায়িত্ব। সত্যিকারের রাজনীতি হচ্ছে মানুষের কথা শোনা। মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার যত্ন নেওয়া। এটি জনগণ ও জনপ্রতিনিধি উভয়ের দায়িত্বশীলতার প্রশ্ন। সত্যিকারের রাজনীতি হচ্ছে একে অপরকে বারবার দেখতে শেখা। একবার দেখেই সিদ্ধান্ত না নেওয়া বা হাল ছেড়ে না দেওয়া।
আজ মানুষ যখন এক হতে প্রস্তুতি নিচ্ছে–কেউ বলছে প্রতিবাদ, কেউ বলছে আন্দোলন–শব্দ নিয়ে মতভেদ তৈরি হয়েছে। কেউ ‘রাজনৈতিক’ শব্দটি শুনে আপত্তি জানাচ্ছে। কেউ ভয় পাচ্ছে ভাষা আবার বিভেদ সৃষ্টি করবে। কেউ আশঙ্কা করছে শব্দ আবার অস্ত্র হয়ে উঠবে।
এসব উদ্বেগ সত্যি। বস্তুত এগুলো আমাদের সবার ক্ষতের প্রতিধ্বনি। কিন্তু বিভেদের ভয় যাতে মর্যাদার দাবি চাপা না দেয়–আমরা তা হতে দিতে পারি না। গতকালের ব্যর্থ রাজনীতি যাতে আগামীর বাংলাদেশ তৈরিতে বাধা দেয়–আমরা তা হতে দিতে পারি না। এক হতে হলে আমাদের শব্দ বেছে নিতে হবে কৃষকের মতো–যেভাবে কৃষক বীজ বেছে নেন: নরম হাতে, উদ্দেশ্য নিয়ে, কারণ তিনি জানেন যে যা রোপণ করবেন, তা-ই বেড়ে উঠবে।
কথা হচ্ছে, রাজনীতিতে আমাদের প্রয়োজন জলের ভাষা, আগুনের নয়। আমাদের প্রয়োজন এমন শব্দ, যা শান্ত করে, উত্তেজিত নয়; যা আমন্ত্রণ জানায়, বহিষ্কার করে না। রাজনীতিতে আমাদের প্রয়োজন ধর্ম, পরিচয়, মত–সবকিছুর ঊর্ধ্বে উঠে মানুষের ঐক্যবদ্ধ হওয়া।
আমাদের দরকার কোমল শক্তি; এর অর্থ দুর্বলতা নয়। আমাদের প্রয়োজন নম্রতার শক্তি; এর অর্থ মেনে নেওয়া নয়। আমাদের প্রয়োজন শোনার জ্ঞান; এর অর্থ নিজের কথা না বলা হয়। আমাদের দরকার পরস্পরের প্রতি যে কোনো পরিস্থিতিতে সহমর্মিতার সাহস।
মনে রাখতে হবে ক্ষোভ, ক্রোধ ও রাগ একা কোনো দেশকে বদলায় না। দেশ বদলায় তখন, যখন মানুষ আবার একে অপরকে বুঝতে শেখে; যখন মানুষ বুঝতে পারে ভিন্নতা কোনো বাধা নয়, বরং শক্তির উৎস। আমরা তাদের কাছ থেকে শিখি, যারা আমাদের মতো নয়। আমরা বেড়ে উঠি যখন নিজেদের বদলে যেতে দিই।
এই কারণে রাজনৈতিক কারণে আমাদের সমবেত হওয়া যুদ্ধের জন্য সমবেত হওয়ার মতো নয়; রাজনীতিতে প্রতিপক্ষ থাকবে, কিন্তু সেটিকে যুদ্ধ বলা যাবে না। না লড়াই, না সংঘর্ষ। রাজনীতি হতে হবে একটি নাগরিক সমাবেশ–একটি সম্মিলিত আহ্বান, মর্যাদা, ন্যায়, আর সবার ভবিষ্যতের জন্য।
নাগরিক সমাবেশ রাজনৈতিক–সত্যিকারের অর্থে; কিন্তু এতে দলীয় রাজনীতির তিক্ততা নেই। এতে গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব নেই। এতে গোপন এজেন্ডা নেই। এতে আছে কেবল আমন্ত্রণ: এসো, বসো। এসো, শোনো। এসো, বলো। এসো, কল্পনা করো। এসো, গড়ে তুলি। দেশকে এবং নিজেকে।
মানুষ এই মনোভাবে ঐক্যবদ্ধ হলে কিছু বদলে যায়। ভয় কোমল হয়। রাগের দখল ঢিলা হয়ে যায়। অচেনারা সহযোদ্ধা হয়। বিভেদ সেতুতে পরিণত হয়। দেশ আবার শ্বাস নিতে সক্ষম হয়।
তবে সত্যি বলতে–জাগরণ কখনও আরামদায়ক হয় না। এটি পুরোনো মিথ ভেঙে দেয়। এটি আমাদের দীর্ঘদিনের অভ্যাসকে প্রশ্ন করতে শেখায়। এটি আমাদের জিজ্ঞেস করায় কেন আমরা এতদিন লেবেল, প্রচারণা, ভয়–এসবের দ্বারা আলাদা হয়ে থাকতে দিলাম।
জাগরণের জন্য লাগে সাহস–সেই নদীর মতো সাহস, যে নীরবে পাথর কেটে পথ তৈরি করে। এটাই এখন আমাদের দরকার। আমাদের দরকার সৃষ্টির রাজনীতি। যে রাজনীতি গড়ে তোলে, বেড়ে ওঠে, নিরাময় করে। যে রাজনীতি শিল্প, সংগীত, গল্প, কমিউনিটি থেকে জন্মায়। যেখানে প্রতিটি মানুষের জায়গা আছে, প্রতিটি কণ্ঠের মূল্য আছে, প্রতিটি স্বপ্ন শ্বাস নিতে পারে।
বাংলাদেশ জন্ম নিয়েছিল কল্পনা আর বিপ্লবের মিলন থেকে। বস্তুত সৃষ্টি আমাদের রক্তে। এই ব-দ্বীপ আমাদের শেখায় কিছুই স্থির নয়–ভূমি বদলায়, নদী নিজেকে পুনর্গঠন করে, জীবন ঋতুর পর ঋতু পুনর্জন্ম নেয়। আমাদের রাজনীতি কেন বদলাবে না?
রাজনীতি বদলাচ্ছে না; কারণ আমরা সঠিক বার্তা দিতে পারছি না। আমরা এই বার্তা দিতে পারছি না যে, আমরা ভাঙতে উঠছি না; আমরা শুরু করতে উঠছি। আমরা লড়াই করতে এক হচ্ছি না; আমরা জাগতে এক হচ্ছি। আমরা অতীতের ভুল পুনরাবৃত্তি করতে এক হচ্ছি না; আমরা ভবিষ্যৎ গড়তে এক হচ্ছি।
এটাই হোক নতুন রাজনীতির বার্তা। এটাই হোক নতুন রাজনীতির ব্যানার। এটাই হোক আমাদের রাজনীতি– নরম, কিন্তু রূপান্তর করার মতো শক্তিশালী। আমরা এক হচ্ছি সৃষ্টি করতে। আর সৃষ্টি–এটাই সবচেয়ে গভীর প্রতিবাদ।
আনুশেহ আনাদিল: সংগীতশিল্পী ও সমাজকর্মী
- বিষয় :
- আনুশেহ আনাদিল
