ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

অভিবাসী দিবস

প্রবাসী শ্রমিকদের অবহেলা আর কত

প্রবাসী শ্রমিকদের অবহেলা আর কত
×

আবু আহমেদ ফয়জুল কবির

প্রকাশ: ১৮ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৬:৪৬

| প্রিন্ট সংস্করণ

আজ আন্তর্জাতিক অভিবাসী দিবস। বাংলাদেশ বিশ্ব শ্রমবাজারে অন্যতম প্রধান শ্রমিক প্রেরণকারী দেশ হিসেবে আমাদের জন্য দিবসটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। দেশের লাখ লাখ নারী-পুরুষ জীবিকার সন্ধানে দেশের সীমানা পেরিয়ে বিশ্বের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছেন, যাদের শ্রম ও ঘামে দাঁড়িয়ে আছে দেশের অর্থনীতির একটি শক্ত ভিত। 

বাংলাদেশি কর্মীদের শীর্ষ গন্তব্য সৌদি আরব। দ্বিতীয় অবস্থানে আছে মালয়েশিয়া। বাংলাদেশের অভিবাসী শ্রমিকরা শুধু যে রেমিট্যান্স পাঠান, তা নয়; তারা গ্রামীণ অর্থনীতিকে সচল রাখেন, লাখো পরিবারের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন। প্রবাসী আয় দারিদ্র্য হ্রাস, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, এই বিশাল অবদানের বিপরীতে অভিবাসী শ্রমিকরা আজও বেশি অবহেলা ও বঞ্চনার শিকার।   

বাংলাদেশের অভিবাসন বাস্তবতায় দালাল ও মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব এখনও প্রকট। অতিরিক্ত টাকা আদায়, ভুয়া ভিসা, ভিন্ন কাজের চুক্তি, এমনকি মানব পাচারের মতো ভয়াবহ অপরাধের শিকার হচ্ছেন বহু মানুষ। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয়, এসব প্রতারণার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে খুব কম ক্ষেত্রেই আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হয়। ফলে দালাল চক্র বারবার নতুন নামে, নতুন কৌশলে ফিরে আসে।

অন্যদিকে নারী অভিবাসী শ্রমিকদের অভিজ্ঞতা আরও কঠিন। গৃহকর্মী হিসেবে বিদেশে যাওয়া অনেক নারী শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, যৌন সহিংসতা, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা ও মজুরি বঞ্চনার শিকার হন। অনেক সময় তাদের পাসপোর্ট কেড়ে নেওয়া হয়; যোগাযোগের সুযোগ করা হয় সীমিত। দেশে থাকা পরিবারও তাদের দুর্ভোগ সম্পর্কে তৎক্ষণাৎ জানতে পারে না। তারা ক্ষেত্রবিশেষ কারও সহযোগিতায় তার ওপর নির্যাতনের কথা জানাতে পারে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে জানাতে না পেরে নির্যাতন সয়েই টিকে থাকার চেষ্টা করে। এই বাস্তবতা মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার অধরাই থেকে

যায়।
বাংলাদেশ সরকার অভিবাসন ব্যবস্থাপনায় বিভিন্ন আইন ও নীতিমালা প্রণয়ন করেছে। ‘বিদেশে কর্মসংস্থান ও অভিবাসী আইন’ একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হলেও এর বাস্তব প্রয়োগ এখনও দুর্বল। আইন কার্যকর করতে হলে কয়েকটি বিষয়ে অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি। প্রথমত, রিক্রুটিং এজেন্সি ও মধ্যস্থতাকারীদের ওপর কঠোর ও নিয়মিত নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে লাইসেন্স বাতিলসহ দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা থাকতে হবে। দ্বিতীয়ত, অভিবাসনের পুরো প্রক্রিয়ায় ডিজিটাল স্বচ্ছতা বাড়াতে হবে, যাতে চুক্তি, ব্যয় ও গন্তব্য-সংক্রান্ত তথ্য সহজে যাচাই করা যায়।

অভিবাসনের আগে শ্রমিকদের জন্য মানসম্মত প্রাক-প্রস্থান প্রশিক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই প্রশিক্ষণ শুধু কাজের দক্ষতায় সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; শ্রমিকদের তাদের অধিকার, আইনি সুরক্ষা, কূটনৈতিক সহায়তা পাওয়ার উপায় এবং জরুরি যোগাযোগ ব্যবস্থার বিষয়ে পরিষ্কার ধারণা দিতে হবে। নারী শ্রমিকদের জন্য আলাদা প্রশিক্ষণ ও সুরক্ষা ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন, যাতে তারা ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুত থাকতে পারেন।

বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য দূতাবাস ও মিশনগুলোর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বাস্তবতা হলো জনবল সংকট, সীমিত সম্পদ এবং প্রশাসনিক জটিলতার  কারণে অনেক সময় তারা প্রত্যাশিত সহায়তা দিতে পারে না। তবে অভিবাসনের চ্যালেঞ্জ শুধু বিদেশে গিয়ে শেষ হয় না। দেশে ফিরে আসা শ্রমিকদের পুনর্বাসন একটি বড় সমস্যা। বহু প্রবাসী শ্রমিক শারীরিকভাবে অসুস্থ, মানসিকভাবে বিপর্যস্ত বা অর্থনৈতিকভাবে নিঃস্ব হয়ে ফিরে আসেন। তাদের জন্য পুনঃদক্ষতা উন্নয়ন, সামাজিক সুরক্ষা এবং সম্মানজনক কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। ফেরত আসা শ্রমিকদের অভিজ্ঞতা ও দক্ষতাকে জাতীয় উন্নয়নে কাজে লাগানো গেলে তা হবে একটি টেকসই সমাধান।

অভিবাসন কোনো একমুখী লাভের পথ নয়। এটি রাষ্ট্র, সমাজ এবং ব্যক্তির সম্মিলিত দায়বদ্ধতার বিষয়। অভিবাসীরা কেবল শ্রমিক নন; তারা নাগরিক, তারা মানুষ। তাদের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও অধিকার নিশ্চিত করা নৈতিক ও সাংবিধানিক দায়িত্ব। আশার কথা, এবারই প্রথম আমাদের প্রবাসীরা আসন্ন জাতীয় সংসদ  নির্বাচন ও গণভোটে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে যাচ্ছেন, যা দীর্ঘদিনের দাবি ছিল অভিবাসী শ্রমিকদের পক্ষ থেকে। 

রাজনৈতিক ও সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকেও প্রবাসীরা একটি বড় শক্তি হিসেবে কাজ করেন। বিশেষত ২০২৪ সালের জুলাই মাসে এ দেশে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে অভিবাসী শ্রমিকরা ভিন্ন ভিন্ন দেশ ও নিজস্ব অবস্থান থেকে বিক্ষোভ করে জানান দেন, ছত্র-জনতার ওপর সংঘটিত হামলার ঘটনা ছিল বেআইনি ও অগ্রহণযোগ্য। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও তা ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল।  সে সময়ে অভিবাসীদের পক্ষ থেকে  বিভিন্ন দেশ থেকে দেশে রেমিট্যান্স পাঠানো বন্ধ করে দেওয়ার ঘোষণা ছিল বিগত সরকারের প্রতি অনাস্থার বহিঃপ্রকাশ।    

আন্তর্জাতিক অভিবাসী দিবসে আমাদের প্রত্যাশা, অভিবাসনকে নিরাপদ, নিয়মিত ও মানবিক করার একটি স্পষ্ট অঙ্গীকার থাকতে হবে। যে মানুষগুলো দেশের অর্থনীতির ভার বহন করছে, তারা যেন আর অনিশ্চয়তা, নির্যাতন ও অবহেলার শিকার না হয়। 

আবু আহমেদ ফয়জুল কবির: মানবাধিকার কর্মী

আরও পড়ুন

×