রাজনীতি
নির্বাচনী ট্রেনের প্রস্তুতি ও গতি
কাজী মারুফুল ইসলাম
প্রকাশ: ১৯ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৬:৫৯ | আপডেট: ১৯ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৭:০০
| প্রিন্ট সংস্করণ
জু লাই গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশ এক অদ্ভুত রাজনৈতিক সময় পার করছে। বহু প্রতীক্ষিত জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের তপশিল ঘোষণার মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিক ক্ষণ গণনা শুরু হয়েছে। ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন– তারিখ হিসেবে খুব বেশি দূরে নয়। নির্বাচন কমিশন, সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলো দৃশ্যত আয়োজনের মধ্যেই আছে। প্রচার-প্রস্তুতি, প্রার্থী বাছাই, জোট গঠন– সবই চলছে। তবু নির্বাচন হবে কিনা– সংশয় রয়েছে অনেকের মধ্যেই। এই সংশয় নিছক গুজব বা রাজনৈতিক কৌশল নয়। এর পেছনে রয়েছে বাস্তব অভিজ্ঞতা ও কাঠামোগত উদ্বেগ। গণতন্ত্রে নির্বাচন শুধু একটি তারিখ নয়; আস্থার প্রশ্ন। সেই আস্থায় এখনও বড় ধরনের ফাটল রয়ে গেছে। এই ফাটলের সবচেয়ে বড় উৎস দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি। বিশেষ করে তরুণ রাজনৈতিক কণ্ঠ শরিফ ওসমান হাদির ওপর ঘৃণ্য হত্যাচেষ্টা রাজনৈতিক অঙ্গনে ও সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে গভীর আতঙ্ক তৈরি করেছে। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। গত বছরের আগস্টের পর থেকে রাজনৈতিক সহিংসতা, হুমকি ও নিরাপত্তাহীনতার বোধ ক্রমাগত জমে উঠছে। নারায়ণগঞ্জে বিএনপির মনোনয়নপ্রাপ্ত এক প্রার্থীর নিরাপত্তার অভাব দেখিয়ে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত এই বাস্তবতারই নগ্ন প্রকাশ।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানে ম্যাক্স ওয়েবার রাষ্ট্রকে সংজ্ঞায়িত করেছিলেন ‘বৈধ সহিংসতার একচেটিয়া অধিকার’-এর মাধ্যমে। কিন্তু যখন নাগরিক ও রাজনৈতিক কর্মীরা রাষ্ট্রের কাছ থেকেই নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত হন, তখন সেই বৈধতার ভিত নড়বড়ে হয়ে যায়। এই প্রেক্ষাপটেই স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার পদত্যাগ দাবি সমাজের নানা স্তর থেকে উঠেছে এবং ক্রমেই তা জোরালো হচ্ছে। যদিও সরকার এই দাবিকে দৃশ্যমানভাবে আমলে নিচ্ছে না। বরং নিরাপত্তা সংকট মোকাবিলায় সরকার যে সমাধান হাজির করেছে, তা আরও উদ্বেগজনক। গুরুত্বপূর্ণ প্রার্থী ও রাজনৈতিক নেতাদের বৈধ অস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়ার সিদ্ধান্ত স্বল্প মেয়াদে কিছু ব্যক্তিকে নিরাপত্তাবোধ দিলেও দীর্ঘ মেয়াদে এটি সহিংসতার ঝুঁকি কমাবে না, বরং বাড়াতে পারে। লাতিন আমেরিকার বহু দেশে নির্বাচনের আগে অস্ত্রের বিস্তার কীভাবে রাজনৈতিক সহিংসতাকে স্বাভাবিক করে তুলেছে, তার অভিজ্ঞতা আমাদের সামনে রয়েছে। রাষ্ট্রের দায়িত্ব নিরাপত্তা ব্যক্তীকরণ নয়, বরং নিরস্ত্রীকরণ ও আইনের শাসন নিশ্চিত করা।
এই অস্থিরতার মধ্যেই বিএনপি ডিসেম্বরজুড়ে এক ধরনের দিশাহীন সময় পার করেছে। খালেদা জিয়ার অসুস্থতা এবং তারেক রহমানের দেশে ফেরা নিয়ে অনিশ্চয়তা দলটির কৌশলগত স্পষ্টতাকে দুর্বল করেছিল। যদিও তারেক রহমান দীর্ঘদিন ধরেই দলের মূল নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন; বাস্তব রাজনীতিতে ‘দূরবর্তী নেতৃত্ব’ আর ‘মাঠে উপস্থিত নেতৃত্ব’ এক নয়। দেশে ফিরে সরাসরি নেতৃত্ব দেওয়া রাজনৈতিকভাবে ভিন্ন মাত্রা তৈরি করে।
২৫ ডিসেম্বর তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তনের ঘোষণার পর বিএনপির মধ্যে সেই অনিশ্চয়তা অনেকটাই কেটে গেছে বলে মনে হচ্ছে। তাঁকে ঘিরে দলের ব্যাপক প্রস্তুতি চলছে। এই প্রত্যাবর্তন শুধু বিএনপির জন্য নয়; সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের নির্বাচনী রাজনীতির জন্য একটি সম্ভাব্য ‘গেম চেঞ্জার’। এটি প্রতিযোগিতাকে বাস্তব ও দৃশ্যমান করতে পারে, যা যে কোনো অর্থবহ নির্বাচনের জন্য অপরিহার্য।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের স্মারক বহনকারী দল এনসিপি শুরুতে নির্বাচন ও সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে দোদুল্যমানতায় ভুগলেও সাম্প্রতিক সময়ে তুলনামূলক সংহত অবস্থান নিচ্ছে। ১২৫ আসনে প্রার্থী চূড়ান্ত করা এবং এবি পার্টি ও রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সঙ্গে ‘সংস্কার জোট’ গঠন তারই ইঙ্গিত। রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সঙ্গে জোটকে অনেকেই এনসিপির মধ্যপন্থার দিকে সরে আসা হিসেবে দেখছেন। যখন বাংলাদেশে কট্টর ডানপন্থার উত্থান লক্ষণীয়, তখন এ ধরনের মধ্যপন্থি সংস্কারভিত্তিক জোট সাধারণ ভোটারদের কাছে একটি স্বস্তিদায়ক বিকল্প হয়ে উঠতে পারে।
অন্যদিকে জামায়াত এখনও তার পুরোনো রাজনীতির গণ্ডিতেই আবদ্ধ। মহান বিজয় দিবস সামনে রেখে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতির নতুন প্রচারণা তারই প্রমাণ। তবু নির্বাচনী প্রস্তুতির দিক থেকে জামায়াত দৃশ্যমানভাবে অনেক প্রতিদ্বন্দ্বীর চেয়ে এগিয়ে, এটি অস্বীকার করার উপায় নেই। সাংগঠনিক প্রস্তুতি আর আদর্শিক গ্রহণযোগ্যতা যে এক জিনিস নয়– সেটিই এখানে বড় প্রশ্ন।

আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকলেও দেশের ভেতরে ও বাইরে তাদের নানা তৎপরতা চলমান। এই তৎপরতা একটি শান্তিপূর্ণ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন আয়োজনের ক্ষেত্রে সহায়ক নয়। যে দল বা পক্ষই নির্বাচনকে বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করুক, এই মুহূর্তে তা জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় শূন্য। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মধ্যে এখনও কোনো অনুশোচনা বা আত্মসমালোচনার প্রবণতা দৃশ্যমান নয়, যা গণতান্ত্রিক পুনর্গঠনের পথে বড় অন্তরায়।
প্রশ্ন হলো, কেমন নির্বাচন হবে এবং তার মধ্য দিয়ে কেমন রাষ্ট্র ও সমাজ গড়ে উঠবে? একটা গণতন্ত্র, বৈষম্যহীনতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র নির্মাণের যে আকাঙ্ক্ষা জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে সামনে এসেছে, তার বাস্তবায়ন অনেকটা নির্ভর করছে এই নির্বাচনের ওপর। এ নির্বাচন ব্যর্থ হলে শুধু রাজনৈতিক প্রক্রিয়াই নয়; একটি প্রজন্মের আশা ভেঙে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।
এ প্রেক্ষাপটে নির্বাচন কমিশনের প্রস্তুতিও আলাদা করে আলোচনার দাবি রাখে। কমিশন প্রশাসনিক ও কারিগরি প্রস্তুতির কথা বলছে। ভোটার তালিকা, কেন্দ্র, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বয়– সবই দৃশ্যত এগোচ্ছে। কিন্তু আধুনিক নির্বাচনে প্রস্তুতি শুধু লজিস্টিকস নয়; বিশ্বাসযোগ্যতারও প্রশ্ন। সেই বিশ্বাসযোগ্যতা বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে অপতথ্য ও মিথ্যা তথ্য প্রচারের মাধ্যমে।
আসন্ন নির্বাচন ঘিরে অনলাইনে অপতথ্য ও মিথ্যা তথ্যের বিস্তার ইতোমধ্যে উদ্বেগজনক রূপ নিয়েছে। সামাজিক মাধ্যমে গুজব, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভিডিও ক্লিপ, ভুয়া বক্তব্য ছড়িয়ে জনমতকে প্রভাবিত করার চেষ্টা নতুন নয়। তবে এবার এর মাত্রা ও সংগঠিত রূপ আরও স্পষ্ট। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অনলাইন-বুলিং, বিশেষ করে সাংবাদিক, রাজনৈতিক কর্মী ও ভিন্নমতাবলম্বীদের লক্ষ্য করে চরিত্র হনন ও হুমকি। এ পরিস্থিতিতে গণমাধ্যমের স্বাধীন ও দায়িত্বশীল ভূমিকা নির্বাচনকে বিশ্বাসযোগ্য করার অন্যতম শর্ত।
ঠিক এই জায়গাতেই সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি উঠছে বাকস্বাধীনতা নিয়ে। সাংবাদিক আনিস আলমগীরকে সন্ত্রাস দমন আইনে আটক দেখানোর ঘটনা একটি ভয়ংকর নজির। নির্বাচনকালে যখন গণমাধ্যমের কাজ হওয়া উচিত ক্ষমতা ও প্রক্রিয়ার ওপর নজরদারি, তখন সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে এ ধরনের আইন প্রয়োগ স্বাভাবিকভাবেই আতঙ্ক তৈরি করে। রাজনৈতিক তত্ত্বে বলা হয়, নির্বাচন হয় ‘ফ্রি অ্যান্ড ফেয়ার’ তখনই, যখন নাগরিকরা ভয় ছাড়া কথা বলতে পারে। ভয় ও নিয়ন্ত্রণের পরিবেশে নির্বাচন হয় কেবল প্রক্রিয়াগত; গণতান্ত্রিক নয়।
এই বাস্তবতায় নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব শুধু ভোটের আয়োজন নয়; বরং মতপ্রকাশের ন্যূনতম গণতান্ত্রিক পরিসর রক্ষার ক্ষেত্রেও স্পষ্ট অবস্থান নেওয়া। কারণ বাকস্বাধীনতা ছাড়া নির্বাচন হয়, কিন্তু গণতন্ত্র হয় না। এখন দেখার বিষয়, রাষ্ট্র এই সময়কে ইতিহাসের দায় হিসেবে নেয়, নাকি আরেকটি হারানো সুযোগে পরিণত করে।
কাজী মারুফুল ইসলাম: অধ্যাপক, উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
- বিষয় :
- কাজী মারুফুল ইসলাম
