রাজনীতি
সন্ত্রাস ও সাম্প্রদায়িক উস্কানির বিরুদ্ধেও তারুণ্য জাগুক
শামসুল হুদা
শামসুল হুদা
প্রকাশ: ০২ জানুয়ারি ২০২৬ | ০৬:৫৫ | আপডেট: ০২ জানুয়ারি ২০২৬ | ০৬:৫৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
সম্প্রতি সংবাদপত্র প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার, সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানট, উদীচী কার্যালয়ে হামলা ও অগ্নিসংযোগ করেছে একটি মহল। ছায়ানট ভবনে অবস্থিত নালন্দা বিদ্যালয়ও রেহাই পায়নি। দিপু চন্দ্র দাস নামে এক শ্রমিককে কথিত ধর্ম অবমাননার অভিযোগে নির্মমভাবে হত্যা ও মরদেহ পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। তার আগে ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সামনের সারির যোদ্ধা শরিফ ওসমান হাদিকে মাথায় গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। তাঁর হত্যাকারীদের বিচারের দাবিতে আন্দোলন এখনও চলছে।
বিগত মাসগুলোতে এমন আরও ডজন ডজন হত্যা, সন্ত্রাস, মব সন্ত্রাস ঘটিয়েছে উগ্রবাদী সন্ত্রাসী ও নাশকতাকারী দুর্বৃত্তরা। খুব অল্পসংখ্যক ঘটনার তদন্ত প্রক্রিয়াধীন। বেশির ভাগের তদন্ত হয়নি; বিচার তো দূরের কথা। এসব অন্যায়-অবিচার কার্যত বিনা বাধায় চলেছে। প্রশ্ন জাগে, রাষ্ট্র কি অসহায়, না দুর্বল? রাষ্ট্রের দায়িত্বে যারা আছেন তাদেরই এর উত্তর দেওয়ার কথা।
আমাদের কথা হচ্ছে, রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব নেওয়ার পর নিষ্ক্রিয়তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। ধর্মীয় সংখ্যালঘু, আদিবাসী বা অন্য কোনো সম্প্রদায় বা গোষ্ঠীর যে কোনো নাগরিক বা তাদের পরিবার, যারাই গত ১৭ মাসে নানাভাবে নিগৃহীত কিংবা হত্যা-সন্ত্রাসের শিকার হয়েছেন, প্রতিটি ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দ্রুততম সময়ে বিচারের আয়োজন নিশ্চিত করতে হবে।
ভুক্তভোগী জনগোষ্ঠী, নাগরিক সমাজ, মানবাধিকার সংগঠনের পক্ষ থেকে এসব দাবি আমরা বারবার জানিয়ে আসছি। কিন্তু পরিস্থিতির অগ্রগতি হয়েছে বলে এখনও দাবি করার সুযোগ নেই। যে অকুতোভয় তরুণরা নির্মম শাসকের অন্ধ-অনুগত পুলিশ ও পেটোয়া বাহিনীর বুলেট-বেয়নেটের সামনে বুক পেতে দিয়ে গণঅভ্যুত্থানে বিজয় ছিনিয়ে এনেছিল; শত শত গ্রাফিতিতে আশা-আকাঙ্ক্ষার মহাকাব্য রচনা করেছিল; মানুষকে মহাপরিবর্তনের স্বপ্ন দেখিয়েছিল; তাদের সেসব অর্জন কি এভাবে একে একে দুর্বৃত্তদের মব সন্ত্রাসে পুড়ে ছাই হয়ে যাবে?
বস্তুত বাংলাদেশ নামক ভূখণ্ডে ১৯৪৭-পরবর্তী আট দশকে সব গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক-ঐতিহাসিক পরিবর্তনে সামনের সারির যোদ্ধা ছিল সমাজ-ছাত্র ও যুবশক্তি। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, ষাটের দশকের সামরিক শাসনবিরোধী লড়াই, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ– প্রতি ক্ষেত্রে রণাঙ্গনের সবচেয়ে সাহসী অগ্রবাহিনী ছিল এই দেশের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও তরুণরা। প্রতিটি পর্যায়ে নারী শিক্ষার্থী ও তরুণীদের সক্রিয় উপস্থিতি ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে ছিল উল্লেখযোগ্য।
৭১-পরবর্তীকালেও বিভিন্ন স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে বঞ্চনা, শিক্ষাসহ অন্যান্য বৈষম্যের অবসানের দাবিতে যেসব সংগ্রাম হয়েছে, তারও সামনে থেকেছে তরুণ সমাজ। আশি-নব্বই দশকে এরশাদের স্বৈরশাসনের অবসান এবং অন্যান্য গণতান্ত্রিক দাবিতে যে আন্দোলন হয়েছে, তাতেও ব্যতিক্রম ঘটেনি।
সর্বশেষ পর্যায়ে ২০১৮ সালের নিরাপদ সড়কের আন্দোলনে যেভাবে স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা স্বতঃস্ফূর্ত ও শান্তিপূর্ণ আন্দোলন গড়ে তুলেছিল, তাও ছিল নজিরবিহীন। ২০২৪ সালের জুন-জুলাইয়ের শিক্ষার্থীদের কোটা সংস্কার আন্দোলনের সূচনা ও অনিবার্য বিস্তারকালে একনায়কত্ববাদী শাসকের কঠোরতর দমন-পীড়ন ও নির্বিচারে হত্যাযজ্ঞকে সাহসের সঙ্গে মোকাবিলা করে গণঅভ্যুত্থানে রূপান্তরের নেতৃত্বও দিয়েছে অসম সাহসী তরুণ সমাজ।
কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে গণঅভ্যুত্থানে রূপান্তরের পর্যায়ে ফ্যাসিস্ট শাসকের নির্মম দমন-পীড়ন, হত্যা-নির্যাতন চলাকালে তরুণদের পাশে শুধু সরকারি-বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী-শিক্ষক নন; সক্রিয় সমর্থন ও সহযোদ্ধার সহমর্মিতা নিয়ে যুক্ত হয়েছেন শ্রেণি-পেশা নির্বিশেষে সবাই।
শুধু নগর-মহানগরে নয়; প্রতিটি জেলা-উপজেলা শহরে হাজার হাজার তরুণের সঙ্গে আরও শত-সহস্র নাগরিক, অভিভাবক, শ্রমজীবী, কর্মজীবী এমনকি গৃহিণীরাও রাস্তায় নেমে এসেছিলেন। সন্তানতুল্য শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সংহতি জানাতে গিয়ে হতাহত হয়েছেন। তারা কী চেয়েছিলেন গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে? চেয়েছিলেন বর্বর শাসন কাঠামোসহ অনাচার-অত্যাচার, বৈষম্য ও শোষণের অবসান। গণতন্ত্র ও আইনের শাসন। তারা মব সহিংসতা ও উগ্রবাদী সন্ত্রাস চাননি। এই পরিবর্তনের প্রত্যাশাগুলোই স্লোগান, দেয়াল লিখন বা গ্রাফিতির ভেতর দিয়ে আত্মপ্রকাশ করেছেন।

শিক্ষার্থীদের মূল স্লোগানই ছিল বৈষম্যবিরোধী রাষ্ট্র ও সমাজ প্রতিষ্ঠার ডাক। একটি গ্রাফিতির ভাষা ছিল– ‘পাতা ছেঁড়া নিষেধ’। একটি গাছের পাঁচটি পাতার একেকটিতে লেখা মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান, আদিবাসী। আমাদের দেশের বিভিন্ন ধর্ম ও জাতিগত বৈচিত্র্যের অবিনশ্বর বৈশিষ্ট্যই এই গ্রাফিতি তুলে ধরেছিল। এমনই আরও শত শত গ্রাফিতি লেখা হয়েছে ঢাকা মহানগরসহ দেশের প্রায় প্রতিটি ছোট-বড় শহরের দেয়ালে। তাতে আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থী-জনতার পরিবর্তনের আশার বাণী মূর্ত হয়ে উঠেছে। এ ছাড়া জেলা ও বিভাগীয় শহরের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বিভিন্ন মত ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের সময় জেনেছি তাদের মনের গভীরে থাকা পরিবর্তনের প্রত্যাশা। তারা একে একে বলেছেন জরাজীর্ণ শিক্ষা ব্যবস্থার আমূল সংস্কারের কথা। স্বাস্থ্য ব্যবস্থার দুরবস্থা এবং দরিদ্র ও গ্রামীণ নানা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবার বঞ্চনার কথা। তারা প্রায় সবাই বলেছেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অনেক সদস্যের হাতে সাধারণ নাগরিকের লাগাতার হয়রানি-নির্যাতনের কথা। প্রচলিত বিচার ব্যবস্থায় দরিদ্র ও ক্ষমতাহীন মানুষের বিচার না পাওয়ার ক্ষোভের কথা। দৈনন্দিন জীবনে দেখা বা পারিবারিক অভিজ্ঞতা থেকে জানা অন্যায়-অনাচারের দৃষ্টান্তের কথা। সেসব জানা-শোনা জীবনাচারের ছোট-বড় বিষয়ই তাদের চাওয়ার ভিত্তি সৃষ্টি করেছিল। তাই তারা চেয়েছেন বৈষম্যহীন মানসম্মত শিক্ষা ব্যবস্থা ও পাশাপাশি উন্নত শিক্ষার পরিবেশ; যেখানে শিক্ষার্থীরা ছেলেমেয়ে, ধর্ম, জাতি, লিঙ্গ, গোত্র, গোষ্ঠী নির্বিশেষে স্বাধীনভাবে নিরাপদে শিক্ষাচর্চায় মনোনিবেশ করতে পারবেন। কোনো বিশেষ রাজনৈতিক দল-মত বা আদর্শের আনুগত্যের পরিচয় থাকা বা না থাকার কারণে কাউকে নিগৃহীত হতে হবে না।
তারা চেয়েছেন এমন একটি দেশ, যেটি হবে যথার্থ অর্থেই অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক ও বহুত্ববাদী। বাংলাদেশে কোনো একটি ভাষা বা ধর্মে বিশ্বাসী মানুষের সংখ্যা আনুপাতিকভাবে অনেক বেশি হলেও এ দেশে আরও অনেক ধর্ম, ভাষা ও সংস্কৃতির মানুষ বাস করেন, যাদের সংখ্যা তুলনামূলক কম। শিক্ষার্থীরা স্পষ্ট ভাষায় ঠিক যেভাবে গ্রাফিতিতে লেখা হয়েছে, সেই ভাষায় তারা চান এমন দেশ, যেখানে কোনো ধর্মবিশ্বাস কিংবা ভাষাগত, সাংস্কৃতিক পরিচয় অথবা পোশাক কিংবা লিঙ্গের পরিচয়ের কারণে বৈষম্য, অপমান কিংবা নিরাপত্তাহীনতার শিকার হতে হবে না। সকল নাগরিক একই ধরনের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও অধিকারের নিশ্চয়তা ক্যাম্পাস, সমাজ ও রাষ্ট্রের সর্বত্র ভোগ করবেন– এই প্রত্যাশা ছিল আমাদের বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থীদের।
তাদের অনেকেই এ কথা বলেছেন, বাকস্বাধীনতা বা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা তারা চান সকল নাগরিকের জন্য। যে কোনো নাগরিকের যেন দ্বিমত পোষণের স্বাধীনতাও নিশ্চিত হয়, এমন পরিবর্তন তারা দেখতে চান। সংস্কৃতিচর্চার স্বাধীনতার কথাও অনেকে বলেছেন। নারী-পুরুষের সমঅধিকার প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষাও প্রকাশ করেছেন অনেকে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রায় ১৭ মাস অতিক্রান্ত হতে চলেছে; আমরা যেসব ঘটনা প্রায় প্রতিদিন প্রত্যক্ষ করছি; তা কি গণঅভ্যুত্থানের প্রত্যাশার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ? যে কোনো স্তরের নাগরিকই বলবেন, প্রত্যাশার সঙ্গে আজকের বাস্তবতার সামঞ্জস্য নেই।
এই পরিস্থিতিতে আমরা কি আশা ছেড়ে দিয়ে হতাশাই একমাত্র সম্বল জেনে চুপচাপ ঘরে বসে থাকব? নাকি অন্যায়-অবিচার-অনাচারের বিরুদ্ধে তরুণ সমাজ রুখে দাঁড়াবে; চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিতে অন্যদেরও উদ্বুদ্ধ করবে? বৈষম্যহীন রাষ্ট্র গড়ার লড়াই বৈষম্যবাদী অনাচারের কাছে হার মানবে– এটা হতে পারে না, আমরা বিশ্বাস করি। তরুণ সমাজ বলতে কোনো রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী বা অনুসারী নয়; সারাদেশের আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল যারা, সেই তরুণ সমাজকেই বলছি।
আমরা ভরসা রাখতে চাই নিজেদের সংগঠিত ঐক্যবদ্ধ শক্তির ওপর। আস্থা রাখতে চাই সেই তরুণদের ওপর, যারা ৪৭-পরবর্তী ইতিহাসের সব ক্রান্তিকালে এই জনপদের সব জাতিগোষ্ঠীকে পথ দেখিয়েছে। অকাতরে নিজেদের জীবন দিয়ে সম্মিলিতভাবে সব মানুষের অধিকার, সম্মান, মর্যাদা ও নিরাপত্তাকে সুরক্ষা দিয়েছে। সর্বশেষ জুলাই গণঅভ্যুত্থানেও অসম্ভবকে সম্ভব করেছে। গণমানুষের প্রত্যাশা– আবার জেগে উঠুক তারুণ্যের শক্তি সব সন্ত্রাস, বিভেদ সৃষ্টিকারী অপশক্তি, উগ্র সাম্প্রদায়িক দেশ-বিদেশের উস্কানি ও নানামুখী অপপ্রচার রুখে দিতে। তারুণ্যের জয় হোক।
শামসুল হুদা: মানবাধিকারকর্মী; নির্বাহী পরিচালক, এএলআরডি
- বিষয় :
- শামসুল হুদা
