সাক্ষাৎকার : শশী থারুর
আমরা বাংলাদেশে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের পক্ষে
শশী থারুর
সমকালের সহসম্পাদক ইফতেখারুল ইসলাম
প্রকাশ: ২৩ ডিসেম্বর ২০২৫ | ০৭:০০
| প্রিন্ট সংস্করণ
ভারতের জাতীয় কংগ্রেস থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য এবং দেশটির পররাষ্ট্রবিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান শশী থারুর বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলেছেন ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের সঙ্গে। সাক্ষাৎকারে তিনি নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অধীনে বাংলাদেশের ঘটনাবহুল পরিস্থিতি, ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নিয়ে কথা বলেছেন। প্রতিবেশী দেশটিতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে ভারত কী করতে পারে– এ ব্যাপারেও কথা বলেছেন। সাংবাদিক মনোজ সিজির নেওয়া সাক্ষাৎকারটি ঈষৎ পরিমার্জন সহকারে ভাষান্তর করেছেন সমকালের সহসম্পাদক ইফতেখারুল ইসলাম।
বাংলাদেশের পরিস্থিতি কি শেখ হাসিনা-পরবর্তী সময়ে জামায়াতে ইসলামীর ক্ষমতায়নের প্রতিফলন?
এটা আংশিকভাবে তাই। কিন্তু এখানে আরও অনেক ব্যাপার আছে। এই পরিস্থিতি বিপুলসংখ্যক আইনবিরোধী শক্তির ক্ষমতায়নের প্রতিফলন, যাদের হাসিনা তাঁর স্থিতিশীল শাসনামলে দমন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। এটা সত্য, হাসিনা যতটা গণতান্ত্রিক হওয়া উচিত ছিল ততটা ছিলেন না। বিশেষ করে তিনি খালেদা জিয়ার বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির মতো শক্তিগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করতে ব্যর্থ হয়েছেন।
ছাত্র নেতৃত্বাধীন গণঅভ্যুত্থানের পর যা ঘটেছে তা হলো মবতন্ত্রের সংমিশ্রণ। এদের মধ্যে রয়েছে ছাত্র আন্দোলনকালে সম্মুখ সারিতে উঠে আসা গোষ্ঠীগুলোও। যেমন কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়া অপরাধীরা পরবর্তী সময়ে অস্থিরতা তৈরিতে ভূমিকা রাখছে। এ ছাড়াও ইসলামপন্থিদের ক্ষমতায়ন ঘটেছে। অন্যান্য সমমনা গোষ্ঠীর মধ্যে যারা আগে কার্যত নিষিদ্ধ ছিল এখন স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছে। এই গোষ্ঠীগুলো আইন মানছে না এবং এবং তারা এখন অনিয়ন্ত্রিত।
সর্বশেষ বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে দুটি সংবাদপত্র কার্যালয়ে হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে।
বৃহস্পতিবার মধ্যরাতের ঘটনাবলি মূলত এক ধরনের মবতন্ত্র; উচ্ছৃঙ্খল জনতাতন্ত্র চলার উদাহরণ। যেন সরকার পরিচালনা করছে উচ্ছৃঙ্খল জনতা। শনিবার দেশটির সরকার এক বিবৃতি দিয়ে উশৃঙ্খল জনতাকে যথাযথ আচরণ করার জন্য অনুরোধ করেছে এবং এই বিষয়গুলোর নিন্দা জানিয়েছে, যেন তারা এক অসহায় দর্শক।
আমরা কেবল নিন্দা নয়, বরং দুষ্কৃতকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির মতো সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ এবং প্রয়োজনে বলপ্রয়োগের মাধ্যমে এই শক্তিগুলো দমন করার কিছু প্রচেষ্টা দেখতে চাই। আমি এখনও জানি না, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের এ ব্যাপারে আগ্রহ আছে কিনা। কারণ তিনি এটাও জানেন, শেখ হাসিনাকে উৎখাতের পেছনে এটাও কারণ ছিল যে, রাজপথ নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা খর্ব হয়ে গিয়েছিল। গণঅভ্যুত্থানকালে অনেক আন্দোলনকারী প্রাণ হারিয়েছে। বস্তুত বিক্ষোভকারীদের কঠোরভাবে দমনের প্রচেষ্টা বৃহত্তর গণঅভ্যুত্থানের সূত্রপাত করেছিল। কিন্তু বৃহস্পতি-শুক্রবারের ঘটনাগুলো গণতন্ত্রের ভবিষ্যতের জন্য তো বটেই, বাংলাদেশের স্থিতিশীলতার জন্য শুভ লক্ষণ হতে পারে না।
বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার যেভাবে গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী পরিস্থিতি মোকাবিলা করেছে, সে সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কী?
ভারতের পররাষ্ট্রবিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটি বাংলাদেশ পরিস্থিতির ব্যাপারে বিশদভাবে অধ্যয়ন করেছে এবং মাত্র কয়েকদিন আগে একটি প্রতিবেদন তৈরি করেছে। আমরা ভারত সরকারের গঠনমূলক দৃষ্টিভঙ্গির প্রশংসা করেছি এবং বাংলাদেশে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজ করা শক্তিগুলোকে সমর্থন করার আহ্বান জানিয়েছি। কিন্তু আপনাকে মনে রাখতে হবে, যে কোনো দেশেই আইনশৃঙ্খলার অবনতি বা অনুপস্থিতি বিপজ্জনক। ঢাকার প্রকাশ্য রাজপথে যেসব বক্তব্য দেওয়া হচ্ছে, প্রতিবেশী হিসেবে আমাদের জন্যও তা উদ্বেগজনক। যে কোনো দেশের মানুষের জন্য ভারতের ব্যাপারে সমালোচনামূলক মতামত প্রকাশ করার স্বাধীনতা থাকা উচিত। তবে এ ধরনের বক্তব্যের একটি সীমা রয়েছে, যা গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হতে পারে।
কোনো উদাহরণ দিতে পারেন?
যদি কোনো ভারতীয় রাজনীতিবিদ বাংলাদেশ ভাঙা বা দখল করার হুমকি দেন, তাহলে বাংলাদেশ ন্যায্যভাবেই এসবের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে পারে। এ ধরনের কণ্ঠস্বর দমন বা নিয়ন্ত্রণের জন্য ভারতের কাছে আহ্বান যেতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশে যখন কোনো ছাত্রনেতা হাজার হাজার জনতার সামনে ভারত থেকে তার উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সাতটি রাজ্য বিচ্ছিন্ন করার হুমকি দিয়ে উস্কানিমূলক বক্তৃতা দেন, তখন দুর্ভাগ্যবশত সেই ব্যাপারে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে আমরা কি তেমন আহ্বান জানাতে পারছি? বলা বাহুল্য, এ ধরনের বক্তব্য শুনে ভারতের কারও খুশি হওয়া উচিত নয়। এমনকি তারা যদি বাংলাদেশের গণঅভ্যুত্থানের প্রতি সহানুভূতিশীলও হন।
ভারত তাহলে কী করবে?
ভারত সরকার অবশ্যই বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান পরিস্থিতির দিকে খুব সতর্কতার সঙ্গে নজর রাখবে। আমরা সেখানে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের পক্ষে। যদি মানুষ আইনশৃঙ্খলার অবনতি ও সহিংসতায় ভীত-সন্ত্রস্ত থাকে, তাহলে তারা অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারবে না। এ ছাড়াও আমি বিশেষত বাংলাদেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন। বৃহস্পতিবার ধর্ম অবমাননার মিথ্যা অভিযোগে একজন দরিদ্র হিন্দুকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। পরে দেখা গেছে, এটি ছিল তার কর্মক্ষেত্রের সহকর্মী-সম্পর্কিত বিরোধ। ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে কটূক্তি করার মতো কিছুর সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক ছিল না। তবুও এ অভিযোগে তাকে হত্যা করা হয়। এ ধরনের অসহিষ্ণুতা কুৎসিতভাবে মাথাচাড়া দিতে শুরু করেছে এবং আমি অন্তর্বর্তী সরকারকে বিষয়টি আরও দৃঢ়ভাবে মোকাবিলা করার জন্য অনুরোধ করব। আমি আশা করি, আমাদের সরকারও একই বার্তা দিচ্ছে।
বাংলাদেশ সরকার কি সেটা শুনছে?
বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস বিশ্বজুড়ে সম্মানিত ব্যক্তিত্ব। এ ধরনের ঘটনার ব্যাপারে কেবল দুঃখ প্রকাশ করা কিংবা নিন্দা জানানোই তাঁর ব্যক্তিত্ব ও পদের পক্ষে যথেষ্ট নয়। এর পুনরাবৃত্তি রোধ এবং যারা এটি করেছে তাদের শাস্তি দেওয়ার জন্য তাঁকে দৃঢ় পদক্ষেপ নিতে হবে। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না পেলে এসব ঘটনা ঘটতে থাকবে।
ভারত সরকারের কাছে কী কী বিকল্প আছে?
ভারত কোনো প্রতিবেশী দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে পারে না। তবে বাংলাদেশ রাষ্ট্র ও জনগণের জন্য বিভিন্নভাবে অবদান রাখা একটি দেশ হিসেবে আমরা অবশ্যই ঢাকায় আমাদের কূটনৈতিক প্রভাব প্রয়োগ করে অন্তর্বর্তী সরকারকে গঠনমূলক পদক্ষেপ নিতে রাজি করাতে পারি।
মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার এবং গণঅভ্যুত্থানকারীদের পক্ষ থেকে শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে দেওয়ার জোরালো দাবি আছে। এ ব্যাপারে আপনি কী মনে করেন?
আমরা এই বিষয়ে সরকারের প্রতিক্রিয়া জানতে চেয়েছি। তারা বলেছে, তারা সব ধরনের আইনি সতর্কতা এবং যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে এটি খতিয়ে দেখছে। বাংলাদেশের সঙ্গে বিদ্যমান চুক্তির অধীনে ভারত সরকারের আইনি বাধ্যবাধকতা এবং রাজনৈতিক প্রভাব, সেই সঙ্গে শেখ হাসিনার সঙ্গে আমাদের নিজস্ব সম্পর্ক, যা কয়েক দশক ধরে তৈরি হয়েছে; উভয় দিক থেকেই এটি কোনো ছোট বিষয় নয়। এসব বিষয় বিবেচনা করতে হবে। আমার মনে হয় না, এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত কী হতে পারে বা কখন নেওয়া হবে, আমাদের কেউ সে সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী করতে পারে।
- বিষয় :
- শশী থারুর
