ইসলাম ও সমাজ
ইসলামে দেশপ্রেম
মো. শাহজাহান কবীর
প্রকাশ: ১৯ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৬:৫২
| প্রিন্ট সংস্করণ
দেশপ্রেম মানুষের একটি স্বাভাবিক ও মহান অনুভূতি। মানুষ জন্মসূত্রে যে ভূখণ্ডে বেড়ে ওঠে, যে মাটিতে তার শৈশব কাটে, যে সমাজ ও সংস্কৃতির মধ্যে তার পরিচয় গড়ে ওঠে, সে দেশের প্রতি ভালোবাসা তার হৃদয়ে সহজাতভাবেই জন্ম নেয়। ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা হিসেবে মানুষের এই স্বাভাবিক অনুভূতিকে অস্বীকার করে না; বরং সঠিক নীতিমালা ও সীমার মধ্যে রেখে দেশপ্রেমকে সমর্থন এবং তা কল্যাণকর পথে পরিচালিত করে।
ইসলামে দেশপ্রেম বলতে দেশের মানুষ, সমাজ ব্যবস্থা, ন্যায়বিচার, শান্তি, নিরাপত্তা ও সামগ্রিক কল্যাণে আন্তরিকভাবে কাজ করাকেই দেশপ্রেম বলা হয়। একজন মুসলমান তার দেশকে ভালোবাসবে; দেশের উন্নতির জন্য চেষ্টা করবে। তবে এই ভালোবাসা কখনোই অন্যায়, জুলুম, অহংকার কিংবা সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদে রূপ নেবে না– এটাই ইসলামের শিক্ষা।
আল্লাহতায়ালা সুরা হুদের ৬১ আয়াতে এরশাদ করেন, তিনি তোমাদের পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন এবং তাতে তোমাদের জন্য জীবিকার ব্যবস্থা করেন। এ আয়াত থেকে বোঝা যায়, মানুষ পৃথিবীতে আল্লাহর প্রতিনিধি বা খলিফা। সুতরাং নিজের দেশ ও সমাজকে সুন্দরভাবে গড়ে তোলা, নিরাপদ রাখা এবং কল্যাণ সাধন করা তার দায়িত্ব।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনে দেশপ্রেমের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। তিনি জন্মভূমি মক্কাকে অত্যন্ত ভালোবাসতেন। হিজরতের সময় মক্কা ত্যাগ করতে গিয়ে তিনি আবেগভরে বলেছিলেন– ‘হে মক্কা! তুমি আমার কাছে কতই না প্রিয়! যদি আমার জাতি আমাকে তোমার থেকে বের করে না দিত, তবে আমি কখনোই তোমাকে ছেড়ে যেতাম না’ (তিরমিজি)। এ হাদিস স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে– জন্মভূমির প্রতি ভালোবাসা নবীজির সুন্নাহ এবং ইসলামে তা গ্রহণযোগ্য।
তবে ইসলাম দেশপ্রেমের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমারেখা নির্ধারণ করে দিয়েছে। ইসলাম অন্ধ জাতীয়তাবাদ, গোত্রীয় অহংকার বা অন্য জাতিকে তুচ্ছ করার মানসিকতা সমর্থন করে না। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি গোত্রীয় বা জাতিগত অহংকারের দিকে আহ্বান করে, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।’ (আবু দাউদ)
অতএব, দেশপ্রেম এমন হতে হবে, যা ন্যায়, মানবতা ও আল্লাহভীতির পরিপন্থি নয়। ইসলামে দেশপ্রেম কেবল আবেগ বা স্লোগানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং বাস্তব কাজের মাধ্যমে তা প্রকাশ পায়। যেমন– দেশের আইন মেনে চলা, শৃঙ্খলা বজায় রাখা, দুর্নীতি ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া, শিক্ষা ও নৈতিকতা বিস্তারে ভূমিকা রাখা, দেশের সম্পদ রক্ষা এবং মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় কাজ করা। একজন মুসলমান যখন এসব দায়িত্ব নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করে, তখনই সে প্রকৃত অর্থে দেশপ্রেমিক হিসেবে পরিচিত হয়।
এ ছাড়াও ইসলামে দেশপ্রেমের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, মানুষের কল্যাণে আত্মত্যাগ। দেশের সংকটকালে মানুষের পাশে দাঁড়ানো, দুর্যোগে সাহায্য, অসহায়দের সহযোগিতা এবং সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা ইসলামের দৃষ্টিতে অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ কাজ। এসব কাজ শুধু দেশপ্রেমের পরিচয়ই নয়, বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনেরও মাধ্যম।
ইসলাম দেশপ্রেমের পাশাপাশি বিশ্বজনীন ভ্রাতৃত্বের শিক্ষা দেয়। একজন মুসলমান নিজের দেশকে ভালোবাসবে। একই সঙ্গে অন্য দেশের মানুষের প্রতি ন্যায় ও সহানুভূতিশীল থাকবে।
পবিত্র কোরআনের সুরা হুজুরাতের ১৩ আয়াতে আল্লাহতায়ালা এরশাদ করেন, ‘হে মানুষ! আমি তোমাদের এক পুরুষ ও এক নারী থেকে সৃষ্টি করেছি এবং তোমাদের বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি, যেন তোমরা পরস্পর পরিচিত হতে পারো।’ এ আয়াত প্রমাণ করে– ইসলাম জাতিগত বিভেদ নয়, বরং পারস্পরিক সম্মান ও সহযোগিতার শিক্ষা দেয়।
ড. মো. শাহজাহান কবীর: বিভাগীয় প্রধান, ইসলামিক স্টাডিজ, ফারইস্ট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ঢাকা
- বিষয় :
- ইসলাম
